দোকানে বেশি দামে বিক্রি, পণ্য ফেরত দেওয়া, নামকরণ, অযুতে মাসাহ, পণ্য পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ সমাধান।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
প্রশ্ন১ : এক ব্যক্তি যদি কোনো দোকানদারকে রঙিন টিন এক বান কত টাকা করে বিক্রি করে জিজ্ঞাস করে? তখন দোকানদার যদি তাকে ৪৩০০ টাকা দাম বলে তাহলে পরবর্তীতে অন্য কারো কাছে কি এই রঙিন ঢেউটিন ৪৪০০ টাকা করে বিক্রি করতে পারবে কি?
প্রশ্ন২. কোনো এক ব্যক্তি যদি কোনো দোকানদারকে এক ফুট প্লাস্টিক টিন কত টাকা করে বিক্রি করে জিজ্ঞাস করে? তখন দোকানদার যদি তাকে ২০০ টাকা ফুট ধরে বিক্রি করে বলে তাহলে পরবর্তীতে অন্য কারো কাছে কি এই প্লাস্টিক টিন এক ফুট ২৩০ টাকা করে বিক্রি করতে পারবে কি?
প্রশ্ন৩. কেউ যদি কোনো বিক্রেতার কাছে বলে যে তাকে আদা কেজি বু্বি( লটকন) দিতে। পরে যদি ক্রেতা হাত দিয়ে লটকন সংগ্রহ করে মাপার জন্য পলিথিনে ঢুকাতে থাকে ও লটকন টক থাকার কারনে যদি বিক্রেতাকে বলে যে সে লটকন কিনবে না এবং বিক্রেতাও যদি তা মেনে নেয় তাহলে কি ক্রেতার ঈমান চলে যাবে কি?
প্রশ্ন৪. আদিয়ান শব্দের অর্থ কি?আদিয়ান কি ইসলামিক নাম? ছেলে সন্তানের নাম কি আদিয়ান রাখা যাবে কি?
প্রশ্ন৫. বিক্রেতার সম্মতিতে এক পন্য পরিবর্তন করে অন্য পন্য কিনা যাবে কি?
প্রশ্ন৬. সন্দেহের বশে অযুতে দুইবার মাথা মাসাহ করা যাবে কি?
প্রশ্ন৭. একটি গেঞ্জি ১২০ টাকা দিয়ে প্রথমে কিনলে পরবর্তীতে কি সেই একই গেঞ্জি ৮০ টাকা দিয়ে কিনা জায়েজ হবে কি?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
নিম্নে প্রশ্নগুলোর উত্তর যথাক্রমে দেওয়া হলো—
প্রশ্ন ১ ও ২ : দাম জানার পর বেশি দামে বিক্রি করা
উত্তর
কোনো ক্রেতা যদি কোনো পণ্যের বর্তমান বাজারদর জিজ্ঞেস করে এবং দোকানদার তাকে সে দাম জানায়, তাহলে দোকানদার পরবর্তীতে অন্য ক্রেতার কাছে সেই পণ্য বেশি দামে বিক্রি করতে পারবে, যদি না সে প্রথম ক্রেতার কাছে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয় যে ‘এই দামেই বিক্রি করব’ বা ‘আমি সবাইকে এই দামেই দেব’। বাজারে দাম ওঠানামা করে; তাই দোকানদারের জন্য ভিন্ন ক্রেতার কাছে ভিন্ন দাম রাখা জায়েজ, যতক্ষণ তা প্রতারণা বা ধোঁকা না হয়। তবে যদি সে প্রথম ক্রেতাকে বলে থাকে যে ‘এটাই আমার সর্বশেষ দাম’ বা ‘সবার জন্য একই দাম’, তাহলে অন্যকে বেশি দামে বিক্রি করা মাকরূহ হবে, তবে হারাম নয়।
(রদ্দুল মুহতার, ৫/৫২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৩/২১৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৩/২৮৪)
সারসংক্ষেপ
- দোকানদার সাধারণত বিভিন্ন ক্রেতার কাছে ভিন্ন দাম রাখতে পারেন।
- তবে যদি তিনি নির্দিষ্ট করে বলেন ‘এই দামেই সবার কাছে দেব’, তাহলে অন্যকে বেশি দামে দেওয়া অনুচিত।
প্রশ্ন ৩ : লটকন হাতে নেওয়ার পর কিনতে অস্বীকার করলে ঈমান চলে যাবে কি?
উত্তর
ক্রেতা যদি কোনো পণ্য হাতে নেয় বা পলিথিনে ভরে, কিন্তু তা কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেয়, এবং এরপর পণ্যের গুণাগুণ (যেমন টক হওয়া) দেখে ফেরত দেয় এবং বিক্রেতাও রাজি হয়, তাহলে ক্রেতার ঈমান চলে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই। এটি একটি সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপার যেখানে উভয়ের সম্মতিতে লেনদেন বাতিল হয়। ঈমান চলে যাওয়ার বিষয়টি কেবল তখনই প্রযোজ্য, যখন কেউ ইসলামের কোনো মৌলিক বিধানকে অস্বীকার করে বা বিদ্রুপ করে।
(ফাতাওয়া উসমানী, ১/২৭৩; বাহিশতী জেওর, ২/৩২)
সারসংক্ষেপ
- পণ্য হাতে নেওয়া মাত্রই ক্রয় বাধ্যতামূলক হয় না।
- উভয়ের সম্মতিতে লেনদেন বাতিল হলে কোনো গুনাহ নেই।
- ঈমান চলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।
প্রশ্ন ৪ : ‘আদিয়ান’ শব্দের অর্থ ও নাম রাখা
উত্তর
‘আদিয়ান’ (أَدْيَان) শব্দটি ‘দীন’ (دين) থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘ধর্ম’ বা ‘বিধান’। আরবি ভাষায় ‘আদিয়ান’ হলো ‘দীন’ এর বহুবচন, যার অর্থ ‘ধর্মসমূহ’। এটি একটি ইসলামিক শব্দ, তবে সরাসরি নবী-রাসূল বা সাহাবিদের নাম নয়। ছেলে সন্তানের নাম রাখা জায়েজ, তবে উত্তম হলো নবী-রাসূল, সাহাবি বা সৎকর্মশীলদের নাম রাখা। ‘আদিয়ান’ নাম রাখলে কোনো সমস্যা নেই, তবে প্রথমে ‘আব্দুল’ বা ‘আমিন’ ইত্যাদি ভালো নাম রাখা উচিত।
(লিসানুল আরব, ১/২৫; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫০; বেহেশতী জেওর, ৩/৪৮)
সারসংক্ষেপ
- অর্থ : ধর্মসমূহ।
- ইসলামিক নাম হিসেবে গ্রহণযোগ্য, তবে উত্তম হলো নবীদের নাম।
- রাখা যাবে।
প্রশ্ন ৫ : বিক্রেতার সম্মতিতে পণ্য পরিবর্তন
উত্তর
হ্যাঁ, জায়েজ। যদি ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই রাজি হয়, তাহলে বিক্রি হওয়া পণ্যের পরিবর্তে অন্য পণ্য নেওয়া যায়। একে ইসলামী ফিকহে ‘ইবদাল’ বা ‘বদলি’ বলা হয়। তবে শর্ত হলো নতুন পণ্যের দাম নির্ধারিত হতে হবে এবং উভয়ের সম্মতি স্পষ্ট হতে হবে।
(রদ্দুল মুহতার, ৫/৫৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৩/১৯২)
সারসংক্ষেপ
- উভয়ের সম্মতিতে পণ্য পরিবর্তন জায়েজ।
প্রশ্ন ৬ : সন্দেহের কারণে অযুতে দুইবার মাথা মাসাহ
উত্তর
উত্তম হলো মাসাহ একবার করা, যেমন সুন্নতে আছে। তবে কারো যদি সন্দেহ হয় যে ঠিকমতো মাসাহ হয়নি, তাহলে সে দ্বিতীয়বার মাসাহ করতে পারে। এতে অযু ভঙ্গ হবে না এবং তা জায়েজ। তবে বারবার সন্দেহ করা ওয়াসওয়াসা (শয়তানি প্ররোচনা), তাই তা পরিহার করা উচিত।
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১০; রদ্দুল মুহতার, ১/১২২)
সারসংক্ষেপ
- সন্দেহ হলে দ্বিতীয়বার মাসাহ করা জায়েজ, তবে বারবার না করাই ভালো।
প্রশ্ন ৭ : একই গেঞ্জি কম দামে কিনলে কি জায়েজ?
উত্তর
প্রথমবার ১২০ টাকা দিয়ে কিনলেও পরবর্তীতে সেই একই গেঞ্জি ৮০ টাকা দিয়ে কেনা জায়েজ, যদি বিক্রেতা তা বিক্রি করতে রাজি হয়। মূল্য বাজারভেদে কম-বেশি হতে পারে। তবে যদি প্রথমবার কেনার সময় কোনো শর্ত থাকে যে ‘একই পণ্য ভবিষ্যতে কম দামে কিনলে পুরনো লেনদেন বাতিল হবে’ – এমন কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলে তা বৈধ।
(রদ্দুল মুহতার, ৫/৫৩; ফাতাওয়া উসমানী, ৩/২৪)
সারসংক্ষেপ
- জায়েজ, যতক্ষণ বিক্রেতা রাজি।
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত কিতাবসমূহ
- রদ্দুল মুহতার
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া
- ফাতাওয়া উসমানী
- বাহিশতী জেওর
- লিসানুল আরব (ভাষা অভিধান)