স্বপ্নে খাওয়া দেখলে কি হয়?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
শুনেছি স্বপ্নে খাওয়া দেখা নাকি কুফরি হওয়ার লক্ষণ। এটা কি সত্য?
আমি সকাল ৮/৯ টার দিকে ঘুমিয়ে গেছিলাম । তখন স্বপ্নে দেখেছি যে আমি আমার আত্মীয়দের বাসায় গেছি এবং নিজে কিছু বানিয়ে নিয়ে গেছি । তারপর সেটা সবাই খাচ্ছে আর আমি নিজেও খেয়েছি। এর মানে কি !? এটা কি নিছকই কোনো স্বপ্ন নাকি কেউ জাদু করার চেষ্টা করছে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে নেওয়া প্রয়োজন: স্বপ্নে খাওয়া দেখলে তা কখনোই কুফরি হওয়ার লক্ষণ নয়। এটি একটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কথা এবং এর পক্ষে কুরআন, হাদীস বা কোনো নির্ভরযোগ্য ইসলামি গ্রন্থে কোনো প্রমাণ নেই। কুফর বা ঈমানের বিষয়টি শুধুমাত্র ইচ্ছাকৃত বিশ্বাস, কথা ও কাজের ওপর নির্ভরশীল, স্বপ্নের ওপর নয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
"الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالْحُلْمُ مِنَ الشَّيْطَانِ" "সুন্দর স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে আর দুঃস্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩২৯২; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬১)
অর্থাৎ স্বপ্ন ভালোও হতে পারে, মন্দও হতে পারে, কিন্তু তা দ্বারা ঈমান-কুফরের বিচার হয় না।
আপনার স্বপ্নের ব্যাখ্যা:
আপনি স্বপ্নে দেখেছেন যে আপনি আত্মীয়দের বাসায় গেছেন, নিজে কিছু রান্না করে নিয়ে গেছেন এবং সবাই তা খাচ্ছেন, আপনি নিজেও খেয়েছেন। এটি একটি সাধারণ স্বপ্ন যা নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নির্দেশ করতে পারে:
- মানসিক চিন্তার প্রতিফলন: আপনি সম্ভবত সম্প্রতি আত্মীয়দের সাথে দেখা করার, তাদের জন্য কিছু করার বা তাদের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার কথা ভাবছিলেন। স্বপ্নে সেই চিন্তাই প্রকাশ পেয়েছে।
- পারস্পরিক সম্পর্ক ও সদ্ভাব: স্বপ্নটি আপনার আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক ও ভালোবাসার ইঙ্গিত বহন করে। নিজে রান্না করে নিয়ে যাওয়া এবং সবাই মিলে খাওয়া সম্প্রীতি ও একতার প্রতীক।
- জাদুর কোনো লক্ষণ নয়: জাদুর স্বপ্ন সাধারণত অদ্ভুত, ভীতিকর বা অস্বাভাবিক হয়ে থাকে (যেমন: উড়ে যাওয়া, পশুতে পরিণত হওয়া, অন্ধকারে পড়ে যাওয়া ইত্যাদি)। আপনার বর্ণিত স্বপ্নটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং দৈনন্দিন জীবনের সাথে সম্পর্কিত। তাই এটিকে জাদুর প্রচেষ্টা মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং শয়তান কখনো কখনো মানুষের মনে এ ধরনের সন্দেহ ও ভয় ঢেলে দেয়। তাই এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
হানাফি ফিকহের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা:
- স্বপ্নের ওপর আমল করা জরুরি নয়: স্বপ্ন দেখলে তা নিয়ে অযথা চিন্তা বা ভয় না করে আল্লাহর কাছে ভালো স্বপ্নের জন্য শুকরিয়া আদায় করুন এবং খারাপ স্বপ্ন থেকে পানাহ চান। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও পরবর্তী হানাফি ফুকাহায়ে কিরাম স্বপ্নের ওপর কোনো বিধান নির্ভরশীল করেননি। বরং স্বপ্নের ব্যাখ্যা বিশেষজ্ঞদের (মুফাসসিরে রুয়া) কাছ থেকে জানা যায়।
- জাদু সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা: কোনো স্বপ্ন দেখার সাথে সাথেই জাদু বা বদনজরের সন্দেহ করা উচিত নয়। বরং যদি বারবার খারাপ স্বপ্ন আসে, শরীরে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়, তাহলে নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নিন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) খারাপ স্বপ্ন দেখলে তিনবার বাম দিকে থুথু ফেলে (শুষ্ক থুথু) আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬২)।
- সকালের ঘুম: ফজরের পর ঘুমানো (যাকে 'নওমে গুদরাত' বা 'কায়লুলা' ব্যতীত সকালের ঘুম) কিছু হানাফি ফকীহের মতে মাকরূহ, কারণ এতে বরকত কম হয় এবং শরীর অলস হয়। তবে এটি হারাম নয়। আপনি এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে পারেন।
উপসংহার:
১. স্বপ্নে খাওয়া দেখলে কুফরি হওয়ার কোনো ভিত্তি নেই। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথা। ২. আপনার বর্ণিত স্বপ্নটি নিছক একটি সাধারণ স্বপ্ন, যা আপনার মানসিক চিন্তা ও পারিবারিক সম্পর্কের প্রতিফলন। এতে ভয়ের কিছু নেই। ৩. কেউ জাদু করার চেষ্টা করছে—এমন সন্দেহ পোষণ করার কোনো কারণ নেই। শয়তান মানুষকে অহেতুক ভয় দেখায়। আপনি নিয়মিত সূরা ফালাক, সূরা নাস, আয়াতুল কুরসি এবং শেষ তিন কুল পড়ে ফুঁ দিয়ে ঘুমান। ৪. সর্বোপরি, স্বপ্ন নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন এবং তাঁর কাছে ভালো স্বপ্নের জন্য দোয়া করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ এবং তিনিই প্রকৃত পথপ্রদর্শক।