ব্যাংকের সুদের টাকায় কোরবানি ও বাজার-সদাই খাওয়া কি জায়েজ?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 1808
Questioner: fatama begum
Question Asked: 19 Jun 2026, 08:02 PM
Reviewed & Published: 19 Jun 2026, 08:10 PM
Views: 55
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমি আমার হাজবেন্ড ও দুই বাচ্চা নিয়ে থাকি। আমার হাজবেন্ড চাকুরি করেন। আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ি মাঝে মাঝে এসে আমাদের সাথে লম্বা সময় থাকেন। আমার শশুর তার জমি বিক্রির পুরো টাকা (প্রায় কোটির কাছাকাছি) ব্যাংকে রেখে, মাসিক যে সুদের টাকা পান সেটা দিয়েই তাদের খরচাপাতি চালান। আমাদের বাসায় যখন থাকেন তখন প্রায়ই কাচা বাজার বা মাছ গোস্ত কিনেন। এই বছরের কোরবানি ও দেন এই সুদের টাকা দিয়ে। এখন আমার প্রশ্ন হলো, এই কোরবানী হালাল হয়েছে কিনা, আর আমরা তাদের আনা বাজার সদাই, কোরবানীর গোস্ত এইসব খাবো কিনা? আমাদের কি করনীয়? আমাদের এলাকার ইমাম হুজুর দ্বারাও সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমার শ্বশুর কে বুঝানো হয়েছে, কিন্তু উনি সেটা মানতে নারাজ। তাদের ভাষ্যমতে এইটা সুদ না, এইটা জায়েজ আছে। আমার হাজবেন্ডের ইনকাম সম্পূর্ণ হালাল আলহামদুলিল্লাহ।

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
আপনার শ্বশুর জমি বিক্রির পুরো টাকা ব্যাংকে রেখে মাসিক সুদের টাকা দিয়ে নিজের ও আপনাদের সংসারের খরচ চালান। এবারের কোরবানিও সেই সুদের টাকায় করেছেন। আপনি জানতে চান—এই কোরবানি হালাল হয়েছে কি না, সুদের টাকায় কেনা বাজার-সদাই ও কোরবানির গোস্ত খাওয়া জায়েজ হবে কি না, এবং কী করণীয়।

উত্তর:

১. ব্যাংকের সুদ কি হারাম?
ব্যাংকে টাকা রেখে প্রাপ্ত সুদ (interest) স্পষ্ট সুদ (রিবা) এবং কুরআন-হাদীসে এটি সর্বসম্মতভাবে হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا﴾ (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
“আল্লাহ বেচাকেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।”

হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদদাতা, লেখক ও সাক্ষী সকলকে লানত করেছেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৫৯৮)

আপনার শ্বশুরের ধারণা—‘এটা সুদ নয়, জায়েজ আছে’—একেবারে ভুল। সুদের নাম পরিবর্তন করলেও তার হুকুম পরিবর্তন হয় না। হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহে স্পষ্ট বলা হয়েছে:

“ব্যাংকের সুদ বা যে কোনো প্রকার অতিরিক্ত লেনদেন যা ঋণের বিনিময়ে শর্তসাপেক্ষে নেওয়া হয়, তা রিবা এবং হারাম।”
(রদ্দুল মুহতার, ৫/১৬৭; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৩৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৯৮)

২. সুদের টাকায় কোরবানি করা ও তার গোস্ত খাওয়া:
কোরবানি একটি ইবাদত। ইবাদতের জন্য হালাল ও পবিত্র অর্থ ব্যবহার করা ফরজ। যদি কোনো ব্যক্তি সম্পূর্ণ হারাম উপায়ে উপার্জিত অর্থ (যেমন সুদ) দিয়ে কোরবানি করে, তবে সেই কোরবানি আদায় হবে না এবং তার গোস্ত খাওয়া জায়েজ নয়।

হানাফী ফকীহগণ বলেন:

“যে ব্যক্তি হারাম মাল দিয়ে পশু কিনে কোরবানি করল, তার কোরবানি সহীহ হবে না। কেননা আল্লাহ তাআলা পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।”
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৪; ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/২৯৮)

সুতরাং আপনার শ্বশুরের এই কোরবানি হালাল হয়নি এবং সেই গোস্ত খাওয়া হারাম

৩. সুদের টাকায় কেনা বাজার-সদাই খাওয়া:
আপনার শ্বশুরের দৈনন্দিন খরচ সম্পূর্ণ সুদের টাকায় চলে। তাই তিনি যে বাজার-সদাই বা মাছ-গোস্ত কিনে আপনাদের দেন, তা সুদ দ্বারা অর্জিত মাল। এই ধরনের মাল অন্যায়ভাবে অর্জিত ও অপবিত্র।

হানাফী ফিকহে নিয়ম হলো: যদি কোনো ব্যক্তির সম্পদের অধিকাংশই হারাম হয়, তবে তার থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করা অনুচিত। বিশেষত যখন গ্রহণকারী নিজে হালাল উপার্জন করে (যেমন আপনার স্বামী), তখন সে এসব অপবিত্র বস্তু থেকে বেঁচে থাকবে।

“কোনো ব্যক্তির মাল যদি অধিকাংশ হারাম হয়, তবে তার দেওয়া খাবার খাওয়া মাকরূহে তাহরীমী। যদি সবটাই হারাম হয়, তবে খাওয়া জায়েজ নয়।”
(বাহিশতী জেওর, ২/২৪; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৩৭)

এ ক্ষেত্রে আপনার শ্বশুরের পুরো ভরণপোষণই সুদের উপর নির্ভরশীল, সুতরাং তার আনা খাবার গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব

৪. আপনাদের করণীয়:

ক) শ্বশুরকে বোঝানো: আপনি ও আপনার স্বামী তাকে সদয়ভাবে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যান। কুরআন-হাদীসের দলীল দিয়ে বুঝান যে ব্যাংকের সুদ অবশ্যই রিবা, যা থেকে তওবা করা জরুরি। তিনি যদি না মানেন, তবে দায়িত্ব শেষ—তারা নিজে নিজে হিসাব দেবেন।

খ) সুদী মাল গ্রহণ না করা: শ্বশুরের আনা কোনো খাবার, বিশেষ করে কোরবানির গোস্ত, আপনারা খাবেন না। সম্ভব হলে শিষ্টাচারের সাথে অস্বীকার করুন। যেমন বলতে পারেন: “আব্বা, আমরা আপনার দেওয়া সবকিছু ভালোবাসি, কিন্তু আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী সুদের টাকায় কেনা জিনিস খেতে পারি না। আপনি যদি মূল জমি বিক্রির টাকাটি ব্যবহার করেন বা হালাল উপায়ে আয় করেন, তাহলে আমরা খুশিমনে গ্রহণ করব।”

গ) পরিবারের পৃথক খাবার: যেহেতু আপনার স্বামীর আয় সম্পূর্ণ হালাল, তাই আপনারা শুধু সেই হালাল উপার্জন দিয়ে সংসার চালাবেন। শ্বশুর যখন আসেন, তখনও সম্ভব হলে নিজেরা আলাদাভাবে হালাল খাবার রান্না করুন।

ঘ) শ্বশুরের জন্য দোয়া: আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি তাকে হেদায়েত দেন এবং সুদ থেকে তওবা করার তাওফীক দেন।

সারসংক্ষেপ:

  • কোরবানি হালাল হয়নি, তাই সেই গোস্ত খাওয়া হারাম।
  • শ্বশুরের আনা অন্যসব বাজার-সদাইও সুদের টাকায় কেনা হওয়ায় তা খাওয়া জায়েজ নয়।
  • আপনারা নিজেরা হালাল উপার্জনে জীবনযাপন করবেন এবং সুদী খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকবেন।
  • শ্বশুরকে দলীলসহ বোঝাতে থাকুন, তবে তারা না মানলে আপনারা নিজেদের পবিত্রতা রক্ষার দায়িত্ব পালন করবেন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হালাল রিজিক প্রদান করুন ও সুদের অভিশাপ থেকে রক্ষা করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.