ফিরিয়ে দেয়ার শর্তে দোকান ক্রয় করা জায়েজ হবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
ফিরিয়ে দেয়ার শর্তে দোকান ক্রয় করা: ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিকোণ
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: প্রশ্নকারী তার বন্ধুর কাছ থেকে একটি দোকানের অর্ধেক অংশ ৭ লক্ষ টাকায় ক্রয় করতে চান। শর্ত হলো: বন্ধুটি প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকা ‘ভাড়া’ হিসেবে দিতে থাকবে, যতদিন না সে মূল ৭ লক্ষ টাকা ফেরত দিতে পারে। টাকা ফেরত দিলে দোকানের মালিকানা আবার তার কাছে ফিরে যাবে।
শরীয়তের বিধান: এই লেনদেন বৈধ নয়। এটি একটি সুদী চুক্তির (Riba) কৌশলগত রূপ (Hiyal) মাত্র।
কেন এটি অবৈধ?
১. শর্তযুক্ত বিক্রয় (Bay' al-Wafa): দোকানের অর্ধেক অংশ বিক্রি করা হচ্ছে, কিন্তু শর্ত দেওয়া হচ্ছে যে ক্রেতা (প্রশ্নকারী) বিক্রেতাকে (বন্ধু) প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকা ‘ভাড়া’ দেবে। অথচ প্রকৃতপক্ষে বিক্রেতা (বন্ধু) দোকানটি ব্যবহার করছে। এখানে ‘ভাড়া’ দেওয়ার অর্থ হলো যে টাকা তার কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে (৭ লক্ষ) তার ওপর অতিরিক্ত লাভ (ফায়দা) আসছে, যা সুদ (Riba)।
২. ঋণের বদলে লাভ নেওয়া: প্রকৃত অর্থে এটি একটি ঋণ (৭ লক্ষ টাকা) যার বিনিময়ে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ (১০,০০০ টাকা) আদায় করা হচ্ছে। ইসলামী শরীয়তে ঋণ থেকে কোনো লাভ নেওয়া হারাম। (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
৩. দুইটি পৃথক চুক্তির মিশ্রণ: এখানে একই সাথে বিক্রয় (সেল) এবং ভাড়া চুক্তি (ইজারা) ঘটছে, যা নবী করীম (ﷺ) নিষেধ করেছেন। যেমন হাদীসে এসেছে: “তিনি (ﷺ) নিষেধ করেছেন একই সাথে বিক্রয় ও ঋণের চুক্তি করতে।” (সুনান আবু দাউদ, তিরমিযী)
হানাফী ফিকহের উদ্ধৃতি:
-
রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী): এ ধরনের ‘শর্তযুক্ত ফেরত’ (বাই’ বিল ওয়াফা) লেনদেন হানাফী মাযহাবে মাকরূহ তাহরীমী (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) গণ্য। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) একে অবৈধ বলেছেন। (দেখুন: রদ্দুল মুহতার, ৪/৫০১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৩/২১৮)
-
ইমদাদুল ফাতাওয়া: আশরাফ আলী থানভী (রহ.) স্পষ্টভাবে বলেন, “দোকান বন্ধক রেখে ভাড়া নেওয়ার মতো লেনদেন জায়েয নয়।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৭)
-
আধুনিক ফাতাওয়া: মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারকাতুহুম) ‘বাই’ বিল ওয়াফা’ সম্পর্কে বলেন: “এটি বর্তমানে একটি নিষিদ্ধ কৌশল। বরং মুরাবাহা বা মুশারাকা ভিত্তিতে লেনদেন করাই সঠিক।” (মাসাইলে উসমানী, ২/৩৩৫)
বৈধ বিকল্প:
যদি বন্ধুর টাকার প্রয়োজন হয় এবং আপনিও লাভবান হতে চান, তাহলে নিচের পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করতে পারেন:
পদ্ধতি ১: মুরাবাহা (পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে ঋণ)
- আপনি বন্ধুকে ৭ লক্ষ টাকা কর্পোরেট রূপে ধার দিতে চাইলে তা জায়েয না।
- বরং বন্ধুকে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দেন, তারপর কিছু মুনাফা রেখে কিস্তিতে বিক্রি করেন। কিন্তু এখানে দোকানের ভাড়া নির্ধারণ করা যাবে না।
পদ্ধতি ২: মুশারাকা (যৌথ অংশীদারিত্ব)
- আপনি সরাসরি দোকানের অর্ধেক কিনে নিন (মূল্য ৭ লক্ষ) এবং তারপর আপনার অংশ বন্ধুকে ইজারা (ভাড়া) দিন।
- ভাড়ার পরিমাণ হবে বাজার দর অনুযায়ী, নিশ্চিত কোনো সংখ্যা নয়। তবে শর্ত থাকতে পারে না যে টাকা ফেরত দিয়ে মালিকানা ফিরিয়ে নেবে। মালিকানা স্থায়ী হবে, পরবর্তীতে বিক্রি করলেই কেবল ফিরবে।
পদ্ধতি ৩: সরল ঋণ (কর্জে হাসানা)
- বন্ধুকে ৭ লক্ষ টাকা ঋণ দিয়ে রাখুন। এর বিনিময়ে কোনো লাভ/ভাড়া নেবেন না। পরবর্তীতে সে যখনই পারবে টাকা ফেরত দেবে। এটি উত্তম সওয়াবের কাজ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য:
প্রশ্নকারীকে সতর্কতা: আপনার বর্ণিত লেনদেনটি সূদের ক্লাসিক উদাহরণ। মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি সুদ খায়, আল্লাহ তাআলা তাকে কবর থেকে এমন অবস্থায় উঠাবেন যে সে বিকৃত মস্তিষ্কের মতো হাঁটবে। (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
পরামর্শ: দোকানের অর্ধেক খাঁটি বিক্রয় করে নিন। প্রতি মাসে বন্ধু যদি ভাড়া দেন, তাহলে সেটা আপনার সম্পত্তি ভোগের বিনিময় হবে। কিন্তু শর্ত দেওয়া যাবে না যে টাকা ফেরত দিলে মালিকানা ফিরে যাবে। যদি বন্ধু টাকা ফেরত চান, তাহলে আপনি তাকে দোকানের অংশ পৃথকভাবে বিক্রি করতে পারেন, মূল্যের উপর লাভ-ক্ষতি স্বীকার করে।
উপসংহার: প্রশ্নে বর্ণিত ‘ফিরিয়ে দেয়ার শর্তে দোকান ক্রয় ও ভাড়া আদায়’ হারাম ও সুদী লেনদেন। এটি ত্যাগ করে উপরোক্ত বৈধ পদ্ধতি গ্রহণ করুন। আল্লাহ তাআলা হালাল রিজিকের ব্যবস্থা করবেন।
সূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৪:৫০১
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (ফাতাওয়া আলমগীরী), ৩:২১৮
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), ৪:২৭
- মাসাইলে উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী), ২:৩৩৫
- আল-হিদায়া (মারগীনানী), ৩:৯০