সিটি ব্যাংকের ইসলামী শাখায় রাখা টাকা রাখা কি জরুরী না সাধারণ শাখায়ও টাকা রাখা যাবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেবগণ,
আমি ডাচ্ বাংলা, সিটি ও ইসলামিক ব্যাংক ব্যাবহার করি।
ডাচ্ বাংলায় আমার স্যালারি আসে এবং আরো বেশ কিছু সুবিধা’র জন্য আমি এটা ব্যাবহার করি।
ইসলামি ব্যাংকেও টাকা জমা রাখতাম কিন্তু সম্প্রতি ইসলামি ব্যাংক নিয়ে অনেক খবর পড়ে বা দেখে সেখান থেকে টাকা সরিয়ে আমার সিটি ব্যাংকের একাউন্টে নিয়ে আসি। যদিও ইসলামি ব্যাংকের অন্যান্য সুবিধা গুলি কেমন ফোনে মেসেজ এলার্ট দেরিতে আসা, তাদের সাপোর্টে কল দিলে প্রফেশনাল ভাবে কথা না বলতে পারা এবং টেকনোলজির দিক দিয়েও তারা বেশি উন্নত না আমার মতে তাই তাদের সেবা ভালো লাগে না।
উল্লেখ্য যে আমি যে ব্যাংকই ব্যাবহার করি না কেনো যখনই কয়েকটা সুদ ঢুকে আমি সেগুলো বিনা সওয়াবের নিয়তে দান করে দেই। এক একাউন্টের গতো ৭-৮ বছরের সুদ বের করে বছর খানেক আগে সেই সুদ গুলো দান করে দেই।
এখন আমি সিটি ব্যাংকের সাথে লেনদেন করবো ইনশাআল্লাহ। তাদের সাথে কথা বলে বুঝলাম তাদের ইসলামি শাখা আছে যেখানে কোনো সুদ ঢুকে না। ইসলামি শারিয়াহ এর আলোকে নাকি সেটা পরিচালিত হয়।
এখন আমার জন্য কি খুবই জরুরী সিটি ব্যাংকের ইসলামি শাখায় একাউন্ট করা নাকি তাদের কনভেনশনাল একাউন্ট যেটা আমার বর্তমানে আছে সেটা থেকেই লেনদের চালিয়ে যাবো?
নতুন করে একাউন্ট করতে গেলে আবার কাগজ বা ছবি দিতে হবে ইত্যাদি৷
দয়া করে এ বিষয়ে জানালে অনেক উপকৃত হবো ইনশাআল্লাহ।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার উদ্বেগ ও সতর্কতা প্রশংসনীয়। নিচে হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো—
১. প্রচলিত সুদি ব্যাংক (Conventional Bank) ব্যবহারের বিধান
প্রচলিত ব্যাংকগুলো সুদ (রিবা) ভিত্তিক লেনদেন করে। সুদ গ্রহণ করা, দেওয়া, লেখা ও তার সাক্ষী হওয়া সকল প্রকার কাজই হারাম। কুরআন ও হাদীসে এর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। (সূরা আল-বাকারা ২:২৭৫-২৭৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৯৮)
হানাফী ফিকহের মূল গ্রন্থসমূহে বলা হয়েছে—
“সুদি লেনদেনের সাথে জড়িত যে কোনো চুক্তি হারাম, এবং মুসলিমের জন্য তার অর্থ এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে রাখা জায়েয নেই যা সুদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যদি না কোনো জরুরী প্রয়োজন থাকে।” (রদ্দুল মুহতার, ৫/১৬৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫২)
আপনি বর্তমানে ডাচ বাংলা ও সিটির প্রচলিত শাখায় একাউন্ট রেখেছেন। যদিও আপনি আগত সুদ দান করে দেন, তবুও একাউন্টটি নিজেই সুদি লেনদেনের মাধ্যম। তাই যতদূর সম্ভব এটি পরিহার করা উচিত।
২. ইসলামী শাখা বা ইসলামী ব্যাংকে একাউন্ট স্থানান্তরের গুরুত্ব
সিটি ব্যাংকের ইসলামী শাখা যদি সঠিকভাবে শরিয়াহ কমপ্লায়েন্ট হয় (অর্থাৎ মুরাবাহা, মুদারাবা, ইজারা প্রভৃতি বৈধ পদ্ধতিতে কাজ করে), তাহলে সেখানে একাউন্ট খোলা ও লেনদেন করা জায়েয এবং এটি অধিক পছন্দনীয়।
ফাতাওয়া উসমানী (২/২৮৫)-এ এসেছে—
“যদি কোনো ব্যাংকের একটি শাখা শরিয়াহ সম্মত পদ্ধতিতে চলে এবং অপর শাখা সুদি পদ্ধতিতে চলে, তবে মুসলিমের জন্য শরিয়াহ শাখায় লেনদেন করা উত্তম এবং সুদি শাখা থেকে দূরে থাকা আবশ্যক।”
আপনি লিখেছেন যে, সিটি ব্যাংকের ইসলামী শাখায় কোনো সুদ জড়িত নয় এবং তারা শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত হয়। তবে বাস্তবে তা নিশ্চিত করতে নিজে যাচাই করা জরুরি—যেমন তাদের পণ্য ও চুক্তিপত্র শরিয়াহ বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত কিনা।
৩. ‘প্রচলিত একাউন্ট রেখে সুদ দান করা কি যথেষ্ট?’
না, এটি যথেষ্ট নয়। কেননা—
- সুদের অর্থ নিজের সম্পদে মিশে গেলে তা অপবিত্র হয়। দান করার পরও একাউন্টে সুদি লেনদেন চলতে থাকে।
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন: “সুদ হারাম; তা ভোগ করাও হারাম, এবং তা নিজের থেকে বের করে দেওয়া ওয়াজিব, তবে এর মাধ্যমে একাউন্ট হালাল হয় না।” (শরহু মাআনিল আসার, ৪/৮৫)
- তাই আপনার একমাত্র বৈধ পথ হলো—পুরনো সুদি একাউন্ট বন্ধ করে শরিয়াহ সম্মত একাউন্টে স্থানান্তর করা।
৪. নতুন একাউন্ট খোলার ‘ঝামেলা’ কি গ্রহণযোগ্য ওজর?
ইসলামে হারাম থেকে বাঁচতে সামান্য কষ্ট স্বীকার করা আবশ্যক। কাগজপত্র, ছবি ইত্যাদি জোগাড় করা খুব বড় অসুবিধা নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি হারাম থেকে বাঁচার জন্য কোনো কিছু পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন।” (মুসনাদ আহমাদ, হাদীস ২২১৫)
অতএব, কিছুদিনের বা সামান্য অসুবিধাকে কারণে হারামে লিপ্ত থাকা জায়েয নয়।
৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ
- অবিলম্বে আপনার ডাচ বাংলা ও সিটির প্রচলিত একাউন্ট বন্ধ করে দিন।
- সিটি ব্যাংকের ইসলামী শাখায় অথবা সম্পূর্ণ ইসলামী ব্যাংকে (যেমন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড) একাউন্ট খুলুন।
- যদি ইসলামী শাখা সঠিকভাবে শরিয়াহ মেনে চলে, তবে সেখানেই লেনদেন করুন।
- ইতোপূর্বে আপনার একাউন্টে জমা হওয়া সুদ আপনি ঠিকই দান করে দিয়েছেন—এটি খুবই ভালো কাজ। এখন থেকে আর সুদি একাউন্ট রাখবেন না।
উত্তম পন্থা: আপনার বেতন ও অন্যান্য লেনদেন সম্পূর্ণভাবে সিটি ব্যাংকের ইসলামী শাখায় স্থানান্তর করুন। যদি ডাচ বাংলায় স্যালারি আসে, তবে নিয়োগকর্তাকে জানান যে আপনি একটি ইসলামী ব্যাংকে বা ইসলামী শাখায় বেতন স্থানান্তর করতে চান।
স্মরণ রাখবেন:
“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করে না।” (সূরা আত-তালাক, ৬৫:২-৩)
আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও তাওফিক দাতা।