বিরোধপূর্ণ জমির মিরাস কিভাবে বন্টন করতে হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
হুজুর আমার ফুফু আমার দাদার মৃত্যুর কয়েকবছর আগে দাদার কাছে একটি ৮ শতকের জমি দেওয়ার জন্য আবদার করে। সে জমি সহ আরো কিছু জমি আগে থেকেই চাষ করে আসছিল। দাদার কাছে আবদার করলে দাদা বলে "ঠিক আছে নিও "
এখন দাদার মৃত্যুর পর এই জমির মিরাস বন্টন নিয়ে চাচা ও ফুফুর বিরোধ চলমান।চাচাও এই জমির অংশ দাবি করছে। ফুফুর বক্তব্য দাদা তাকে দিয়েছে, চাচার বক্তব্য দাদা বুঝিয়েছে জমি বন্টনের সময় দিবে অথবা মিরাস বন্টনের সময় দিবে কিন্তু জমিতো পুরাপুরি বুঝিয়ে দেয় নি।
এখন এই জমি কি ফুফুর ধরে মিরাসের সম্পদ থেকে আলাদা করতে হবে নাকি মিরাসের সম্পদ ধরে পুরোটা ফুফুকে দেওয়া যাবে যেহেতু ভালো জমির মিরাস হিসাব করলে ফুফু প্রায় এই পরিমাণের মতো পাবে। ফুফুকে মিরাস হিসাবে এই জমি পুরোটা দিলে বিরোধ নিষ্পত্তির সম্ভাবনা আছে।আর জমি ফুফুর ধরে মিরাস থেকে আলাদা করে হিসাব করা হয় তখন ফুফু অন্য জমি থেকেও অংশ পায়, সেক্ষেত্রে বিরোধ বেড়ে যাবে।এক্ষেত্রে সমাধান কি অনুগ্রহ করে জানাবেন।
২. দাদীর ভাগে ৮ শতক জমি যদি এখন এই শেষ বয়সে মিরাসের মতো করে বন্টন করতে চায় তাহলে কে কতটুকু অংশ পাবে? তার ওয়ারিশ রয়েছে দুই ছেলে দুই মেয়ে। দাদা মৃত। আর দাদীর নিজের ৫ ভাই রয়েছে তারাও কি অংশ পাবে?
৩. ফুফু কি দাদার বসত বাড়ি থেকে অংশ পাবে? আমার বাবা, চাচা জীবিত আছে। এলাকায় প্রচলন রয়েছে বাবার ছেলে থাকলে মেয়েরা বসত বাড়ির অংশ পায় না। এটা কি সঠিক?
Answer
উত্তর দেওয়ার পূর্বে গুরুত্বপূর্ণ নোট:
আপনার প্রশ্নটি দীর্ঘ এবং একাধিক বিষয় জড়িত। আমরা প্রতিটি পয়েন্ট逐一ভাবে হানাফি ফিকহের কিতাব ও ফাতাওয়ার আলোকে উত্তর দেব। ইনশাআল্লাহ।
১. দাদার দেওয়া ৮ শতক জমি: হেবা (দান) নাকি মিরাস?
হেবার শর্ত:
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, কোনো জমি দান (হেবা) করতে হলে নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হতে হবে:
- ইজাব (দাতার স্পষ্ট ঘোষণা)
- কবুল (গ্রহীতার স্পষ্ট সম্মতি)
- কবজ (জমির পূর্ণ অধিকার হস্তান্তর ও দখল গ্রহণ)
কবজ (দখল) না হলে দান সম্পূর্ণ হয় না। যেমন ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় বলা হয়েছে:
"الهِبَةُ لَا تَتِمُّ إِلَّا بِالْقَبْضِ"
(আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা, ৪/৩৭৫)
এবং রদ্দুল মুহতারেও এসেছে:
"إِذَا مَاتَ الْوَاهِبُ قَبْلَ الْقَبْضِ بَطَلَتِ الْهِبَةُ"
(রদ্দুল মুহতার, ৫/৬৯২)
আপনার ফুফুর ক্ষেত্রে: দাদা শুধু বলেছেন "ঠিক আছে, নিও" — কিন্তু জমির দখল (কবজ) তিনি ফুফুকে পুরোপুরি বুঝিয়ে দেননি। ফুফু আগে থেকেই জমিটি চাষ করছিলেন, কিন্তু তা মালিকানা স্বত্বে নয়, বরং সম্ভবত দাদার অনুমতি নিয়ে চাষ করছিলেন। এ অবস্থায় দাদার মৃত্যুর পর সেই দান অসম্পূর্ণ (বাতিল) গণ্য হবে। তাই জমিটি দাদার মীরাসের অংশ হিসেবেই বণ্টন হবে।
সমাধানের বিকল্প:
- শরয়ী ফয়সালা: যদি সব ওয়ারিস (চাচা, ফুফু, আপনার বাবা ইত্যাদি) একমত হন যে ফুফুকে এই জমিটি তার মীরাসের অংশ হিসেবে দেওয়া হবে, তবে তা সুলহ (সমঝোতা) হিসেবে জায়েয। এতে বিরোধ নিষ্পত্তি হতে পারে।
- বাধ্যতামূলক নয়: ফুফু যদি দাবি করেন যে দাদা তাকে দান করেছেন, কিন্তু সেটি প্রমাণিত না হলে (কবজ ছাড়া) শরয়ি বিচারে তা অগ্রাহ্য হবে। তাহলে জমিটি সকল ওয়ারিসের মধ্যে মীরাসের নিয়মে বণ্টন হবে।
উল্লেখ্য: আপনি লিখেছেন ফুফু অন্য জমির অংশও পেলে বিরোধ বাড়বে। শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পত্তি বণ্টন কর্তব্য, আর তা যদি পারস্পরিক সম্মতিতে হয় তবে উত্তম। যদি ফুফু এই জমির বিনিময়ে অন্য সম্পত্তি থেকে কম নিতে রাজি হন, তাও জায়েয।
২. দাদীর ৮ শতক জমি শেষ বয়সে বণ্টন
দাদীর ওয়ারিস:
- দাদী জীবিত, দাদা মৃত।
- দাদীর ওয়ারিস: ২ ছেলে, ২ মেয়ে (স্বামী মৃত)।
- দাদীর ৫ ভাই কোনো অংশ পাবেন না, কারণ সন্তান থাকাকালে ভাইবোনগণ (সহোদর/বৈমাত্রেয়) বাদ পড়ে যান। [সূরা নিসা ৪:১২, ১৭৬]
বণ্টনের নিয়ম (মীরাস হিসেবে):
যদি দাদী চান তার জীবিত অবস্থায় এই জমি মীরাসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বণ্টন করতে (অর্থাৎ মৃত্যুর আগেই দান করে দিতে), তাহলে তিনি তা হেবা হিসেবে দিতে পারেন। তবে মীরাসের অংশ মানা জরুরি নয়; তিনি ইচ্ছা করলে সবার সমান বা অন্য কোনো অনুপাতেও দিতে পারেন।
তবে যদি তিনি মীরাসের নিয়ম মানতে চান, তাহলে হিসাব:
- ২ ছেলে: প্রত্যেকে পাবে = (২/৬) = ১/৩ অংশ (প্রায় ২.৬৬ শতক)
- ২ মেয়ে: প্রত্যেকে পাবে = (১/৬) = প্রায় ১.৩৩ শতক
হানাফি রেফারেন্স:
"فَإِنْ كَانَ لَهُ وَلَدٌ ذَكَرٌ وَأُنْثَىٰ فَلِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ"
(আল-হিদায়া, কিতাবুল ফারাইজ)
মৃত্যুর পর বণ্টন:
দাদীর মৃত্যু হলে উপরোক্ত হিসাব অনুযায়ী বণ্টন হবে। তার ভাইয়েরা কোনো অংশ পাবে না।
৩. বসতবাড়ি থেকে ফুফুর অংশ
শরয়ি বিধান:
মেয়েরা (ফুফু, খালা, বোন) পিতার সম্পত্তিতে পুরুষদের মতোই অধিকার রাখে। বসতবাড়ি মীরাসের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে যদি ছেলে থাকে, তবুও মেয়েরা তাদের শরয়ি অংশ পাবেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ"
(সূরা নিসা ৪:৭)
আপনার এলাকার প্রচলন: "বাবার ছেলে থাকলে মেয়েরা বসতবাড়ির অংশ পাবে না" — এটি জাহেলি প্রথা যা ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত। কোনো এলাকার প্রচলন যদি কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী হয়, তবে তা পরিত্যাজ্য। [সহীহ বুখারী, হাদীস: ২৭২১]
উত্তর:
ফুফু বসতবাড়ি থেকে তার শরয়ি অংশ পাবেন। তবে যদি বসতবাড়ি ভাগ করে নেওয়া কঠিন হয় (যেমন ছোট জমি), তাহলে সকল ওয়ারিস সম্মত হয়ে ফুফুকে অন্য সম্পত্তি দিয়ে তার অংশ বুঝিয়ে দিতে পারেন, অথবা বাড়ির মূল্য দিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু তাকে পুরোপুরি বঞ্চিত করা জায়েয নয়।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
| বিষয় | শরয়ি সিদ্ধান্ত | |-----------|---------------------| | ১. দাদার দেওয়া ৮ শতক জমি | হেবা সম্পূর্ণ হয়নি, তাই মীরাসের অংশ। সকলের সম্মতিতে ফুফুকে তার মীরাসের অংশ হিসেবে দেওয়া জায়েয। | | ২. দাদীর ৮ শতক জমি বণ্টন | ছেলে পাবে দ্বিগুণ, মেয়ে অর্ধেক। দাদীর ভাইয়েরা পাবে না। | | ৩. বসতবাড়িতে ফুফুর অংশ | ফুফু তার অংশ পাবেন। এলাকার প্রথা অগ্রাহ্য। |
আল্লাহ তাআলা উত্তম সমাধান দান করুন। আপনার পরিবারের মধ্যে সদ্ভাব ও ন্যায়বিচার বজায় রাখুন।
উত্তর প্রদানে: দারুল ইফতা, হানাফি ফিকহ