কিছু মেয়ে মিলে ছেলে সহপাঠী থেকে পড়া বুঝিয়ে নেওয়া সম্পর্কিত।
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমি অনার্স প্রথম বর্ষের ইকোনমিক্স ডিপার্টমেন্টের ছাত্রী। আমি ১ম বর্ষের পরীক্ষাটা দ্বিতীয়বার দিচ্ছি কারণবশত প্রথমবারেরটা খারাপ হওয়ায়। এখন আমি শেষ মুহূর্তে একটি প্রাইভেট ব্যাচে ভর্তি হয়েছি যেখানে বেশিরভাগই মেয়ে এবং খুবই কম ছেলে,বেশিরভাগ সময়ই ছেলে একজন আসে সেরকম একটা পরিবেশ। আমি শেষ মুহূর্তে আসাতে,মেইন দুইটা সাবজেক্ট গণিত ও পরিসংখ্যান এর ক্লাস পায়নি।! এখন আমার দুইটা ক্লাস পূরণ করা সম্ভব দুই মাধ্যমে সেগুলো হল : ১/ অনলাইনে ( যদিও সেখানে ফ্রি ক্লাস পাওয়া যায় না তেমন এবং খোঁজা কষ্টকর ও সময় সাপেক্ষ)। ২/ অফলাইনে - আমি যেখানে প্রাইভেট পড়ি সেখানে যে ছেলেটা রেগুলার আসে উনি এক ঘন্টা আগে ক্লাসে আসে এবং সে বুঝায় দেয় কেউ আগ্রহী থাকলে অর্থাৎ হেল্পফুল হিসেবে পরিচিত; সবাই তার থেকে হেল্প নেয় লেগিংস গুলোর জন্য কারণ তার ওই দক্ষতা রয়েছে।
# এখন মূল প্রশ্ন হল --- আমি যদি অনলাইনে পড়তে চাই সেখানে হিমশিম খাব আর আমার পড়া সময়মতো শেষ নাও হতে পারে!! তাহলে দ্বিতীয় অপশনটা হল অফলাইনে ওই ভাইয়া দেখে বুঝিয়ে নেওয়া।
** আমি যদি অন্যান্য আরো মেয়েদের সাথে মিলে তার কাছ থেকে পড়া বুঝিয়ে নিই তাহলে কি আমার গুনাহ হবে?? যদিও আমি সেখানে কন্ঠের ব্যবহার না করার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকব ;না পারতে করতে হলেও স্বাভাবিক/ কর্কশ রাখবো।
*** শুধু এই মাসখানেকের জন্য, যেহেতু আমি রিস্কি একটা পজিশনে রয়েছি সেহেতু ভাইয়াটা থেকে সাহায্য নেওয়া জায়েজ হবে?? যদিও অনেকজন মিলে??
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই আপনার শিক্ষাগত সংকটের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই। আপনার প্রশ্নটি মূলত এমন একজন পুরুষ সহপাঠীর কাছ থেকে পড়া বোঝানো নেওয়ার বৈধতা নিয়ে, যিনি অন্যান্য মেয়েদেরও সাহায্য করেন। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও পরদাহীন সংস্পর্শ নিষিদ্ধ। তবে প্রয়োজন ও বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে শরিয়ত কিছু ছাড় দিয়েছে, যাকে "দারুরাহ" বা জরুরত বলা হয়। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. নারী-পুরুষের মধ্যে শিক্ষামূলক সাহায্যের মূলনীতি
ইসলাম নারী-পুরুষের পর্দা ও সংযত আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
"আর ব্যভিচারের নিকটেও যেও না; নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২)
এবং নারীদের সম্বোধন করে বলেন:
وَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ
"আর তোমরা নরম কণ্ঠে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়।" (সূরা আহযাব: ৩২)
হানাফি ফকিহগণ বলেছেন: পুরুষের জন্য কোনো অমাহরাম নারীর সঙ্গে খলওয়া (একান্তে সাক্ষাৎ) এবং অপ্রয়োজনে নরম কণ্ঠে কথা বলা হারাম। (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৮১)
তবে প্রয়োজন ও জরুরত (যেমন শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ইত্যাদি) সীমিত পরিসরে অনুমোদিত, তবে শর্ত সাপেক্ষে।
২. আপনার পরিস্থিতির বিশ্লেষণ
আপনি একজন ছাত্রী, আপনার সামনে দুটি অপশন:
- অনলাইন: সম্ভব কিন্তু সময় স্বল্পতা ও অসুবিধার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ।
- অফলাইন: একজন পুরুষ সহপাঠী, যিনি নিয়মিত ক্লাসে আসেন এবং অন্য মেয়েরাও তার কাছ থেকে সাহায্য নেয়।
আপনার বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে:
- আপনি চাচ্ছেন অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে একসাথে তার কাছ থেকে পড়া বুঝে নিতে।
- আপনি কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণে রাখবেন, স্বাভাবিক/কর্কশ রাখবেন।
- এটি শুধু এই এক মাসের জন্য, কারণ আপনি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছেন (দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দেওয়া)।
৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে বিধান
ক. জরুরতের কারণে অনুমতি
হানাফি বিদ্যানদের মতে, প্রয়োজনে গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের মধ্যে সীমিত, শালীন ও প্রাসঙ্গিক কথাবার্তা জায়েজ। যেমন: শিক্ষা, চিকিৎসা, সাক্ষ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৪৫১; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৭৩)
শর্তগুলো হলো:
- একান্তে সাক্ষাৎ (খলওয়াত) না হওয়া - আপনার ক্ষেত্রে অন্য মেয়েরাও থাকবে, ইন শা আল্লাহ তা নিরাপদ।
- কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক ও কর্কশ রাখা - আপনি সচেতন আছেন, প্রশংসনীয়।
- কোনো প্রকার ফিতনার আশঙ্কা না থাকা - যেহেতু অনেক মেয়ে একসাথে সাহায্য নেয়, ফিতনার আশঙ্কা কম।
- সময় ও স্থান সীমিত করা - শুধু প্রয়োজনীয় সময়, বিশেষত পাবলিক জায়গায়।
খ. দারুরাহ (অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন)
আপনার বর্তমান অবস্থা (শেষ মুহূর্তে পড়া, অনলাইনে ক্লাস না পাওয়া, পরীক্ষার ঝুঁকি) জরুরত হিসেবে গণ্য হওয়ার যোগ্য। হানাফি ফিকহে "দারুরাহ" বলতে বোঝায় এমন অবস্থা যেখানে কোনো বৈধ উপায় ছাড়া কাজ সম্পন্ন না হওয়ার আশঙ্কা থাকে। (আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর, পৃ. ৮৮)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
الضرورة تبيح المحظورات بقدر ما يدفع الضرورة
"প্রয়োজন নিষিদ্ধ জিনিসকে ততটুকু হালাল করে, যতটুকু দিয়ে প্রয়োজন দূর হয়।" (রদ্দুল মুহতার, ১/২০৭)
সুতরাং আপনার জন্য অফলাইনে ওই ভাইয়ার কাছ থেকে গ্রুপের মধ্যে সাহায্য নেওয়া জায়েজ, যদি আপনি নিচের শর্তগুলো মেনে চলেন।
৪. আপনার জন্য ব্যবহারিক নির্দেশনা
- গ্রুপে সাহায্য নিন: একা তার কাছে না গিয়ে অন্য মেয়েদের সঙ্গে একসাথে বসে পড়া বুঝুন।
- কণ্ঠ ও আচরণ সংযত রাখুন: স্বাভাবিক বা কর্কশ কণ্ঠে কথা বলুন, নরম ও আকর্ষণীয় স্বর এড়িয়ে চলুন। (সূরা আহযাব: ৩২-এর নির্দেশ)
- দৃষ্টি অবনত রাখুন: অনিচ্ছাকৃতভাবে সরাসরি তাকানো গেলে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিন। (সূরা নূর: ৩০-৩১)
- প্রয়োজন মিটলেই গিয়ে বসবেন না: শুধু আপনার ক্লাসের বিষয় শেষ হলে উঠে আসুন, অপ্রয়োজনীয় আড্ডা নয়।
- নিয়ত শুদ্ধ করুন: একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জ্ঞানার্জনের জন্য সাহায্য নিচ্ছেন, ফিতনার উদ্দেশ্য নয়।
৫. সংশ্লিষ্ট হানাফি গ্রন্থের উদ্ধৃতি
- রদ্দুল মুহতার (১/৪০৬): "গায়রে মাহরাম নারীর দিকে তাকানো বা একান্তে কথা বলা নিষিদ্ধ, তবে সাক্ষ্য, চিকিৎসা বা শিক্ষার মতো জরুরি প্রয়োজনে অনুমতি আছে।"
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৭৩): "যদি কোনো মহিলা ইলম শেখার জন্য পুরুষ শিক্ষকের কাছে যায়, তবে পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করতে হবে এবং একান্তে যাওয়া যাবে না।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৪৫১): "শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের ছেলেদের কাছে পড়া জায়েজ, যদি ফিতনার আশঙ্কা না থাকে এবং পর্দা ও শালীনতা বজায় থাকে।"
৬. উপসংহার
আপনার জন্য অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে একসাথে ওই ভাইয়ার কাছ থেকে পড়া বুঝে নেওয়া, শুধু এই এক মাসের প্রয়োজনে এবং উপরোক্ত শর্তসমূহ মেনে চললে, জায়েজ হবে। ইন শা আল্লাহ তাতে আপনার কোনো গুনাহ হবে না, বরং আপনি ইলম অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবেন।
তবে চেষ্টা করুন যত দ্রুত সম্ভব অনলাইন বা অন্য কোনো ব্যবস্থা করে নিজে নিজেই বুঝে নেওয়ার। আর আল্লাহর কাছে সাহায্য চান – নিশ্চয় তিনি সর্বোত্তম সহায়।
والله أعلم بالصواب