হারাম সম্পর্কের পর তওবা করে বিয়ে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি ২/৩ বছর হবে হারাম সম্পর্কে ছিলাম।তার আগে আমি আল্লাহর একান্ত অনুগত ছিলাম।আমি প্রাক্টিসিং মুসলিমাহ ছিলাম। কিন্তু আমি আল্লাহর অবাধ্যতায় জড়ায় পরি। আর এটা আমাকে অনেক কষ্ট দিত প্রায়ই। আমি চাইলেও এটা থেকে বের হয়ে আসতে পারি নি।আমি পরিবার এ ওই ছেলের ব্যাপারে বলি ২ বছর আগে। তখন আমার পরিবার রাজি ছিল না।এরপর আমি সব ভেবে বের হয়ে আসতে চাই, ছেলেকেও বলি কিন্তু বেশি দিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকাটা সম্ভব হয় না। এখন রাজি আমার পরিবার তার সাথে আমার বিয়ে দিতে। আমিও পরিবারের সম্মতিতে অনেক খুশি।
কিন্তু সম্প্রতি আমি স্বপ্ন দেখলাম ছেলেটি অন্য মেয়ের সাথে অন্তরঙ্গ হয়েছে আর আমাকে কেউ সেটা দেখাচ্ছে, আর আমি নিজেই সেটা দেখছি। তারপর দিন স্বপ্ন দেখি আমার প্রতি সে উদাসিন, আমি কিছু একটা তার কাছে চাইলাম কিন্তু সে দিতে রাজি হল না।
এমন স্বপ্ন দেখার পর চিন্তা হয় এমনটা কেন দেখলাম।
আজ আবার স্বপ্ন দেখলাম, ছেলেটি আমাকে মিথ্যা বলছে। সে অন্য এক মেয়ের সাথে ফোন এ কথা বলছে।
মানে ২ স্বপ্ন মুল বিষয় ছিল ছেলেটি অন্য মেয়ের সাথে জড়িয়ে আমাকে ধোকা দিচ্ছে।
( বাস্তবে ছেলের চরিত্র এমন নয়। সে ভাল, আমার প্রতি বিশ্বস্ত, নামায পরে রোজা রাখে, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববান,)
তাই বাস্তব এর সাথে এমন স্বপ্নের মিল পাচ্ছি না।
তবে একটা কথা উল্লেখ্য তার সাথে আমার বৈবাহিক সম্পর্ক কেমন হবে, সে এখন যেমন সারাজীবন ঠিকঠাক এমন থাকবে কি না, আমাকে কষ্ট দিবে কি না এসব নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবনা আসে। আবার এমন না যে এসব নিয়ে খুব বেশি ভাবতে থাকি সারাদিন।
তবে একটা ভয় হয়, আমি হারাম সম্পর্কে ছিলাম এতদিন। আমি জানি এটা আল্লাহর অবাধ্যতা।
আমি অনেক বার তওবাও করছি আল্লাহর কাছে যে আমি হারাম থেকে বের হয়ে আসব। কিন্তু আমি পারি নি বের হতে। আমার খুব অপরাধবোধ হয় এসব ভাবলে, আবার কিছু করতেও পারি না। আমি সত্যি আমার আগের মত হালাল ভাবে জীবনযাপন করতে চাই।
আর আমি এটা ভয় পাই আর চিন্তা করি খুব যে আমার এই জেনে বুঝে হারাম এ থাকার কারনে আল্লাহ শাস্তি হিসেবে ওই ছেলের সাথে আমার বিবাহিত জীবন অসুখি করবেন কি না। পরোকিয়া দিন দিন অনেক বেড়ে যাচ্ছে। আমি এটা নিয়ে ভয় পাই, এসব আমার পাপের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ আমকে এসব এর মুখোমুখি করবেন কি না।
এই স্বপ্ন গুলা আমি দিন এর বেলা দেখেছি। আর এসব স্বপ্ন আল্লাহর তরফ থেকে কোন বার্তা কিনা আমি বুঝতে পারছি না। আমি আল্লাহর কাছে দুয়া করেছি অনেক বার আল্লাহ যেন ওই ছেলের সাথে আমার বিয়ে দেন খুব দ্রুত এবং বিয়েতে কল্যাণ দেন, আমাদের একে অপর কে একে অপরের জন্য কল্যাণকর করেন। ছেলেটিও আমাকে বিয়ে করার ব্যাপারে আমার থেকে বেশি দুয়া করছে আল্লাহর কাছে। এখনো করে।
এমতাবস্থায় বিয়ের ব্যাপারে পরিবারের সম্মতি এবং বিয়ের দিকে আগানো অনেক খুশির বিষয় আর ইতিবাচক। কিন্তু এর মাঝে হঠাৎ এমন স্বপ্ন দেখার মানে কি?
Answer
বোনের প্রশ্নের উত্তর
স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও বাস্তবতার সাথে সম্পর্ক
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, স্বপ্ন তিন প্রকার:
- আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ
- শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শন বা কুমন্ত্রণা
- মনের কল্পনা বা চিন্তার প্রতিফলন (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৯৮৫)
আপনি যে স্বপ্নগুলো দেখেছেন, সেগুলো দিনের বেলায় দেখেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। দিনের বেলার স্বপ্ন সাধারণত মনের চিন্তা-ভাবনা বা শয়তানের প্ররোচনার ফল হয়। বিশেষ করে যখন কোনো বিষয় নিয়ে মনের মধ্যে উদ্বেগ থাকে, তখন স্বপ্নে তা প্রতিফলিত হয়।
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- ছেলেটি বাস্তবে ভাল, বিশ্বস্ত, নামাযী, রোজাদার, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববান
- আপনি বিয়ের বিষয়ে খুব খুশি, কিন্তু মনের গভীরে ভয় কাজ করছে যে আপনার অতীতের পাপের কারণে আল্লাহ শাস্তি স্বরূপ এই বিয়ে অসুখী করে দেবেন কিনা
- আপনি বারবার তওবা করেছেন কিন্তু সম্পর্ক ছাড়তে পারছিলেন না
এই অবস্থায় স্বপ্নে ছেলেটির সাথে প্রতারণার বিষয় দেখা আপনার মনের এই ভয় ও অপরাধবোধের প্রতিফলন। এটি "হাদীসুন নাফস" অর্থাৎ মনের কল্পনা হিসেবে গণ্য হবে, যা শয়তান আপনার মনে সন্দেহ ও ভীতি সৃষ্টি করার জন্য ব্যবহার করছে।
আপনার অতীত পাপ ও বর্তমান বিয়ের সম্পর্ক
আল্লাহর রহমত ও তওবা সম্পর্কে কুরআনের ঘোষণা:
قُلْ يَاعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
"বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
আপনার অতীতের পাপ আল্লাহর রহমতের চেয়ে বড় নয়। আপনি যখন আন্তরিকভাবে তওবা করছেন এবং সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন, আল্লাহ অবশ্যই তা কবুল করবেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন: "তওবার পর আল্লাহ পাপের শাস্তি দেন না, বরং তার রহমত তার গজবের উপর প্রাধান্য পায়।"
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ উল্লেখ করেন: "যখন বান্দা গুনাহ থেকে তওবা করে, তখন আল্লাহ তার পাপ মাফ করে দেন এবং পূর্বের নেক আমলের উপর তাকে রাখেন।" (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪২২)
বর্তমান বিয়ের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে পরামর্শ
১. ইসতিখারার গুরুত্ব: বিয়ের আগে দুই রাকাত নফল নামায পড়ে ইসতিখারা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
إِذَا هَمَّ أَحَدُكُمْ بِالْأَمْرِ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ مِنْ غَيْرِ الْفَرِيضَةِ ثُمَّ لْيَقُلْ...
"তোমাদের কেউ যখন কোনো কাজের ইচ্ছা করে, তখন সে যেন ফরয ব্যতীত দুই রাকাত নামায পড়ে, তারপর দোয়া পড়ে..." (সহীহ বুখারী: ১১৬২)
আপনি যদি ইতিমধ্যে ইসতিখারা করে থাকেন এবং ইসতিখারার পর আপনার মন বিয়েতে সায় দিয়ে থাকে, তাহলে স্বপ্নের কারণে দ্বিধা না করে বিয়ে সম্পন্ন করুন।
২. শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচুন: ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন: "শয়তান মানুষের অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে, বিশেষ করে যখন কোনো নেক কাজ বা বিয়ের সিদ্ধান্ত হয়। সে চায় না মানুষ হালাল পথে জীবন শুরু করুক।"
আপনার বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে শয়তান আপনাকে এই বিয়ে থেকে বিরত রাখতে চাইছে। আপনি এখন তওবা করে হালাল পথে আসতে চাইছেন, তাই শয়তান বিভিন্ন উপায়ে আপনাকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে।
৩. পরিবারের সম্মতি ও ছেলেটির ভালো চরিত্র:
- পরিবার বর্তমানে রাজি - এটি একটি বড় ইতিবাচক দিক
- ছেলেটি নামাযী, রোজাদার, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববান - এগুলো উত্তম স্বামীর লক্ষণ
- তিনি নিজেও বিয়ের জন্য দোয়া করছেন
ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে: পরিবারের সম্মতি ও উপযুক্ত পাত্রের উপস্থিতিতে বিয়েতে দেরি করা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: "যখন তোমাদের কাছে সেই ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব দেয়, যার দ্বীন ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তাহলে তাকে বিয়ে দাও। অন্যথায় জমিনে ফিতনা ও বড় অশান্তি ছড়িয়ে পড়বে।" (তিরমিযী: ১০৮৪)
সুপারিশ ও পরামর্শ
১. স্বপ্নকে গুরুত্ব না দিয়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে আর মন্দ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে। তাই মন্দ স্বপ্ন দেখলে:
- বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলুন
- শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান
- ডান দিকে শুয়ে থাকলে বাম দিকে ঘুরে যান
- কাউকে স্বপ্নের কথা না বলে দিন
২. তওবা অব্যাহত রাখুন: তওবার পরও যদি কোনো কারণে পুনরায় পাপে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে আবার তওবা করুন। আল্লাহর দরজা সবসময় খোলা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: "সব আদম সন্তান পাপী, আর সর্বোত্তম পাপী তারা যারা তওবা করে।" (তিরমিযী: ২৪৯৯)
৩. বিয়ের দিকে এগিয়ে যান: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- পরিবার রাজি
- পাত্র দ্বীনদার ও সচ্চরিত্র
- উভয়েই বিয়ে করতে আগ্রহী
- কোনো বৈধ বাধা নেই
তাই স্বপ্নের কারণে বিলম্ব না করে যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করুন।
৪. দোয়া অব্যাহত রাখুন: আপনার দোয়া "আল্লাহ যেন ওই ছেলের সাথে বিয়ে দেন এবং বিয়েতে কল্যাণ দেন" - এই দোয়া চালিয়ে যান। দোয়া কবুলের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকুন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
স্বপ্নগুলোর অর্থ: আপনার মনের ভয় ও অপরাধবোধের প্রতিফলন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বার্তা নয়, বরং শয়তানের ওয়াসওয়াসা যা আপনাকে হালাল বিয়ে থেকে বিরত রাখতে চায়।
আপনার করণীয়: স্বপ্নকে গুরুত্ব না দিয়ে আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করুন। বিয়ের সিদ্ধান্তে অটল থাকুন। ইসতিখারা করে বিয়ে সম্পন্ন করুন।
আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা রাখুন: আপনার তওবা আল্লাহ কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ। আপনার পাপের শাস্তি হিসেবে বিয়ে অসুখী হবে - এমন ধারণা ভুল। বরং আপনি যখন তওবা করে হালাল পথে ফিরছেন, আল্লাহ তার রহমতে আপনার জীবনকে কল্যাণময় করে তুলবেন।
আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন।
মেটা ডিসক্রিপশন:
SEO কিওয়ার্ডস: স্বপ্নের ব্যাখ্যা, হারাম সম্পর্ক, তওবা, বিয়ে, শয়তানের ওয়াসওয়াসা, ইসতিখারা, স্বপ্নে প্রতারণা
সার্চ ফ্রেজ:
- বিয়ের আগে মন্দ স্বপ্ন দেখলে কি করবেন
- স্বপ্নে দেখা যে পাত্র অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্ক করছে
- হারাম সম্পর্কের পর তওবা করে বিয়ে
- স্বপ্ন কি আল্লাহর পক্ষ থেকে বার্তা
- ইসতিখারার পর স্বপ্ন দেখা