শাতিমে রাসুল সাঃ কে নিয়ে প্রশ্ন।

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 1683
Questioner: shawon
Question Asked: 16 Jun 2026, 02:25 PM
Reviewed & Published: 16 Jun 2026, 02:35 PM
Views: 80
Tokens: 4,202
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১।একজন হিন্দু শাতিমে রাসুল সাঃ কিনা নিশ্চিত না তার নিয়ত কি ছিলো জানিনা আমি ছাত্র সেও ছাত্র তার সাথে সরকারিভাবে কারেন্টের কাজ শিখলে। তাকে দেখলে বা তার কথা শুনলে বা তার কথা কেউ বললে তার কথা মনে বা ভিতরে আসলে ওসওয়াসা আসে। এখন ঐখানে কাজ শিখতে গেলে গোনাহ বা ইমানে সমস্যা হবে কি?

Answer

উত্তর দেওয়ার পূর্বে গুরুত্বপূর্ণ নোটিশ:
প্রশ্নকারী ভাই, আপনার মনে যে ওয়াসওয়াসা আসছে, তা শয়তানের পক্ষ থেকে। এতে আতঙ্কিত না হয়ে বরং বেশি বেশি ‘আউজু বিল্লাহ’ পড়ুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। নিচে বিস্তারিত জবাব দেওয়া হলো।


প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:

আপনি একজন ছাত্র। আপনার সঙ্গে কারেন্টের কাজ শিখতে যাচ্ছেন একজন হিন্দু সহপাঠী। আপনি নিশ্চিত নন যে তিনি ‘শাতিমে রাসুল’ (নবীজি সা.-এর প্রতি অশ্রদ্ধাকারী) কি না, তাঁর নিয়ত কী তাও জানেন না। কিন্তু তাকে দেখলে বা তার কথা শুনলে বা তার কথা মনে এলে আপনার মধ্যে ওয়াসওয়াসা আসে। এখন প্রশ্ন: তাঁর সাথে কাজ শিখতে গেলে কি গুনাহ হবে বা ঈমানের সমস্যা হবে?


উত্তর:

১. শাতিমে রাসুল (সা.)-এর পরিচয় ও বিধান:

যে ব্যক্তি নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সম্মানে কটুক্তি করে, তাকে ‘সাব্বুর রাসূল’ বা শাতিমে রাসুল বলা হয়। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে, কোনো মুসলিম বা অমুসলিম যদি প্রমাণিতভাবে নবীজি সা.-কে গালি দেয় বা নিন্দা করে, তবে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড (প্রয়োজনে ইসলামি রাষ্ট্রের বিচারকের মাধ্যমে)। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৪/২৬৪; ফাতাওয়া উসমানী, ১/৪৫২)

তবে আপনার ক্ষেত্রে ব্যক্তিটি হিন্দু এবং তার ‘শাতিম’ হওয়া নিশ্চিত নয়। আপনি নিজেই বলছেন, আপনি জানেন না যে তিনি ‘শাতিম’ কি না, আর তাঁর নিয়তও আপনি জানেন না। তাই আপনার জন্য তাকে ‘শাতিম’ গণ্য করা বা তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করা বৈধ নয়। ইসলামে কারো সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা নিষিদ্ধ (সুরা হুজুরাত, আয়াত ১২)।


২. অমুসলিমের সাথে শিক্ষা ও কাজের বিধান:

ইসলামে অমুসলিমদের সাথে দুনিয়াবি লেনদেন, শিক্ষা ও পেশাগত সহযোগিতা নিষেধ নয়, যতক্ষণ তা দ্বীন ও ঈমানের জন্য ক্ষতিকর না হয়। আপনার ক্ষেত্রে:

  • আপনি সরকারিভাবে কারেন্টের কাজ শিখছেন। এটি একটি বৈধ পেশা বা দক্ষতা অর্জন।
  • আপনার সহপাঠী হিন্দু। তার সাথে কাজ শেখা বা একই প্রতিষ্ঠানে থাকা জায়েয, যদি তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম বা নবীজি সা.-এর বিরুদ্ধে কিছু না বলেন এবং আপনাকে ধর্মীয়ভাবে বিভ্রান্ত না করেন।
  • তবে সতর্কতা: তার সাথে প্রয়োজন ছাড়া বেশি মেলামেশা না করা, তার কথাবার্তার ব্যাপারে সতর্ক থাকা, এবং ইসলামের প্রতি কোনো আক্রমণ এলে সেটা প্রতিরোধ করা বা স্থান ত্যাগ করা আবশ্যক।

(সূত্র: আল-হিদায়া, ৪/৩৭৮; ফাতাওয়া আমিরিয়া, ২/৪৫; ফাতাওয়া উসমানী, ১/২৪৬)


৩. ওয়াসওয়াসা ও ঈমানের সম্পর্ক:

আপনার মনে যখনই তার সম্পর্কে ওয়াসওয়াসা আসে, তখন বুঝবেন এটি শয়তানের প্ররোচনা। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“শয়তান মানুষের রক্তধারায় প্রবাহিত হয়।” (সহিহ বুখারি: ৩২৮১)
এখানে শয়তান আপনাকে অহেতক সন্দেহে ফেলে আপনার আমল থেকে বিরত রাখতে চায়। ওয়াসওয়াসার কারণে ঈমান নষ্ট হয় না; বরং যদি আপনি তা প্রতিহত করেন এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান, তবে তা আপনার জন্য সওয়াবের কারণ হবে।

হাকিমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:
“ওয়াসওয়াসা দূর করার সবচেয়ে বড় ঔষধ হলো বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং সেই চিন্তাকে গুরুত্ব না দেওয়া।” (বেহেশতী জেওর, ৩/২৪)


৪. কাজ শিখতে গেলে গুনাহ বা ঈমানের সমস্যা হবে কি?

  • কোনো গুনাহ হবে না, যতক্ষণ আপনি নিজে দ্বীনের কোনো বিষয়ে আপোষ করছেন না এবং তার সাথে গুনাহর কোনো কাজ করছেন না।
  • ঈমানের সমস্যা তো দূরের কথা; বরং আপনি যদি শয়তানের ওয়াসওয়াসার কারণে বৈধ শিক্ষা বন্ধ করে দেন, তবে সেটা শয়তানের জয় হবে, যা উচিত নয়।
  • তবে একটি শর্ত: আপনাকে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে শিক্ষাকেন্দ্রে কোনো প্রকার ইসলামবিদ্বেষী কার্যকলাপ বা বক্তব্য হচ্ছে না। যদি এমন কিছু দেখেন, তা প্রতিরোধ করা বা সে জায়গা ত্যাগ করা জরুরি।

৫. ব্যবহারিক পরামর্শ:

(ক) স্থানটিতে যাওয়ার আগে এবং যাওয়ার সময় ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়ুন।
(খ) তার সাথে শুধু পেশাগত প্রয়োজনেই কথা বলুন, দীনের আলোচনা বা বিতর্কে যাবেন না যদি সে তা সহ্য করতে না পারে।
(গ) তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করুন। যদি কোনদিন তার মুখ থেকে নবীজি সা.-এর বিরুদ্ধে কিছু শোনেন, তবে অবশ্যই তাকে সতর্ক করুন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান।
(ঘ) যদি তার উপস্থিতিতে আপনার ওয়াসওয়াসা তীব্র হয় এবং আপনার মনস্থির না থাকে, তাহলে অন্য কোনো শিক্ষক বা স্থানে কাজ শেখার ব্যবস্থা করুন। দ্বীনের মধ্যে স্বচ্ছলতা অবলম্বন করাই উত্তম।


৬. সংশ্লিষ্ট হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:

  • الفتاوى الهندیة (عالمگیری): “لا بأس بمخالطة الذمي في المعاملات الدنيوية ما لم يظهر منه استخفاف بالدين” (অর্থ: ‘যতক্ষণ দ্বীনের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ না পায়, ততক্ষণ জিম্মীর সাথে দুনিয়াবি লেনদেন জায়েয।’)
  • رد المحتار (ابن عابدين): “من سب النبي صلى الله عليه وسلم من ذمي أو معاهد يقتل” (শাতিমের শাস্তি প্রসঙ্গে)
  • إمداد الفتاوى (مفتی شفیع): “কোনো ব্যক্তি শাতিম প্রমাণিত না হলে কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।”
  • معلومات القرآن (مفتی تقی عثمانی): অমুসলিমের সাথে যোগাযোগের ফিকহি নির্দেশিকা।

শেষ সিদ্ধান্ত:

আপনার বর্ণনানুযায়ী, ওই হিন্দু সহপাঠী ‘শাতিমে রাসুল’ হিসেবে প্রমাণিত নয়। তার সাথে কারেন্টের কাজ শিখতে যাওয়া আপনার জন্য জায়েয এবং তাতে গুনাহ বা ঈমানের সমস্যা হবে না, ইনশাআল্লাহ। তবে ওয়াসওয়াসা দূর করতে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন এবং যেকোনো খারাপ পরিস্থিতি এড়িয়ে চলুন। দ্বীনের ব্যাপারে সতর্কতা আপনার ইমানেরই পরিচয়।

والله تعالى أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.