কার্টুনের ছবি আঁকা বাচ্চাদের পানির বোতল বিক্রি সম্পর্কে
Halal and Haram · Hanafi
Question
বাচ্চাদের পানির বোতলে বিভিন্ন কার্টুন ক্যারেক্টার এর ছবি আঁকা থাকে। সেসব পানির বোতল বিক্রি করা অথবা মার্কেটিং কি জায়েজ আছে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম: বাচ্চাদের পানির বোতলে বিভিন্ন কার্টুন ক্যারেক্টারের ছবি আঁকা থাকে—এমন বোতল বিক্রি করা বা মার্কেটিং করা কি জায়েজ?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, এটি জায়েজ নয়। বরং এমন বোতল বিক্রি, ক্রয় বা মার্কেটিং করা শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয (হারাম) বলে গণ্য হবে। কারণ এতে প্রাণীর (মানুষ বা পশু-পাখির) ছবি বা প্রতিকৃতি বিদ্যমান, যা ইসলামে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ।
দলিল ও হানাফী ফিকহের উদ্ধৃতি
১. কুরআন ও হাদীসের আলোকে ছবির নিষিদ্ধতা
-
হাদীস:
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যারা ছবি তৈরি করে তাদেরকে কিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। তাদের বলা হবে, তোমরা যা সৃষ্টি করেছো তাতে প্রাণ সঞ্চার করো।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৯৫১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২১০৮)
- আরও বলেন: "ফেরেশতারা সেই ঘরে প্রবেশ করেন না যেখানে কুকুর বা ছবি থাকে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৯৫৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২১০৬)
-
হাদীসের আলোকে প্রাণীর ছবি বা মূর্তি যেকোনো মাধ্যমে (আঁকা, ভাস্কর্য, ছাপা) তৈরি করা, রাখা, বিক্রি করা এবং ব্যবহার করা হারাম।
২. হানাফী ফিকহের গ্রন্থসমূহে বিধান
-
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন):
"প্রাণীর ছবি তৈরি করা হারাম, তা মানুষ হোক বা পশু-পাখি, তা দেয়ালে আঁকা হোক, কাপড়ে ছাপা হোক, বা কাগজে আঁকা হোক। এমন ছবি বিক্রি করা, ক্রয় করা, এবং ব্যবহার করাও হারাম।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭১, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা) -
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী):
"প্রাণীর ছবি যেখানে সম্মানিত অবস্থায় থাকে (যেমন দেয়ালে ঝুলানো) সেখানে রাখা নিষেধ। তবে মেঝেতে, গালিচায়, বা বালিশে ছবি থাকলে তা অনুমোদিত যদি ছবির প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা হয় (পায়ে মাড়ানো)।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৭২) -
ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী):
"পানির বোতল, টিফিন বক্স, কাপড় ইত্যাদিতে প্রাণীর ছবি ছাপানো বা আঁকা জায়েয নয়। এমন বস্তু বিক্রি করাও জায়েয নয়, কেননা ক্রেতা সেই ছবি ব্যবহার করবে।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩০১) -
মারেফুল কুরআন (মুফতী মুহাম্মদ শফী):
সূরা মায়েদার ৯০-৯২ নং আয়াতের তাফসীরে মূর্তি ও প্রতিকৃতি নিষিদ্ধ হওয়ার প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, "প্রাণীর ছবি কোনো অবস্থাতেই জায়েয নয়, যদি না তা অসম্পূর্ণ (যেমন মাথা বিহীন) বা এমন জায়গায় থাকে যেখানে অবজ্ঞা হয় (যেমন পায়ের তলায়)।" (মারেফুল কুরআন, ৩/২৩৩)
৩. হানাফী ইমামগণের বক্তব্য
-
ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ):
তিনি প্রাণীর সম্পূর্ণ ছবি (যেখানে চোখ-নাক-মুখ স্পষ্ট) তৈরি করাকে হারাম, আর অসম্পূর্ণ ছবি (যেমন মাথা কাটা) মাকরূহ বলেছেন। (শরহু মায়ানিল আসার, ৪/৩০৬) -
ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ):
তারা বলেছেন, "যে ছবি দেয়ালে টাঙানো হয় বা সম্মানের সাথে রাখা হয়, তা হারাম; কিন্তু যে ছবি পায়ের নিচে মাড়ানো হয় (যেমন গালিচা) তা জায়েয।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭২)
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কার্টুন ক্যারেক্টারের ছবি
- কার্টুন ক্যারেক্টার সাধারণত মানুষ বা পশু-পাখির প্রতিরূপ (স্টাইলাইজড হলেও) প্রাণীর বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। সেক্ষেত্রে এগুলো সম্পূর্ণ প্রাণীর ছবির অন্তর্ভুক্ত। হানাফী ফিকহে এ জাতীয় ছবি হারাম।
- শুধু শিশুদের ব্যবহার বা চাহিদা থাকলেই তা বৈধ হয় না, বরং শরয়ী নিষেধাজ্ঞা অপরিবর্তিত থাকে। হ্যাঁ, শুধুমাত্র খেলনা পুতুল (ত্রিমাত্রিক) শিশুদের জন্য অনুমোদিত একটি বিশেষ ব্যতিক্রম, কারণ হাদীসে আয়েশা (রাঃ)-এর পুতুল খেলার অনুমতি আছে। কিন্তু দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক অন্য কোনো প্রাণীর ছবি সেই ব্যতিক্রমের আওতাভুক্ত নয়।
পরামর্শ
- পানির বোতল নির্বাচনে সতর্কতা অবলম্বন করুন। যেসব বোতলে প্রাণীর ছবি নেই (যেমন ফুল, ফল, জ্যামিতিক নকশা ইত্যাদি) সেগুলো ব্যবহার ও বিক্রি করুন।
- ইতিমধ্যে ক্রয়কৃত বোতল থাকলে সেগুলো ব্যবহার না করাই উত্তম। তবে যদি ছবিটি অস্পষ্ট, মুছে ফেলা যায়, বা অসম্পূর্ণ হয় (যেমন মাথা বিহীন) তাহলে হানাফী মতে তা মাকরূহ তানযীহী হলেও জায়েয হওয়ার অবকাশ আছে; কিন্তু সম্পূর্ণ ছবি হলে তা নাজায়েয।
উপসংহার:
বাজারে প্রচলিত অধিকাংশ কার্টুন ক্যারেক্টারের ছবি সম্পূর্ণ প্রাণীর প্রতিরূপ হওয়ায় এগুলো হারাম। তাই এ ধরনের বোতল বিক্রি করা, ক্রয় করা, বা মার্কেটিং করা জায়েয নয়। ব্যবসায়ীদের উচিত আল্লাহর নাফরমানি থেকে বেঁচে হালাল উপার্জনের পথ বেছে নেওয়া।
والله أعلم بالصواب