মুনাজাতে ভুলবশত ‘জান্নাত চাওয়া’-র বদলে ‘জান্নাত থেকে আশ্রয় চাওয়া’ বললে সমস্যা হবে?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আমি মুনাজাতের সময় গাফিলতির কারণে "আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল জান্নাতুল ফেরদাউস" এর বদলে "আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল জান্নাতুল ফেরদাউস" বলে ফেলি, যদিও নিয়ত জান্নাত চাওয়ার ই ছিলো। বিষয় টা মনে পরার সাথে সাথে আমি ঠিক করে আবার চাই এবং আল্লাহ্ তা'আলার কাছে বলি যে আমার ভুল দোয়া কবুল করতে না। এখন আমার ভয় হচ্ছে যদি আমার গাফিলতি বশত করা সেই দোয়া ই কবুল হয়ে যায়??
আমার করনীয় কি?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারী ভাই, আপনার মুনাজাতে ভুলবশত ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আস্আলুকাল জান্নাতা’ (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই)-এর পরিবর্তে ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল জান্নাত’ (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত থেকে আশ্রয় চাই) বলে ফেলা নিঃসন্দেহে একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল। কিন্তু এর কারণে আপনার কোনো চিন্তার কারণ নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের ভুল ক্ষমার যোগ্য এবং আপনার মূল নিয়তই গ্রহণযোগ্য হবে, ইনশাআল্লাহ।
১. ভুল ও ভুলে বলা দোয়া সম্পর্কে ইসলামী নির্দেশনা:
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ "আমার উম্মতের জন্য ভুল, ভুলে যাওয়া এবং যা তারা বাধ্য হয়ে করে তা আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।"
(ইবনু মাজাহ, হাদীস: ২০৪৫; সহীহ ইবনু হিব্বান, হাদীস: ৭২১৯)
এই হাদীসের আলোকে আপনার অনিচ্ছাকৃত ভুল দোয়া কবুল হওয়ার কোনো ভয় নেই। বরং আপনার প্রকৃত নিয়ত (জান্নাত চাওয়া)ই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য।
২. নিয়তের গুরুত্ব:
হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুসারে, যে কোনো ইবাদত বা দোয়ার ক্ষেত্রে নিয়তই মূল বিবেচ্য। আপনি জান্নাত চাইতে চেয়েছিলেন, কিন্তু জিহ্বা ভুলে অন্য শব্দ উচ্চারণ করে ফেলেছে। এটি একটি সাধারণ ভাষাগত ভুল, যা দোয়ার সারমর্ম পরিবর্তন করেনি। ইমাম ইবনু আবেদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ উল্লেখ করেছেন:
الْعِبْرَةُ لِلنِّيَّةِ وَالْمَعْنَى لَا لِلَّفْظِ
"মূল বিবেচ্য হলো নিয়ত ও অর্থ, শব্দ নয়।"
(রাদ্দুল মুহতার, ২/৮০)
অতএব, আপনার ভুল উচ্চারণের কারণে আল্লাহর কাছে দোয়া বিপরীতভাবে গৃহীত হবে বলে শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
৩. ভুল বুঝতে পেরে সংশোধন ও দোয়া না কবুলের আবেদন:
আপনি যখনই ভুলটি বুঝতে পেরেছেন, সঙ্গে সঙ্গে সঠিক বাক্যটি দিয়ে দোয়া পুনরায় করেছেন এবং আল্লাহর কাছে আবেদন করেছেন যে, ভুল দোয়াটি কবুল না করেন। এটি আপনার ঈমানের দৃঢ়তা ও সতর্কতার পরিচায়ক। এতে করে আপনার উদ্বেগ আরও দূর হয়ে গেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ
"আর আল্লাহ তোমাদের ঈমান বিনষ্ট করবেন না।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৪৩)
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার নেক নিয়তকে কখনো নষ্ট করেন না।
৪. করণীয়:
আপনার এখন যা করণীয়:
- কোনো প্রকার কাফফারা বা সিজদা সাহু নেই: যেহেতু এটি নামাজের ভেতরের ভুল নয়, বরং মুনাজাতের একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল, তাই এর জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ বা নির্দিষ্ট আমল আবশ্যক নয়।
- শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে সাবধান: আপনার মনে যে ভয় ঢুকছে তা শয়তানের পক্ষ থেকে। তিনি মানুষকে নিরাশ করতে চান। তাই আপনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করুন যে আপনার প্রকৃত নিয়তই গ্রহণযোগ্য হবে।
- নিয়মিত দোয়া করতে থাকুন: জান্নাতুল ফিরদাউস চাওয়ার দোয়াটি (আল্লাহুম্মা ইন্নি আস্আলুকাল জান্নাত) বেশি বেশি পড়ুন। এটি একটি মুস্তাহাব দোয়া। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا سَأَلْتُمُ اللَّهَ الْجَنَّةَ فَاسْأَلُوهُ الْفِرْدَوْسَ
"তোমরা যখন আল্লাহর কাছে জান্নাত চাও, তখন ফিরদাউস চেয়ো।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ২৭৯০)
- আল্লাহর রহমতের প্রতি ভরসা রাখুন: আল্লাহ অতীব দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি বান্দার ছোটখাট ভুলকে ধরেন না, বিশেষত যখন সেটি অনিচ্ছাকৃত হয় এবং বান্দা পরে তাওবা করে।
সারসংক্ষেপ:
আপনার ভুল দোয়া কোনোভাবেই কবুল হবে না। আপনার প্রকৃত নিয়ত ও পরে সংশোধন করাই আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য। তাই কোনো দুশ্চিন্তা না করে আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রাখুন এবং জান্নাত চাওয়ার দোয়া অব্যাহত রাখুন।
আল্লাহ তাআলাই সর্বজ্ঞ।