পরিক্ষার রেজাল্ট অনলাইনে শেয়ার করা সম্পর্কে
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
১. এটা বৈধ পড়াশোনা, শেয়ার করা জায়েয কিনা?
২. শেয়ার করলে, বদ নজর বা অন্য ভাবে খারাপ কিছু হবার সম্ভাবনা রয়েছে কিনা?
৩. শেয়ার করব, তবে বদনজর যাতে না লাগে, সেজন্য কোন উপায় আছে কিনা?
Answer
উত্তর:
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: ইসলামে ভালো ফলাফল বা সাফল্য প্রকাশ করা নিষিদ্ধ নয়, বরং তা উৎসাহিত করা হয়েছে যদি তা অহংকার, গর্ব বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে না হয়। তবে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, যাতে বদনজর (নজর-ই-বাদ) বা অন্য কোনো ক্ষতি থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়। নিচে আপনার তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
১. ভালো রেজাল্ট শেয়ার করা কি জায়েয?
উত্তর: জায়েয, তবে শর্ত সাপেক্ষে।
-
কুরআন ও হাদিসের আলোকে: আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ﴾ (সূরা আদ-দুহা: ১১)
“আর তোমার প্রতিপালকের নেয়ামতের কথা প্রকাশ করো।”
এই আয়াতের ভিত্তিতে ভালো ফলাফল (যা আল্লাহর নেয়ামত) অন্যের সাথে শেয়ার করা উৎসাহিত। তবে তা হতে হবে শোকরিয়া (কৃতজ্ঞতা) ও অন্যদের উৎসাহ দেওয়ার উদ্দেশ্যে, অহংকার বা নিজের প্রশংসা কামনার জন্য নয়। -
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
“নেয়ামত প্রকাশ করা জায়েয, যদি তা আল্লাহর শোকরিয়া আদায়ের জন্য হয় এবং অহংকারের কারণ না হয়।” (মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৮/৫২) -
শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন:
“যদি কেউ তার ভালো ফলাফল প্রকাশ করে অন্যদের উৎসাহিত করার জন্য, বা আল্লাহর নেয়ামতের কথা জানানোর জন্য, তাহলে তা জায়েয। কিন্তু যদি তা অহংকার, গর্ব বা লোক দেখানোর জন্য হয়, তাহলে তা নিষিদ্ধ।” (শারহু রিয়াদিস সালিহিন, ৪/৪৮)
শর্ত:
- শেয়ার করার সময় নিয়ত হতে হবে শুধু আল্লাহর নেয়ামত প্রকাশ ও অন্যদের উপকার।
- নিজেকে বড় বা অন্যদের চেয়ে উত্তম মনে করা যাবে না।
- কোনো প্রকার প্রতারণা বা মিথ্যা না থাকা।
২. শেয়ার করলে বদনজর বা খারাপ কিছু হবার সম্ভাবনা?
উত্তর: বদনজর (আল-আইন) একটি বাস্তব বিষয়, যা কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
- হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“আল-আইন (বদনজর) সত্য।” (সহীহ বুখারী: ৫৭৪০, সহীহ মুসলিম: ২১৮৭) - কুরআন: আল্লাহ বলেন:
﴿وَإِن يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصَارِهِمْ﴾ (সূরা আল-কালাম: ৫১)
“আর কাফিররা যখন কুরআন শুনে, তখন তারা তাদের দৃষ্টি দ্বারা তোমাকে প্রায় পেয়ে বসে (বদনজর লাগায়) ...”
তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, যদি আপনি ইসলামী সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বদনজর থেকে বাঁচার উপায় নিচে উল্লেখ করা হলো।
৩. বদনজর থেকে বাঁচার উপায় কী?
শেয়ার করার সময় বা সাধারণভাবে নিম্নোক্ত আমলগুলো করুন:
ক. বারাকাহ ও সুরক্ষার দোয়া পড়া:
-
"مَا شَاءَ اللهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِالله"
(মা শাআল্লাহু লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ)
অর্থ: “আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি নেই।”
হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “যদি তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের মধ্যে এমন কিছু দেখে যা তাকে আশ্চর্যান্বিত করে, তাহলে সে যেন তার জন্য বারাকাহর দোয়া করে।” (ইবন মাজাহ: ৩৫০৯, সহীহ) -
"تَبَارَكَ اللهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ"
(তাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিক্বীন)
খ. বদনজরের বিরুদ্ধে সুরক্ষার দোয়া:
- "أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ"
(আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খলাক)
অর্থ: “আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাসমূহের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির ক্ষতি থেকে আশ্রয় চাই।”
হাদিস: সহীহ মুসলিম: ২৭০৮
গ. নিজের প্রশংসা না করা:
শেয়ার করার সময় অহংকার বা আত্মপ্রশংসা না করে বরং আল্লাহর প্রশংসা (আলহামদুলিল্লাহ) ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন।
ঘ. নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার দোয়া ও কুরআন তিলাওয়াত:
- সূরা আল-ফালাক ও আন-নাস পড়া।
- আয়াতুল কুরসি ও সূরা আল-ইখলাস পড়া।
ঙ. অহংকার ও গর্ব থেকে দূরে থাকা:
শাইখ ইবন বাজ (রহ.) বলেন:
“বদনজর থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় উপায় হলো তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর ভরসা) ও তাকওয়া অবলম্বন করা। আর নিজের নেয়ামত গোপন না রাখলেও ‘মা শাআল্লাহ’ বলে প্রকাশ করা।” (মাজমুউ ফাতাওয়া, ২৬/২৫৩)
সারসংক্ষেপ:
- ভালো রেজাল্ট শেয়ার করা জায়েয, যদি তা অহংকার বা লোক দেখানোর জন্য না হয়, বরং আল্লাহর নেয়ামতের শোকরিয়া ও অন্যদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য হয়।
- বদনজর বাস্তব, কিন্তু সুরক্ষার উপায় গ্রহণ করলে কোনো ক্ষতির ভয় নেই।
- শেয়ার করার সময় ‘মা শাআল্লাহ’, ‘তাবারাকাল্লাহ’, এবং সকাল-সন্ধ্যার দোয়া পড়ে নিজেকে রক্ষা করুন।
শেষ কথা:
আল্লাহর নেয়ামত গোপন না করে বরং শোকরিয়া সহকারে প্রকাশ করুন, তবে সর্বদা বিনয়ী থাকুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সব ধরনের ক্ষতি থেকে হেফাজত করুন।
আল্লাহু আলিম।