লটকন খেয়ে না কেনা ও ঈমান, সেলুনে ধার করে চুল কাটা, ফেরত পণ্যে দাম নির্ধারণ, এবং ছেলের নাম আদিয়ান রাখার বিধান জানতে চাই।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
প্রশ্ন১ :কেউ যদি কোনো বিক্রেতার কাছে বলে যে তাকে আদা কেজি বু্বি( লটকন) দিতে। পরে যদি ক্রেতা হাত দিয়ে লটকন সংগ্রহ করে মাপার জন্য পলিথিনে ঢুকাতে থাকে ও একটা খেয়ে দেখে টক। পরে যদি বিক্রেতাকে বলে সে লটকন কিনবে না এবং বিক্রেতাও যদি তা মেনে নেয় তাহলে কি ক্রেতার ঈমান চলে যাবে কি?
প্রশ্ন ২: আমি একটি সেলুনে চুল কেটে ৫০ টাকা দিলে নাপিত ৮০ টাকা চায়। আমার কাছে ৫০ টাকার বেশি না থাকায় আমি নাপিকে একটু আইতাছি বলে এক লোকের কাছ থেকে ২০ টাকা ধার এনে নাপিতকে মোট ৭০ টাকা দেই। পরে নাপিত টাকাটা হাতে নিয়ে কিছু বলে নি ও আপত্তি জানায় নি।পরে আমি চলে আসি। এখন কি ৭০ টাকায় চুল কাটা কি জায়েজ হযেছে ?
প্রশ্ন৩:কিছু পন্য আমার দোকানে ফেরত দিতে এলে পন্যের দাম ২০ টাকার কিছু উপরে হয় ও ২১ টাকার চেয়ে কম হয়। পন্যের মালিক ২০ টাকা দাম ধরতে বলে। আমি ২১ টাকা দাম ধরি। এতে কোনো সমস্যা হবে কি?
প্রশ্ন৪: ছেলে বাচ্চার নাম আদিয়ান রাখা যাবে কি? এর অর্থ কি? এটা কি ইসলামিক নাম?
Answer
উত্তর
প্রশ্ন ১: লটকন কিনতে এসে একটু খেয়ে দেখা ও পরে না কেনা
উত্তর:
আপনার বর্ণিত ঘটনায় ক্রেতা যদি বিক্রেতার অনুমতি ছাড়াই লটকন খেয়ে থাকে, তবে এটি নিষিদ্ধ (হারাম) কাজ, কারণ এটি অন্যের মাল খাওয়ার শামিল। তবে এর কারণে ঈমান চলে যায় না, যতক্ষণ না ব্যক্তি এটিকে হালাল মনে করে বা ইসলামের কোনো মৌলিক বিষয় অস্বীকার করে।
ইসলামী শরিয়তে ঈমান চলে যাওয়ার বিষয়টি খুব গুরুতর এবং সুনির্দিষ্ট কারণেই ঘটে থাকে (যেমন: আল্লাহ, রাসূল, কুরআন, নামায, রোযা ইত্যাদি অস্বীকার করা বা বিদ্রূপ করা)। একটি ভুল বা পাপের কারণে ঈমান যায় না, তবে তা গুনাহ এবং তওবা ও সংশোধন করা আবশ্যক।
এই প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেন:
"إيمان العبد لا يزول بمجرد الذنب ما لم يستحله"
অর্থ: "বান্দার ঈমান শুধুমাত্র গুনাহর কারণে যায় না, যতক্ষণ না সে গুনাহকে হালাল মনে করে।"
হিদায়া-তেও অনুরূপ বক্তব্য রয়েছে যে, পাপ করলেই ঈমান যায় না; বরং বিদ্রূপ বা অস্বীকার করলেই যায়।
তবে এখানে ক্রেতার উচিত বিক্রেতার কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং খাওয়া লটকনের মূল্য পরিশোধ করা, যদি সে তা ক্ষমা না করে। বিক্রেতা যদি ক্ষমা করে দেয়, তাহলে আল্লাহর কাছে তওবা করলেই হবে।
সারমর্ম:
- লটকন খাওয়া (অনুমতি ছাড়া) গুনাহ, কিন্তু ঈমান যায় না।
- ঈমান যাওয়ার জন্য সুস্পষ্ট কুফরী বা অস্বীকার আবশ্যক।
- তওবা ও ক্ষতিপূরণ (যদি বিক্রেতা ক্ষমা না করে) আবশ্যক।
প্রশ্ন ২: ধার করা টাকা দিয়ে চুল কাটা এবং নাপিতের নীরবতা
উত্তর:
আপনি নাপিতের সাথে ৭০ টাকায় চুল কাটার চুক্তি করেছিলেন (মূলত ৮০ টাকা চেয়েছিল, কিন্তু আপনি ৭০ টাকা দিয়েছেন এবং নাপিত কোনো আপত্তি না করে টাকা নিয়েছেন)। নাপিতের নীরবতা ও টাকা গ্রহণ করায় স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে সে এই মূল্য গ্রহণ করেছে। ইসলামী ফিকহে ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতীকী বা ইঙ্গিতপূর্ণ সম্মতিকেও বৈধ ধরা হয় (মুয়ামালাতের ক্ষেত্রে) যখন স্পষ্ট আপত্তি না থাকে।
ইমাম কাসানী (রহ.) বাদায়েউস সানায়ে-তে বলেন:
"السكوت في معرض الحاجة بيان"
অর্থ: "প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে নীরবতা সম্মতিরই প্রকাশ।"
এক্ষেত্রে নাপিত টাকা নিয়েছেন এবং কিছু বলেননি, যা দ্বারা বোঝা যায় তিনি ৭০ টাকায় রাজি হয়েছেন। তাই আপনার চুল কাটা জায়েজ হয়েছে এবং আপনার কোনো গুনাহ নেই। তবে মূলত আপনার উচিত ছিল পূর্বেই দাম নির্ধারণ করে নেওয়া।
সারমর্ম:
- নাপিতের নীরবতা ও টাকা গ্রহণ সম্মতির ইঙ্গিত, তাই লেনদেন বৈধ।
- চুল কাটা জায়েজ হয়েছে, কোনো সমস্যা নেই।
প্রশ্ন ৩: ফেরত নেওয়া পণ্যের মূল্য ২০ টাকা বলে মালিক, কিন্তু আপনি ২১ টাকা ধরছেন
উত্তর:
মালিক যখন পণ্য ফেরত নিচ্ছেন এবং তিনি নিজে ২০ টাকা দাম ধরতে বলছেন, তখন আপনি তার কথা মেনে ২০ টাকাই ধরা উচিত। কারণ ফেরত নেওয়ার সময় মালিকই মূল্য নির্ধারণের অধিকারী। আপনি যদি নিজের ইচ্ছায় ২১ টাকা ধরেন, তাহলে এটি জোরাজুরি বা ধোঁকাবাজির শামিল হতে পারে, বিশেষত যদি মালিকের সাথে কোনো পূর্ব চুক্তি না থাকে।
ফতোয়া আলমগীরী-তে (৪/২২৭) বর্ণিত:
"إذا اختلف البائع والمشتري في الثمن فالقول قول البائع مع يمينه"
অর্থ: "যদি বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে মূল্য নিয়ে বিরোধ হয়, তাহলে বিক্রেতার কথা গ্রহণযোগ্য হবে (শপথ সহ)।"
এখানে মালিকের কথা গ্রহণ করাই বেশি সঙ্গত। তবে আপনি যদি ২১ টাকা ধরেন এবং মালিক আপত্তি না করে স্বেচ্ছায় মেনে নেয়, তাহলে জায়েজ হবে। কিন্তু তার আপত্তি সত্ত্বেও আপনি জোর করলে বা ধোঁকা দিলে গুনাহ হবে।
সারমর্ম:
- মালিকের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
- স্বেচ্ছায় সম্মতি থাকলে জায়েজ, অন্যথায় নাজায়েজ।
প্রশ্ন ৪: ছেলে সন্তানের নাম "আদিয়ান" (Adiyan) রাখা
উত্তর:
"আদিয়ান" শব্দটি আরবি নয়; এটি ফার্সি বা উর্দু ভাষা থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। এর অর্থ ভালো কিছু নয়; বরং কিছু সূত্রে এটিকে "আগুনের পূজারী" বা "অগ্নি উপাসক" অর্থে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে "আদিয়ান" (আদী + ইয়ান) আরবি "আদী" (عاد) থেকে হলে এর অর্থ "প্রাচীন" বা "ফেরাউনের সম্প্রদায় বনু আদ" হতে পারে, যা সঠিক নয়।
ইসলামী নামের শর্ত:
- নামের অর্থ সুন্দর ও অর্থবহ হতে হবে।
- শিরক, কুফরী বা মূর্তিপূজার সাথে সম্পর্কিত নাম রাখা নিষিদ্ধ।
- সাহাবী ও নবীদের নাম রাখা উত্তম।
ইমাম নববী (রহ.) ও ইবনে হাজার (রহ.) বলেছেন, অর্থ ও শব্দের দিক থেকে পরিষ্কার ভালো অর্থ না জানলে নাম রাখা উচিত নয়।
বিশিষ্ট আলেম মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) তাঁর মা‘আরিফুল কুরআন-এ নাম রাখার গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন এবং কুফরী অর্থবোধক নাম নিষেধ করেছেন।
সুতরাং "আদিয়ান" নামটি রাখা ঠিক নয়; বরং আপনি আদিল, আদনান, আদিব, আদি ইত্যাদি অর্থবহ ও ইসলামসম্মত নাম রাখতে পারেন।
সারমর্ম:
- "আদিয়ান" এর অর্থ স্পষ্টত ভালো নয় (কেউ কেউ 'অগ্নিপূজক' বলেন)।
- তাই এই নাম রাখা থেকে বিরত থাকা উচিত।
- ইসলামী নাম যেমন আদনান, আদিল, ইলিয়াস, ইউসুফ ইত্যাদি রাখা ভালো।
সারসংক্ষেপ (সংক্ষেপে উত্তর)
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|-------| | ১. লটকন খেয়ে না কেনা | ঈমান যায় না, তবে গুনাহ ও তওবা আবশ্যক। | | ২. ধার করে চুল কাটা ও নাপিতের নীরবতা | নীরবতা সম্মতি, তাই লেনদেন বৈধ। | | ৩. ফেরতে ২০ টাকার পণ্যে ২১ টাকা ধরা | মালিকের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। স্বেচ্ছায় না হলে নাজায়েজ। | | ৪. "আদিয়ান" নাম | রাখা ঠিক নয়, অর্থ অস্পষ্ট ও কুফরীপূর্ণ। ইসলামী নাম রাখুন। |