কোচিং-প্রাইভেটের কারণে জামে মসজিদে দিতীয় জামাত প্রসঙ্গে
Salah-Prayer · Hanafi
Question
[বি:দ্র: আমি সবসময় সর্বাধিক চেষ্টা করি যাতে জামাতের সময় প্রাইভেট না থাকে]
(কোনো ভুল করে থাকলে ক্ষমাপ্রার্থী)
Answer
ভূমিকা
প্রশ্নকারী প্রতিষ্ঠিত যে, তিনি উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। প্রতিদিন কোচিং-প্রাইভেটে অনেক সময় কাটাতে হয়, ফলে অনেক সময় জামাতের সময় প্রাইভেট চলতে থাকে। এমতাবস্থায় তিনি ও তার কিছু বন্ধু প্রাইভেটের ফাঁকে নিজেরা জামাত করে নামাজ আদায় করেন। কিন্তু সমস্যা হলো, শহরের অধিকাংশ মসজিদই জামে মসজিদ (যেখানে স্থায়ী ইমাম ও মুয়াজ্জিন থাকে) এবং সেখানে বারান্দা না থাকায় মসজিদের ভেতরেই দ্বিতীয় জামাত করতে হয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে জামে মসজিদে দ্বিতীয় জামাত মাকরূহ তাহরীমী, আর ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে তা জায়েজ। বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয় কী?
হানাফী ফিকহের মূলনীতি
হানাফী মাজহাবে জামে মসজিদে (যে মসজিদে স্থায়ী ইমাম ও মুয়াজ্জিন থাকে এবং সেখানে সর্বদা প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয়) দ্বিতীয় জামাত করা সম্পর্কে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত হলো—এটি মাকরূহ তাহরীমী (নিষিদ্ধের কাছাকাছি)। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মত হলো—জায়েজ, তবে কিছু শর্তে। তবে ফতওয়া সাধারণত ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতের ওপরই দেওয়া হয়, বিশেষ করে ফিতনা বা বিশৃঙ্খলা এড়ানোর জন্য।
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) থেকে:
"وَلَا تُعَادُ الْجَمَاعَةُ فِي مَسْجِدٍ لَهُ إمَامٌ وَمُؤَذِّنٌ"
অর্থ: "যে মসজিদের স্থায়ী ইমাম ও মুয়াজ্জিন আছে, সেখানে দ্বিতীয় জামাত করা উচিত নয়।"
(রদ্দুল মুহতার, ১/৫৪৬)
ফতওয়া আলমগিরী (হিন্দিয়া)-তে এসেছে:
"وَإِعَادَةُ الْجَمَاعَةِ فِي الْمَسْجِدِ الَّذِي لَهُ إمَامٌ وَمُؤَذِّنٌ لَا تَجُوزُ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ رَحِمَهُ اللَّهُ، وَعِنْدَهُمَا تَجُوزُ، وَالْفَتْوَى عَلَى قَوْلِ أَبِي حَنِيفَةَ"
অর্থ: "ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে জামে মসজিদে দ্বিতীয় জামাত জায়েজ নয়। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে জায়েজ। তবে ফতওয়া ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতের ওপর।"
(ফতওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৬)
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ
প্রশ্নকারী বলেন যে, প্রাইভেটের কারণে প্রথম জামাত ধরা সম্ভব হয় না। তাই বন্ধু মিলে নিজেরা দ্বিতীয় জামাত করেন মসজিদের ভেতরে। অধিকাংশ মসজিদ জামে মসজিদ হওয়ায় ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে এটি মাকরূহ তাহরীমী। তবে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে এটি জায়েজ। কিন্তু ফতওয়ার দৃষ্টিতে এড়িয়ে চলাই উত্তম।
তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে:
- যদি প্রথম জামাত শেষ হওয়ার পর মসজিদে কোনো জামাত না থাকে এবং দ্বিতীয় জামাতকারীরা আলাদা কোনো স্থানে (যেমন বারান্দা, অথবা মসজিদের এক কোণে) জামাত করেন, তাহলে কিছু হানাফী গ্রন্থে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
- যদি মসজিদটি জামে মসজিদ না হয় (অর্থাৎ স্থায়ী ইমাম-মুয়াজ্জিন না থাকে), তাহলে দ্বিতীয় জামাত জায়েজ।
- যদি একান্তই জরুরি অবস্থা হয় এবং অন্য কোনো মসজিদ পাওয়া না যায়, তবে কিছু উলামা দ্বিতীয় জামাতের অনুমতি দিয়েছেন, তবে শর্ত হলো—প্রথম জামাতের সঙ্গে কোন্দল বা বিভেদ সৃষ্টি না হয়।
করণীয়: ব্যবহারিক সমাধান
প্রশ্নকারীর জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:
১. প্রথম জামাতে শরিক হওয়ার চেষ্টা
প্রাইভেটের সময়সূচি এমনভাবে সাজানো সম্ভব কি না, যাতে জামাতের সময় ফাঁকা থাকে। অথবা জামাতের সময় একটু বিরতি নিয়ে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে আবার প্রাইভেটে ফিরে আসা—এতে প্রাইভেট বেশি মিস হবে না।
২. একাকী নামাজ পড়া (দ্বিতীয় জামাত না করে)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে দ্বিতীয় জামাত মাকরূহ। তাই প্রথম জামাত মিস হলে মসজিদে একাকী নামাজ পড়া উত্তম। একাকী নামাজ পড়ার কারণে কোনো গুনাহ নেই; বরং জামাত তরক করায় সওয়াব কম হলেও নামাজ আদায় হওয়ায় ফরজ আদায় হয়।
৩. অন্য মসজিদে প্রথম জামাত ধরা
যদি সময় থাকে, তাহলে আশেপাশের কোনো মসজিদ যে মসজিদের প্রথম জামাত পরে হয় (যেমন জোহরের জামাত ভিন্ন সময়ে), সেখানে গিয়ে প্রথম জামাত আদায় করা।
৪. মসজিদের বাইরে বারান্দা বা অন্য কক্ষে জামাত
যে সব মসজিদে বারান্দা নেই, সেখানে মসজিদের ভেতরে দ্বিতীয় জামাত না করে আশেপাশের কোনো খোলা জায়গায় বা আলাদা কক্ষে জামাত করা। তবে অনেক জামে মসজিদে মসজিদের ভেতরেই দ্বিতীয় জামাত হলে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে তা মাকরূহ হবে।
৫. ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মত অনুযায়ী দ্বিতীয় জামাত (জরুরি অবস্থায়)
যদি একান্তই জামাতের বিকল্প না থাকে এবং চার-পাঁচজন বন্ধু একসাথে নামাজ পড়তে চান, তাহলে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মত অনুযায়ী তা জায়েজ। তবে শর্ত হলো—প্রথম জামাতের ইমামের সঙ্গে বিরোধ না করা এবং নিজেদের জামাতকে আলাদা ও গোপন রাখা (যাতে মসজিদের নিয়মিত জামাতের প্রতি অসম্মান না হয়)।
সারসংক্ষেপ
| পদ্ধতি | হুকুম | মন্তব্য | |--------|-------|---------| | প্রথম জামাতে শরিক হওয়া | সর্বোত্তম | চেষ্টা করবেন | | একাকী নামাজ (প্রথম জামাত মিস করলে) | জায়েজ, উত্তম | কোনো সমস্যা নেই | | দ্বিতীয় জামাত (জামে মসজিদে) | ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে মাকরূহ তাহরীমী | এড়িয়ে চলা উচিত | | দ্বিতীয় জামাত (অন্য মসজিদে বা বারান্দায়) | জায়েজ | শর্ত: জামে মসজিদ না হলে | | ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মত অনুযায়ী দ্বিতীয় জামাত | জায়েজ (ফতওয়া নয়) | শুধুমাত্র চরম প্রয়োজনে |
সুপারিশ
প্রশ্নকারী ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি সর্বদা চেষ্টা করেন জামাতের সময় প্রাইভেট না রাখতে। এটি খুবই প্রশংসনীয়। অতএব, তাঁর উচিত:
-
প্রাইভেটের সময়সূচি এমনভাবে সাজানো যাতে অন্তত এক ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়া যায়।
-
জামাত মিস হলে মসজিদে একাকী নামাজ পড়া (দ্বিতীয় জামাত না করে)।
-
যদি বন্ধু মিলে জামাত করতেই হয়, তবে কোনো জামে মসজিদের বাইরে (যেমন স্কুলের কোনো কক্ষে) জামাত করা।
-
সবচেয়ে ভালো হলো—নামাজের জামাতের জন্য কিছু সময় নির্দিষ্ট করা এবং প্রাইভেট শিক্ষককে জানিয়ে রাখা, যাতে বিরতি দেওয়া সম্ভব হয়।
-
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
-
ফতওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরী)
-
আল-হিদায়া (মারগিনানী)
-
ফতওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী)
আল্লাহ তাআলা সহজ পথ দেখান। (আমিন)