মৃত বেনামাজী ছেলের জন্য ইবাদত করা প্রসঙ্গে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এক মহিলা তার এক সালাত ত্যাগকারী ছেলে সম্পর্কে সৌদী আরবের প্রাক্তন প্রধান মুফতি শাইখ আবদুল আযীয ইব্ন বায (রহঃ)-এর নিকট এক ফাতওয়া জানতে চেয়েছিলেন। ঐ ফাতওয়া সৌদী আরবের “উচ্চ উলমা পরিষদের” নিকট হস্তান্তর করার পর সৌদী সরকারী ফাতওয়া ও ইসলামী গবেষণার স্থায়ী কমিটি যে সমাধান দিয়েছিল তা উল্লেখ করা হল। ঐ মহিলার প্রশ্ন ছিল নিম্নরূপ :
প্রশ্ন : ১৭ বৎসর বয়সের আমার এক ছেলে ছিল। আজ থেকে ২ মাস পূর্বে গাড়ি দুর্ঘটনায় সে মারা যায়। ছেলেটি সালাত আদায় করতনা এবং রামাযান মাসে সিয়ামও পালন করতনা। তবে আমার জানা মতে এই দু’টি পাপ কাজ ছাড়া আর কোন পাপ কাজ তার দ্বারা সংগঠিত হয়নি। এমতাবস্থায় ঐ ছেলের পক্ষ হতে তার রামাযান মাসের সিয়ামগুলি পূর্ণ করা তার মা হিসাবে আমার জন্য এবং তার ভাইদের জন্য জায়েয হবে কি? ঐ ছেলের পক্ষ হতে আশুরার সিয়াম, আরাফা দিবসের সিয়াম এবং সপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবারের সিয়াম এ সমস্ত নাফল সিয়ামগুলি যদি পালন করা হয় তাহলে কি এর সাওয়াব আমার ঐ ছেলে পাবে? এ ছাড়া আমি যদি তার পক্ষ থেকে যুহর সালাতের আগে চার রাক‘আত, যুহর সালাতের পরে দুই রাক‘আত এবং ‘আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজর সালাতের প্রথমে দুই রাক‘আত করে সালাত আদায় করি তাহলে কি এ সমস্ত সালাতের সাওয়াব আমার ঐ ছেলেকে দেয়া হবে?
উত্তর : ফাতওয়া কমিটি যে ফাতওয়া দিয়েছিল তা ছিল এরূপ : যে ব্যক্তি সিয়াম পালন না করে এবং সালাত ত্যাগকারী অবস্থায় মারা গেল তাকে মুসলিম হিসাবে গণ্য করা যাবেনা। কেননা যে ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত পরিত্যাগ করল সে কাফির। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : একজন মু’মিন বান্দা এবং একজন কাফির ও মুশরিকের মধ্যে পার্থক্য হল সালাত পরিত্যাগ করা। অর্থাৎ যারা মু’মিন তারা সালাত আদায় করে, আর যারা কাফির ও মুশরিক তারা সালাত আদায় করেনা। অতএব যারা সালাত ত্যাগকারী অবস্থায় জীবন কাটালো এবং মৃত্যুর আগে আল্লাহ তা‘আলার নিকট অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করার সুযোগ নিলনা, এ ধরনের ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দু‘আ করা জায়েয হবেনা। অতএব ঐ ছেলের মা ঐ ছেলের মাগফিরাতের জন্য যতই নাফ্ল সালাত, সিয়াম ও দু‘আ করুক না কেন ঐ ছেলের কোন উপকারে আসবেনা। কেননা সালাত এমন একটি ইবাদাত যা কারও পক্ষ হয়ে আদায় করলে তার প্রতিদান পাবার কোন প্রমাণ ইসলামী শারী‘আতে নেই। একমাত্র আল্লাহই সকল প্রকার ভাল কাজের তাওফীকদাতা।
পরিশেষে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাঁর সকল সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রাহমাত ও শান্তি বর্ষিত হোক, ‘আমীন।
পক্ষে : ফাতওয়া ও ইসলামী গবেষণার স্থায়ী কমিটি :
সভাপতি : শাইখ আবদুল আযীয ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন বায
সহ-সভাপতি : শাইখ আবদুল আযীয ইব্ন আবদুল্লাহ আলুশ শাইখ
সদস্য : আবদুল্লাহ ইব্ন আবদুর রাহমান আল গুদাইয়ান
সদস্য : বাকার ইব্ন আবদুল্লাহ আবু যায়ীদ
সদস্য : সালিহ ইব্ন ফাউযান আল ফাউযান
উপরোক্ত মাসয়ালা সম্পর্কে হানাফী মাযহাবের অবস্থান বিষয়ে জানতে চাই।
Answer
উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত বিষয়টি হানাফী মাযহাবের দৃষ্টিকোণ থেকে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেওয়া যাচ্ছে। নিম্নে কুরআন, হাদীস ও প্রামাণ্য হানাফী কিতাবের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হলো।
১. সালাত ত্যাগকারীর হুকুম (হানাফী মাযহাবে)
হানাফী ফকীহগণের মতে, যে ব্যক্তি অলসতা বা অমনোযোগিতার কারণে সালাত আদায় করে না, কিন্তু তার ওয়াজিব হওয়ায় বিশ্বাস রাখে, সে কাফির হয় না, বরং সে গুরুতর পাপী (ফাসিক) গণ্য হয়। তবে যে ব্যক্তি সালাতের ফরজিয়াত অস্বীকার করে, সে কাফির হয়ে যায়।
🔹 প্রমাণ:
-
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন:
"যে ব্যক্তি ফরজ নামাজ পড়ে না, অথচ তার ফরজিয়াতে বিশ্বাস রাখে, সে ফাসিক, কাফির নয়।"
(বাদায়েউস সানায়ি ১/২৯৯; ফাতাওয়া আলমগীরী ১/১৯২) -
ইমাম তাহাবী (রহ.) বলেন:
"আহলে সুন্নাতের মতে, নফল ইবাদত ছেড়ে দেওয়ার কারণে কেউ কাফির হয় না, কিন্তু ফরজ ইবাদত অস্বীকার করলে কাফির হয়। আর অলসতায় ছেড়ে দিলে সে পাপী, তবে কাফির নয়।"
(শরহু মাআনিল আছার, ১/১৫০)
🔹 হাদীসের ব্যাখ্যা:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী:
"মুমিন ও মুনাফিকের মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত এবং যাকাতের ব্যাপারে।"
(মুসলিম, হা: ৮২)
এই হাদীসে ত্যাগকারীকে মুনাফিক বলা হয়েছে, কাফির নয়। আর মুনাফিক দুনিয়াতে মুসলিমের হুকুম পায়, তবে আখিরাতে শাস্তি পাবে।
✅ সুতরাং হানাফী মাযহাবে, প্রশ্নে বর্ণিত ছেলেটি (যে শুধু অলসতায় সালাত ও রোজা ছেড়ে দিয়েছিল) মুসলিম হিসেবেই গণ্য হবে। তাকে কাফির বলা যাবে না।
২. মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ইবাদত করা (ইসালে সওয়াব)
হানাফী মাযহাবে মৃত মুসলিমের জন্য নফল ইবাদত (যেমন: সিয়াম, সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, সাদকা) করার পর সওয়াব পৌঁছানো জায়েয এবং সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে।
🔹 প্রমাণ:
-
কুরআনে ইরশাদ:
"আর যারা তাদের পরে আগমন করেছে, তারা বলে: হে আমাদের রব, আমাদের এবং আমাদের ভাইদের (যারা ঈমানে অগ্রগামী) ক্ষমা করুন।" (সূরা হাশর: ১০)
এখানে মৃতদের জন্য দোয়া ও ইবাদতের সওয়াব পৌঁছার ইঙ্গিত আছে। -
হাদীসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি রোজার কাযা রেখে মারা যায়, তার অভিভাবক তার পক্ষ থেকে রোজা রাখবে।"
(বুখারী, হা: ১৮৫২; মুসলিম, হা: ১১৪৭)ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন:
"মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার অভিভাবক নফল রোজা রাখতে পারেন এবং এর সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে পৌঁছে।"
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২০২; রদ্দুল মুহতার ২/৪২৫) -
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেন:
"মৃত ব্যক্তির জন্য নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ ইত্যাদির সওয়াব পৌঁছানো জায়েয এবং এতে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হয়।"
(রদ্দুল মুহতার ২/২৪৩)
✅ সুতরাং হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, প্রশ্নে বর্ণিত মৃত ছেলের পক্ষ থেকে তার মা ও ভাইয়েরা নফল রোজা (আশুরা, আরাফা, সোম-বৃহস্পতিবার) রাখতে পারেন এবং নফল নামাজ পড়ে সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছাতে পারেন। এতে ছেলেটি উপকৃত হবে।
৩. রমজানের রোজার ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ফরজ রোজার কাযা করার বিষয়ে হানাফী মাযহাবে মতভেদ আছে।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে মৃতের ফরজ রোজার কাযা করা জায়েয নয়। বরং প্রতিটি রোজার বদলে ফিদইয়া (এক মিসকিনকে খাবার) দেওয়া উচিত।
তবে ইমাম মুহাম্মদ ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, অভিভাবক মৃতের পক্ষ থেকে ফরজ রোজা রাখতে পারেন। হানাফী ফতোয়ার বর্তমান জমহুর মত হলো, ফিদইয়া দেওয়াই উত্তম।
(রদ্দুল মুহতার ২/৪২৫; ফাতাওয়া শামী ২/৪২৭)
✅ সুতরাং এখানে যদি ছেলেটির রমজানের রোজা না রাখার কারণে কাযা বাকি থাকে, তবে তার পক্ষ থেকে ফিদইয়া দেওয়া উচিত। আর মা যদি নফল রোজার সওয়াব পৌঁছান, তা জায়েয এবং সওয়াব পৌঁছবে।
৪. সৌদী ফতোয়া এবং হানাফী মাযহাবের পার্থক্য
সৌদী ফতোয়া কমিটির ফতোয়া মূলত হাম্বলী মাযহাবের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে, যেখানে সালাত ত্যাগকারীকে কাফির বলার একটি মত বিদ্যমান। কিন্তু হানাফী মাযহাব সেটি গ্রহণ করে না। তাই হানাফী মাযহাবের আলোকে:
- মৃত ছেলেটি মুসলিম গণ্য হবে।
- তার জন্য দোয়া, ইস্তিগফার এবং নফল ইবাদতের সওয়াব পৌঁছানো জায়েয ও উপকারী।
- মা যদি নফল সালাত, সিয়াম ও দোয়া করেন, তাহলে ছেলেটি সওয়াব পাবে।
হানাফী কিতাবের প্রামাণ্য উদ্ধৃতি
| বিষয় | সূত্র | |------|--------| | সালাত ত্যাগকারী কাফির নয় | বাদায়েউস সানায়ি ১/২৯৯; ফাতাওয়া আলমগীরী ১/১৯২ | | মৃতের পক্ষ থেকে নফল ইবাদত জায়েয | রদ্দুল মুহতার ২/২৪৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২০২ | | ফরজ রোজার কাযা না করে ফিদইয়া | রদ্দুল মুহতার ২/৪২৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/২২৫ | | মৃতের জন্য দোয়া ও ইবাদত পৌঁছায় | বেহেশতি জেওর (৬ষ্ঠ অধ্যায়); মাআরিফুল কুরআন ৮/৬১৭ |
শেষ কথা
প্রশ্নোক্ত ছেলেটির জন্য হানাফী মাযহাবের অবস্থান হলো:
- সে মুসলিম ছিল, যদিও পাপী।
- তার মা ও ভাইয়েরা নফল সিয়াম, নফল সালাত ও দোয়া করলে সওয়াব পৌঁছবে, ইনশাআল্লাহ।
- রমজানের কাজা রোজার জন্য ফিদইয়া দেওয়া উত্তম।
- তাকে কাফির বলা বা তার জন্য দোয়া নিষেধ করা হানাফী মাযহাবের পরিপন্থী।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।