তাবিজ ও জর্দা খাওয়ার হুকুম
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: জর্দা খাওয়া ও তাবিজ ব্যবহারের হুকুম (হানাফি মাজহাব অনুযায়ী)
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
- জর্দা খাওয়া কি জায়েজ?
- তাবিজ ব্যবহার করা কি জায়েজ?
১. জর্দা খাওয়ার হুকুম:
জর্দা মূলত তামাক, চুন, সুগন্ধি ও অন্যান্য মিশ্রণে তৈরি একটি মশলাদার পদার্থ, যা মুখে রাখা হয়। এটি নেশা সৃষ্টিকারী না হলেও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। হানাফি ফিকহে এর বিধান:
-
মাকরুহ তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি): ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও অন্যান্য হানাফি ফুকাহায়ে কেরামের মতে, জর্দা খাওয়া মাকরুহ তাহরিমি। কারণ এটি শরীরের জন্য ক্ষতিকর, অপচয় ও বাজে অভ্যাস (মুহাসসিরাতুন নিফাক) সৃষ্টি করে। তাছাড়া হাদীসে নবীজি (সা.) বলেছেন: “তোমাদের শরীরের উপর তোমাদের অধিকার আছে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৫৯)
-
মাদক ও নেশার সাথে তুলনা: যদিও জর্দা মাদক নয়, তবে এর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ফুকাহায়ে কেরাম একে মাদকদ্রব্যের সাদৃশ্যপূর্ণ বলে গণ্য করেন। তাই সতর্কতামূলকভাবে একে পরিহার করাই উচিত।
-
ফতোয়ায় উসমানি ও ইমদাদুল ফতোয়া: মুফতি মুহাম্মাদ শফি (রহ.) ও মুফতি তকী উসমানি (দা. বা.)-এর ফতোয়ায় জর্দা খাওয়া মাকরুহ এবং স্বাস্থ্যের জন্য অপকারী হওয়ায় তা থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব।
সিদ্ধান্ত: জর্দা খাওয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকর হলে তাহা খাওয়া জায়েজ নয়; বরং এটি মাকরুহ তাহরিমি বা নিষিদ্ধের কাছাকাছি। মুমিনের উচিত এটি সম্পূর্ণ পরিহার করা।
২. তাবিজ ব্যবহারের হুকুম:
তাবিজ ব্যবহারের বিধান হানাফি মাজহাবে শর্তসাপেক্ষে জায়েজ:
শর্তগুলো:
-
কুরআন বা হাদীসের বাণী দিয়ে লিখা: তাবিজে শুধুমাত্র কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম, দোয়া বা হাদীসের বাণী লিখতে হবে।
(ফতোয়া আলমগীরি: ৫/৩৫৪) -
শিরক মুক্ত: তাবিজে কোনো কালো জাদু, ভূত-প্রেতের নাম বা শিরকের উপাদান থাকা হারাম।
-
বিশ্বাসের নির্ভরতা: মুমিনকে বিশ্বাস করতে হবে যে, আরোগ্য ও বরকত আসে একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকে; তাবিজ শুধু একটি মাধ্যম।
(রদ্দুল মুহতার: ৬/৩৬৩) -
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মত: তাঁরা কুরআনের আয়াত ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, তাবিজ মাকরুহ হলো – মনে রাখতে হবে এটি ইমামের সতর্কতামূলক নীতি।
আধুনিক প্রসঙ্গ:
- বর্তমানে কিছু তাবিজে হরফের গণিত বা অন্ধবিশ্বাস জড়িত; এগুলো হারাম।
- যদি তাবিজে শুধু দোয়া ও কুরআনের আয়াত লেখা হয় এবং পরিধানকারী তা আল্লাহর উপর ভরসা করে তবেই জায়েজ।
সিদ্ধান্ত: শর্তসাপেক্ষে তাবিজ ব্যবহার জায়েজ – তবে অধিকাংশ হানাফি ওলামায়ে কেরাম (মুফতি তকী উসমানি, মুফতি মুহাম্মাদ শফি) অপ্রয়োজনে তাবিজ পরিহারকে উত্তম মনে করেন। অসুস্থতায় কুরআন পড়ে দম করা (দুয়া) বেশি বরকতময়।
মূল উদ্ধৃতি ও রেফারেন্স:
-
জর্দা:
- ফতোয়া উসমানি: ২/১১৩
- ইমদাদুল ফতোয়া: ৪/২২৫
- সহীহ মুসলিম: হাদীস ১১৫৯ (শরীরের হক সম্পর্কে)
-
তাবিজ:
- ফতোয়া আলমগিরি: ৫/৩৫৪
- রদ্দুল মুহতার (আল-দুররুল মুখতার): ৬/৩৬৩
- বাহিশতি জেওর (মুফতি মুহাম্মাদ শফি): তাবিজ সম্পর্কিত অধ্যায়
- শরহ মা‘আনিল আসার (ইমাম তাহাবি): ৪/২৩২
সতর্কতা:
- জর্দা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর; ধূমপান ও মাদকের সাদৃশ্য থাকায় তা পরিহার করুন।
- তাবিজ ব্যবহার করলে তা শিরকমুক্ত ও কুরআন ভিত্তিক কিনা নিশ্চিত হোন। আরো উত্তম হলো সরাসরি দোয়া ও রুকইয়া (কুরআন তেলাওয়াত) গ্রহণ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক জ্ঞান ও আমল করার তৌফিক দান করুন।
(আমিন)