ইমামকে রুকু অবস্থায় পাওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 1558
Questioner: Saiful Islam
Question Asked: 13 Jun 2026, 05:32 AM
Reviewed & Published: 13 Jun 2026, 06:53 AM
Views: 80
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১।জামাতে নামাজ পড়ার সময় ইমাম যখন রুকুতে ছিলো আমি রুকুতে যাচ্ছি তখন ইমাম উঠতে ছিলো, ইমামকে অর্ধেক রুকু অবস্থায় পাইছি কিনা সিওরনা কিন্তু আমি রুকুতে যাওয়ার পর সামিআল্লাহু লিমান হামিদা বলছে। আমার কি নামাজ আদায় হইছে।

২।গাজা,ইয়াবা,ঘুমের ঔষধ দিয়ে নেশা করার পর যদি সুদ্ধ ভাবে কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া দুরুদ,এবং অন্যন্যা ইবাদাত করতে পারবে কি এতটা উন্মাদ না যে হিতাহিত জ্ঞ্যান একেবারে লোপ না পায় এগুলো পড়া আমল করা যাবে কি

Answer

জামাতে নামাজ ও নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ইবাদত সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর

১. জামাতে ইমামের সাথে রুকু পাওয়া ও নামাজের হুকুম

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
আপনি জামাতে নামাজ পড়ার সময় ইমাম যখন রুকুতে ছিলেন, তখন আপনি রুকুতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ইমাম উঠতে শুরু করলে তিনি "سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ" বলছিলেন। আপনি নিশ্চিত নন যে ইমামকে অর্ধেক রুকু অবস্থায় পেয়েছিলেন কিনা। আপনার নামাজ আদায় হয়েছে কি না—এটাই জানতে চান।

উত্তর:
হানাফি ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, জামাতে কোনো ব্যক্তি ইমামের সাথে রুকু পেতে হলে তাকে অবশ্যই ইমামের রুকু অবস্থায় থাকাকালীন ইমামের সাথে মিলিত হতে হবে। অর্থাৎ, ইমাম রুকু থেকে মাথা তোলার পূর্বে মুক্তাদি যদি ইমামের সাথে রুকুতে চলে যায় এবং কিছুক্ষণের জন্য হলেও রুকুর অবস্থায় স্থির থাকে, তাহলে সে রাকাত পেয়ে যায়। কিন্তু ইমাম যদি রুকু থেকে মাথা তোলার পর মুক্তাদি রুকুতে যায়, তাহলে সে রাকাত পায় না; বরং তা ছুটে যায়।

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:

  • আপনি যখন রুকুতে যাচ্ছিলেন, তখন ইমাম উঠতে শুরু করেছিলেন।
  • আপনি রুকুতে যাওয়ার পর ইমাম "سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ" বলছিলেন—এটা ইমামের রুকু থেকে ওঠার পরের তাসবিহ।

এ থেকে বোঝা যায়, আপনি রুকুতে পৌঁছানোর আগেই ইমাম রুকু থেকে উঠে গিয়েছিলেন। সুতরাং আপনি ইমামের সাথে সে রাকাত পেতে পারেননি।

হুকুম:

  • যখন ইমাম সালাম ফিরাবেন, তখন আপনি দাঁড়িয়ে যান এবং একটি রাকাত নিজে পড়ে নিন (যেহেতু একটি রাকাত ছুটে গেছে)। এটি ক্বাযা (ছুটে যাওয়া রাকাত পূরণ) হিসেবে গণ্য হবে।
  • আপনি যদি নিশ্চিত না হন, তবে সন্দেহের ভিত্তিতে ধরে নিন যে আপনি রাকাতটি পাননি; কারণ এখানে বাস্তব অবস্থা সেটাই ইঙ্গিত করছে। আর যদি আপনি মনে করেন যে হয়তো আপনি ইমামকে রুকুতে পেয়েছিলেন (অর্থাৎ ইমামের মাথা তোলার আগেই আপনি রুকুতে চলে গিয়েছিলেন), তবে ধরে নিতে পারেন রাকাত পেয়েছেন এবং সালামের পর কিছু করতে হবে না। তবে বাস্তব বিবরণে আপনার রুকুতে যাওয়ার পর ইমাম "سَمِعَ اللَّهُ" পড়েছেন, যা ইমামের ইতিমধ্যে রুকু থেকে ওঠার প্রমাণ।

হানাফি কিতাবের দলিল:

  • الهداية (১/৮০): "وإذا أدرك الإمام في الركوع فقد أدرك الركعة، وإن أدركه بعد رفع رأسه فقد فاتته الركعة"
    অর্থ: “ইমামকে যদি রুকুতে পায়, তবে রাকাত পেয়ে যাবে; আর যদি ইমাম মাথা তোলার পর পায়, তবে রাকাত ছুটে যাবে।”
  • رد المحتار (২/২৮২): "شرط إدراك الركعة أن يدرك الإمام في الركوع ويسجد معه سجدتي تلك الركعة"
    অর্থ: “রাকাত পাওয়ার শর্ত হলো, ইমামকে রুকুতে পাওয়া এবং তার সাথে সে রাকাতের দুটি সিজদা করা।”
  • فتاوی ہندیہ (১/৯০): "إذا أدرك الإمام في الركوع واطمأن معه فقد أدرك الركعة"

২. নেশা করার পর কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া-দুরুদ ইত্যাদি ইবাদত করা

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
গাজা, ইয়াবা, ঘুমের ওষুধ ইত্যাদি দ্বারা নেশা করার পর (যে নেশায় হিতাহিত জ্ঞান একেবারে লোপ না পায়, অর্থাৎ পুরো জ্ঞান হারায় না) তাহলে কি পবিত্র অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া-দুরুদ ইত্যাদি ইবাদত করা জায়েয হবে?

উত্তর:
উল্লিখিত নেশাদার দ্রব্য (গাজা, ইয়াবা, ঘুমের ওষুধ ইত্যাদি) ব্যবহার করা শরিয়তে সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ। এই জিনিসগুলো সেবন করে ইবাদত করা আরও বড় গুনাহ।

নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ইবাদতের ব্যাপারে ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশনা হলো:

  • পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: "يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَىٰ حَتَّىٰ تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ"
    (সূরা নিসা ৪:৪৩)
    অর্থ: “হে মুমিনগণ, তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেও না, যতক্ষণ না তোমরা কী বলছ তা বুঝতে পারো।”
  • এই আয়াত শুধু নামাজের জন্যই নয়, বরং কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ইত্যাদি যেকোনো ইবাদতের জন্যও প্রযোজ্য, কারণ এসবের জন্য জ্ঞান ও চেতনা থাকা জরুরি।

হাদিসে এসেছে:
"لَا يُقْرَأُ الْقُرْآنُ وَهُوَ جُنُبٌ وَلَا وَهُوَ سَكْرَانُ"
(মিশকাতুল মাসাবিহ, বাবু তিলাওয়াতিল কুরআন)
অর্থ: “যে ব্যক্তি জুনুবি বা নেশাগ্রস্ত, সে কুরআন তিলাওয়াত করবে না।”

হানাফি ফিকহের বিধান:

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, নেশা এমন একটি অবস্থা যা জ্ঞান ও ইচ্ছাশক্তিকে বিনষ্ট করে বা দুর্বল করে দেয়। তাই নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির দ্বারা কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ইত্যাদি ইবাদত করা বৈধ নয়।
  • যদি ব্যক্তি নেশার কারণে পুরোপুরি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে (যেমন, সে কী পড়ছে তা বোঝে না), তাহলে তার ইবাদত বাতিল বলে গণ্য হবে।
  • আর যদি নেশা এমন হয় যে, সামান্য ঝিমুনি বা অজ্ঞানতা আছে কিন্তু জ্ঞান সম্পূর্ণ লোপ পায়নি, তবুও ইবাদত করা মাকরুহ তাহরিমি (হারামের কাছাকাছি) এবং গুনাহের কাজ; কারণ নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ইবাদতের আদব ও সম্মান বজায় থাকে না।

উপসংহার:
গাজা, ইয়াবা, ঘুমের ওষুধ ইত্যাদি নেশাদার দ্রব্য সেবন করা প্রথমত হারাম। এরপর সেই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া-দুরুদ বা অন্য কোনো ইবাদত করা জায়েয নয়। বরং এরূপ করা আরও বড় গুনাহ। যদি কেউ নেশা করে ফেলে, তাহলে তার উচিত নেশা কেটে যাওয়ার পর এবং পূর্ণ জ্ঞান ফিরে আসার পর তওবা করা এবং সে সময় ইবাদত করা। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ইবাদত করলে তা কবুল হবে না বরং অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

হানাফি কিতাবের দলিল:

  • رد المحتار (১/১৩৬): "لا تجوز الصلاة حال السكر ولا القراءة ولا الذكر"
    অর্থ: “নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির জায়েয নয়।”
  • فتاوی عالمگیری (৫/৩৬৩): "السكران لا تصح صلاته ولا قراءته ولا أذكاره"
  • در مختار (১/১৩৫): "المراد بالسكران من لا يعقل ما يقول"

সুতরাং, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কোনো ইবাদত করা উচিত নয়। তওবা করে নেশা ছেড়ে দিতে হবে এবং পূর্ণ জ্ঞান ফিরে এলে ইবাদত করতে হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হারাম থেকে বাঁচার এবং ইবাদতে একনিষ্ঠ হওয়ার তাওফিক দিন। (আমিন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.