কসমের কাফফারা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
তবে ১০ জন মিসকিন কে বলা আছে, তবে মিসকিনের ডেফিনেশন অনুযায়ী আমি যাদের দিয়েছি তাদের মিল নেই। এখন কি আমার কাফফারা আদায় হবে?
Answer
কসমের কাফফারা ও মিসকিনের সংজ্ঞা: আপনার প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনি কসমের কাফফারা হিসেবে ১০ জন দরিদ্র ব্যক্তিকে ফিতরা পরিমাণ টাকা দিয়েছেন। কিন্তু জানতে পেরেছেন যে, ইসলামী শরিয়তে কাফফারার প্রাপক হতে হবে ‘মিসকিন’, আর আপনার দেওয়া ব্যক্তিরা মিসকিনের সংজ্ঞায় পড়ে না। এখন জানতে চান, আপনার কাফফারা আদায় হয়েছে কি না।
উত্তর
না, আপনার কাফফারা আদায় হয়নি। আপনাকে পুনরায় ১০ জন প্রকৃত মিসকিনকে (অথবা ফকিরকে) কাফফারা দিতে হবে। পূর্বে দেওয়া টাকা সদকা হিসেবে গণ্য হবে, কিন্তু কাফফারা হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না। নিচে বিস্তারিত কারণ ও হানাফি ফিকহের দলিল পেশ করা হলো।
১. কসমের কাফফারার শরয়ি পদ্ধতি
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ (সূরা মায়িদা: ৮৯) “অতএব এর কাফফারা হলো, দশজন মিসকিনকে মধ্যম ধরনের খাবার খাওয়ানো, যা তোমরা নিজ পরিবারকে খাওয়াও, অথবা তাদের বস্ত্র দান করা, অথবা একজন দাস মুক্ত করা।”
হানাফি মতে, খাওয়ানোর ক্ষেত্রে প্রত্যেক মিসকিনকে সাদাকাতুল ফিতরের সমপরিমাণ (অর্ধ সা‘ গম বা তার মূল্য, অথবা এক সা‘ খেজুর/যব বা তার মূল্য) দেওয়া জরুরি। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/২৪২; রদ্দুল মুহতার, ৩/৭০৪)
আপনি টাকা দিয়েছেন—এটি জায়েজ আছে, কারণ ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে মূল্য দেওয়াও বৈধ। কিন্তু শর্ত হলো, প্রাপক মিসকিন হতে হবে।
২. মিসকিনের সংজ্ঞা (হানাফি ফিকহে)
হানাফি ফিকহে ‘মিসকিন’ ও ‘ফকির’—উভয়ই কাফফারার প্রাপক হতে পারে। তাদের সংজ্ঞা নিম্নরূপ:
- মিসকিন: যে ব্যক্তি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নয়, কিন্তু কিছু সম্পদ বা আয় আছে যা তার ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা (এক বছরের জন্য) পূরণ করে না।
- ফকির: যে ব্যক্তি একেবারেই নিঃস্ব, কোনো সম্পদ বা উপার্জন নেই।
মোট কথা: কাফফারার প্রাপক হতে হবে এমন ব্যক্তি, যার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই এবং সে জাকাত, ফিতরা গ্রহণের উপযুক্ত। (রদ্দুল মুহতার, ২/৩৪৪; ফাতাওয়া উসমানি, ১/৫২২)
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, আপনি যাদের টাকা দিয়েছেন, তারা মিসকিনের এই সংজ্ঞার সাথে মেলে না। অর্থাৎ তারা হয় নেসাবের মালিক, অথবা তাদের আয় মৌলিক চাহিদার জন্য যথেষ্ট। সুতরাং তারা কাফফারার প্রাপক হওয়ার যোগ্য নয়।
৩. প্রাপক মিসকিন না হলে কাফফারার হুকুম
হানাফি ফিকহের বড় কিতাবগুলোতে স্পষ্ট বলা হয়েছে:
إذا دفع الكفارة إلى من يظنه مسكيناً فبان غنياً لم تجز
“যদি কেউ কাফফারা এমন ব্যক্তিকে দেয় যাকে সে মিসকিন ধারণা করে, পরে জানতে পারে সে ধনী, তবে কাফফারা আদায় হবে না।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/২৪২; রদ্দুল মুহতার, ৩/৭০৮)
আরও বলা হয়েছে:
لا يجوز دفع الكفارة إلا إلى من تجوز له الصدقة
“কাফফারা শুধু তার জন্যই জায়েজ, যার জন্য সদকা জায়েজ (অর্থাৎ মিসকিন/ফকির)।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/২৪৩)
সুতরাং আপনি যদি জেনে থাকেন যে প্রাপকরা প্রকৃত মিসকিন নয়, তাহলে আপনার কাফফারা আদায় হয়নি। এমনকি আপনি যদি ভুলবশত অমিসকিনকে দিয়ে থাকেন, তাহলেও কাফফারা আদায় হবে না—পুনরায় আদায় করতে হবে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১২৯)
৪. এরপর করণীয়
১. পুনরায় ১০ জন প্রকৃত মিসকিনকে কাফফারা দিন।
- প্রত্যেককে অর্ধ সা‘ গমের মূল্য (বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী) অথবা এক সা‘ খেজুর/যবের মূল্য দিন।
- অথবা তাদেরকে দু’বেলা পেট ভরে খাওয়াতে পারেন। (বাহিশতি জেওর, ২/৪২)
২. পূর্বে দেওয়া টাকা সদকা গণ্য হবে। আপনি যদি সে টাকা ফেরত নিতে পারেন (যেহেতু অমিসকিনকে দেওয়া), তবে নিতে পারেন এবং পুনরায় মিসকিনকে দিন। আর যদি ফেরত নেওয়া সম্ভব না হয়, তবে তা সদকা হিসেবে গণ্য হবে এবং আপনি সওয়াব পাবেন।
৩. মিসকিন চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সতর্ক হোন। সাধারণত মাদ্রাসার ছাত্র, মসজিদের মুয়াজ্জিন, অসহায় বিধবা, এতিম, দিনমজুর—এদের মিসকিন হিসেবে গণ্য করা যায়। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্থানীয় আলেম বা সমাজের বিশ্বস্ত ব্যক্তির সাহায্য নিন।
৫. বিশেষ নোট
- সকল মিসকিন ভিন্ন ভিন্ন হতে হবে। একই ব্যক্তিকে ১০ বার দেওয়া যথেষ্ট নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৭১০)
- ফিতরার পরিমাণ টাকা দেওয়া জায়েজ, তবে শুধু টাকা দিলে সন্তুষ্ট হওয়ার জন্য ‘খোরাকি’ বা ‘মূল্য’ নেওয়ার নিয়ত করতে হবে। (ফাতাওয়া উসমানি, ১/৫২৪)
- যদি কাফফারা দেওয়ার সামর্থ্য না থাকে, তবে তিন দিন রোজা রাখার বিকল্প আছে। (সূরা মায়িদা: ৮৯)
উপসংহার
আপনার কাফফারা আদায় হয়নি। আপনাকে পুনরায় ১০ জন প্রকৃত মিসকিনকে ফিতরা পরিমাণ টাকা বা খাবার দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা আপনার তওবা ও ইবাদত কবুল করুন। আমিন।