মেয়েদের সহশিক্ষায় পড়াশোনা

Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 1536
Questioner: Ifrat Jahan
Question Asked: 12 Jun 2026, 11:35 AM
Reviewed & Published: 12 Jun 2026, 12:20 PM
Views: 53
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

মেয়েদের সহশিক্ষায় পড়াশোনা করা যাবে

Answer

প্রশ্ন: মেয়েদের সহশিক্ষায় পড়াশোনা করা যাবে?

উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, সালাত ও সালাম নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর পরিবার-সাহাবাদের উপর।

ইসলাম পুরুষ ও নারীর মাঝে অবাধ মেলামেশা (ইখতিলাত) নিষিদ্ধ করেছে, বিশেষ করে যখন তা ফিতনার কারণ হয়। কুরআন-হাদিস এবং সালাফে সালেহীনের ইজমা অনুসারে, অপ্রয়োজনীয় এবং শরিয়তের সীমারেখা লঙ্ঘন করে নারী-পুরুষের একত্রে অবস্থান করা হারাম। তবে কিছু জরুরি প্রয়োজনে (ঔষধ, শিক্ষার মতো) সীমিত ও শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে পর্দা, দৃষ্টি নিচু রাখা, নির্জনে মিলন (খলওয়া) না হওয়া ইত্যাদি শর্ত কঠোরভাবে পালন করতে হবে।

নিম্নে সহশিক্ষা বিষয়ে সালাফি/আহলে হাদীস ফিকাহ অনুযায়ী বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হলো:


১. কুরআন ও হাদিসে ইখতিলাত নিষিদ্ধ হওয়ার প্রমাণ

আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ ...
"আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নিচু রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে..." (সূরা আন-নূর: ৩১)

আল্লাহ আরও বলেন:
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ذَٰلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ
"আর তোমরা যখন তাদের কাছে কিছু চাইবে, পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটাই তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য অধিক পবিত্র।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৩)

এই আয়াত নবীজীর স্ত্রীদের সম্পর্কে হলেও, অন্য নারীদের জন্যও সাধারণ নির্দেশনা বহন করে। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) বলেন:
"আল্লাহ তাআলা মুমিন নারীদেরকে দৃষ্টি নিচু রাখার এবং পর্দা করার আদেশ দিয়েছেন, আর তা পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশা থেকে বিরত রাখার জন্যই।" (মাজমু ফাতাওয়া: ১৫/৩৭৩)

হাদিসে এসেছে:
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ. فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَرَأَيْتَ الْحَمْوَ؟ قَالَ: الْحَمْوَ الْمَوْتُ.
"তোমরা নারীদের কাছে (একা) প্রবেশ করা থেকে সাবধান। তখন এক আনসারী বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! দেবর সম্বন্ধে কী বলেন? তিনি বললেন: দেবর তো মৃত্যুরই নামান্তর।" (সহীহ বুখারী: ৫২৩২, সহীহ মুসলিম: ২১৭২)
ইমাম নববী (রহ.) সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় বলেন: "এই হাদিস নারী-পুরুষের মেলামেশা এবং নির্জনতা নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রমাণ।"


২. সহশিক্ষার বিধান (Co-education)

সালাফি/আহলে হাদীস ফুকাহায়ে কেরামের মতামত:

ক. শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.)
তিনি ফাতাওয়াতে বলেন:
"মেয়েদের জন্য ছেলেদের সাথে একত্রে পড়াশোনা করা জায়েজ নয়। বরং মেয়েদের পৃথক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকা উচিত। যদি পৃথক ব্যবস্থা না থাকে, তবে প্রয়োজনে পৃথক ক্লাসরুম, পৃথক সময়, পূর্ণ হিজাব এবং দৃষ্টি নিচু রাখার শর্তে অস্থায়ীভাবে অনুমতি দেওয়া যেতে পারে, তবে যত দ্রুত সম্ভব পৃথক ব্যবস্থা করতে হবে। আর যদি একত্রে বসে পড়ার কারণে ফিতনা (প্রেম-প্রীতি, অশ্লীলতা) সৃষ্টি হয়, তাহলে তা স্পষ্ট হারাম।"
(মাজমু ফাতাওয়া শায়খ ইবনে বায: ৯/৪১৮-৪২০; ফাতাওয়া ইসলামিয়্যা: ৩/২৬০)

খ. শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন (রহ.)
তিনি বলেন:
"সহশিক্ষা নিষিদ্ধ। কারণ এটি ফিতনার দরজা খুলে দেয়। ইসলাম ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে পৃথক ব্যবস্থার নির্দেশ দেয়। যদি কোনো এলাকায় মেয়েদের জন্য আলাদা স্কুল না থাকে এবং লেখাপড়া ফরজ হয়, তবে কঠোর পর্দা ও পরপুরুষের দৃষ্টি থেকে আড়ালে থাকার মাধ্যমে পড়া জায়েজ হতে পারে, কিন্তু তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে হতে হবে।" (ফাতাওয়া নুরুন আলাদ-দারব; ফাতাওয়া আল-মারআ: ২/৫৭৬)

গ. শায়খ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (রহ.)
তিনি আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁর মতে, পুরুষ-মহিলার মিশ্র শিক্ষা হারাম এবং তা কখনো জায়েজ নয়, এমনকি পর্দার শর্তেও নয়, কারণ মিশ্র শিক্ষার পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদে পর্দা রক্ষা করা অসম্ভব করে দেয়। তিনি বলেন:
"যে শিক্ষাব্যবস্থায় নারী-পুরুষ একত্রে বসে, তা নিঃসন্দেহে হারাম, কেননা তা গুনাহের মাধ্যম।" (সিলসিলা সহীহা: ২/১৭৮)

ঘ. শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফি.)
তিনি বলেন:
"সহশিক্ষা জায়েজ নয়। নারীদের জন্য আলাদা শিক্ষার ব্যবস্থা করা ওয়াজিব। যদি কোনো এলাকায় আলাদা স্কুল না থাকে, তাহলে বাসায় মা-বাবা বা মাহরামদের সাহায্যে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। বাস্তবে কেবলমাত্র চরম প্রয়োজনেই সীমিত অনুমতি দেওয়া যায়, কিন্তু সেখানেও পর্দা ও শালীনতা কঠোরভাবে পালনীয়।" (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া ফাওযান: ২/১৪২)

ঙ. ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.)
তিনি ফিতনার পথ বন্ধ করার গুরুত্বের উপর জোর দিয়ে বলেন:
"শরিয়তের মূল লক্ষ্য হলো ফিতনার দরজা বন্ধ করা। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ফিতনার কারণ, তাই তা নিষিদ্ধ।" (যাদুল মা'আদ: ১/১২৬)


৩. যদি সহশিক্ষা অপরিহার্য হয় তবে শর্তসমূহ

যেসব পরিস্থিতিতে মেয়েদের জন্য কোনো বিকল্প না থাকে (যেমন: দেশের আইনগত বাধ্যবাধকতা বা চরম প্রয়োজন), সেক্ষেত্রে নিম্নলিখিত শর্তগুলো মানতে হবে:

১. সম্পূর্ণ পর্দা (হিজাব, লম্বা ও ঢিলে কাপড়, হাত-পা-মুখ ঢাকা) নিশ্চিত করা।
২. দৃষ্টি নিচু রাখা এবং কোনো প্রকার অশালীন কথাবার্তা, ঠাট্টা-মশকরা বা সম্পর্ক তৈরি না করা।
৩. নির্জনে মিলন (খলওয়া) না হওয়া—সর্বদা প্রকাশ্যে এবং অন্য ছাত্রীদের সাথে থাকা।
৪. পড়াশোনার বিষয় সীমিত ও সংক্ষিপ্ত রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় দেরি না করা।
৫. উন্নত সুগন্ধি ব্যবহার না করা এবং আকর্ষণীয় পোশাক পরিহার করা।
৬. নারী শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে পুরুষ শিক্ষকের সাথে অতি প্রয়োজনে পর্দার আড়ালে কথা বলা।

শায়খ ইবনে বায (রহ.) বলেন:
"যদি পৃথক বিদ্যালয় না থাকে এবং জ্ঞানার্জন ফরজ হয়, তাহলে কঠোর পর্দা ও দৃষ্টি নিচু রাখা সাপেক্ষে অস্থায়ীভাবে অনুমতি আছে। তবে মুসলিম উম্মাহর জন্য আলাদা ব্যবস্থা তৈরি করা ওয়াজিব।" (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যা: ৩/২৬০)


৪. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

সহশিক্ষা কেবলমাত্র প্রয়োজনের সীমারেখার মধ্যেই অনুমোদিত—যতটুকু না পড়লে ক্ষতি বা অপরিহার্য জ্ঞান থেকে বঞ্চনা হয়। তবে বর্তমানে অনেক ইসলামি দেশেই ছেলে-মেয়েদের আলাদা শিক্ষার ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। সেক্ষেত্রে সহশিক্ষায় যাওয়া গুনাহের কাজ। শায়খ আলবানী (রহ.) বলেছেন:
"আজকাল বেশিরভাগ দেশেই আলাদা ব্যবস্থা আছে; অতএব মুসলিমদের উচিত সহশিক্ষা পরিহার করা।"


৫. উপসংহার

১. মেয়েদের জন্য সহশিক্ষা (নারী-পুরুষ একত্রে পড়া) মৌলিকভাবে নিষিদ্ধ (হারাম) এবং ফিতনার কারণ।
২. জরুরি প্রয়োজনে (যেমন: কোনো বিকল্প না থাকা, ফরজ জ্ঞান অর্জনের জন্য) কঠোর পর্দা ও শরিয়তের শর্তসাপেক্ষে সীমিত অনুমতি দেওয়া যেতে পারে, তবে শর্তগুলো কঠোরভাবে পালন করতে হবে।
৩. মুসলিমদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা বা বর্তমান ব্যবস্থায় পৃথক ক্লাসরুম/সময়ের ব্যবস্থা করা।
৪. যেখানে সহশিক্ষায় ফিতনা (প্রেম-প্রীতি, অশালীনতা) স্পষ্ট, সেখানে তা স্পষ্ট হারাম

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তার সন্তুষ্টির পথে চলার তাওফিক দিন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.