ফরজ গোসল আদায়ের ক্ষেত্রে কীভাবে কানে পানি পৌছানো যাবে? এবং বিবিধ পবিত্রতার প্রশ্ন
Taharah Purity · Hanafi
Question
উস্তাজ, আমি কানে ফুটা করার পর কানের দুল বা কাঠি দিতে পারিনা,ব্যাথা হয়ে যায়।ছিদ্র মোছেও যাচ্ছে না।কিন্তু কোন কিছু দিলে কান ব্যাথা হয়ে যায়।এমতাবস্থায় ফরজ গোসল আদায়ের ক্ষেত্রে আমি কীভাবে পানি পৌছাবো? কানের দুল দিতে পারলে নাড়াছাড়া করলে হয়ে যেতো কিন্তু আমি দুল দিতে পারিনা,আমার জন্য বিধান কী?
২)চুলে জোটা বাঁধার ক্ষেত্রে ঘরের মধ্যে উঁচু করে ঝোটা করা যাবে? নাকি ঘরে -বাইরে একই বিধান?
৩) চুলের আগা অনেক ড্যামেজ হয়ে যাচ্ছে, এমতাবস্থায় কী আগা ছাঁটা যাবে?
৪) জামায়াত ধরতে গেলে যদি ফজরের সুন্নত পড়ার সময় না থাকে এমতাবস্থায় সুন্নত পড়বে নাকি জামায়াত ধরবে?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর নিম্নরূপ দেওয়া হলো—
১. কানের ছিদ্রে ব্যথার কারণে ফরজ গোসলের পানি পৌঁছানোর বিধান
আপনার ক্ষেত্রে যদি কানের দুল বা কাঠি পরালে ব্যথা হয়, তাহলে সেগুলো পরা জরুরি নয়। ফরজ গোসল ও ওজুর সময় কানের ছিদ্রের ভেতরে পানি পৌঁছানো ফরজ নয়, যদি ছিদ্রটি বন্ধ না হয়ে যায়। বরং কানের লতি বাইরে থেকে ধুয়ে ফেললেই হবে। কারণ ছিদ্রের ভেতরে পানি পৌঁছানো ফরজ নয়, যতক্ষণ না তা চামড়া দিয়ে ঢেকে যায়।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (১/১৫০): "কানের ছিদ্র ধোয়া ফরজ নয়, বরং বাইরের অংশ ধোয়াই যথেষ্ট।"
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১৫): "কানের ছিদ্রের ভেতরে পানি পৌঁছানো ফরজ নয়, যদি না তাতে কিছু জিনিস থাকে যা পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়।"
আপনার করণীয়:
- ব্যথার কারণে কানের দুল না পরলেও কোনো সমস্যা নেই। গোসল ও ওজুর সময় শুধু কানের লতি বাইরে থেকে ভালোভাবে ধুবেন।
- ছিদ্রটি যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পুনরায় ফুটা করার প্রয়োজন নেই। তবে ছিদ্রটি থাকলে তার ভেতরে পানি পৌঁছানোর দরকার নেই।
- ব্যথার কারণে ছিদ্রটি সম্ভব হলে অল্প সময়ের জন্য খালি রাখুন। কিন্তু যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পরবর্তীতে আবার ফুটা করতে পারেন।
২. ঘরের মধ্যে চুল উঁচু করে ঝোটা বাঁধার বিধান
নামাজের সময় চুল উঁচু করে বাঁধা মাকরুহ (অপছন্দনীয়), যাতে সিজদার সময় কপাল ও নাক মাটিতে ঠিকমতো না লাগে। তবে নামাজের বাইরে ঘরের ভেতর ও বাইরে চুল উঁচু করে বাঁধায় কোনো দোষ নেই, যতক্ষণ তা অহংকার বা ফাসদের উদ্দেশ্যে না হয়।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী (২/২৪১): "নারীরা নিজ ঘরে চুল উঁচু করে বাঁধতে পারে। তবে নামাজের সময় তা খুলে বা নিচু করে রাখা উচিত।"
- বাহিশতি জেওর (নামাজ অধ্যায়): "নামাজে চুল বাঁধা মাকরুহ, যদি তা সিজদায় বাধা দেয়।"
আপনার করণীয়:
- ঘরের ভেতর ও বাইরে চুল উঁচু করে বাঁধা জায়েজ, তবে নামাজের সময় খুলে রাখা বা নিচু করে বাঁধা উত্তম।
৩. চুলের আগা কাটার বিধান
চুলের আগা ড্যামেজ হলে তা কাটা জায়েজ এবং মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)। এটি চুলের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যের জন্য করা যায়। তবে ইহরাম অবস্থায় বা বিশেষ কোনো নিয়ত না থাকলে চুল কাটাতে কোনো দোষ নেই।
রেফারেন্স:
- মাআরিফুল কুরআন (সূরা নূহ ৭১:১৯-২০-এর তাফসীর): "চুলের যত্ন নেওয়া ও পরিচ্ছন্ন রাখা ইসলামের নির্দেশ।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/১২০): "চুলের আগা কাটা জায়েজ, বিশেষত যদি তা নষ্ট হয়ে যায়।"
আপনার করণীয়:
- ড্যামেজ চুলের আগা কেটে ফেলতে পারেন। এটি সুন্নতের পরিপন্থী নয়।
৪. ফজরের সুন্নত ও জামাতের মধ্যে অগ্রাধিকার
ফজরের সুন্নত খুব গুরুত্বপূর্ণ (সুন্নতে মুয়াক্কাদা)। তবে যদি জামাত শুরু হয়ে যায় এবং সুন্নত পড়লে জামাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে জামাতের ফরজ পড়া জরুরি এবং সুন্নত পরবর্তী সময়ে (সূর্যোদয়ের পর) কাযা করা যাবে।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১৫২): "ফজরের সুন্নত ও জামাতের মধ্যে দ্বন্দ্ব হলে, জামাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সুন্নত পরে কাযা করবে।"
- রদ্দুল মুহতার (২/৫২১): "যদি জামাতের সময় সংকীর্ণ হয়, তাহলে সুন্নত ছেড়ে জামাতে শরিক হওয়া ওয়াজিব।"
আপনার করণীয়:
- জামাত শুরু হয়ে গেলে সরাসরি জামাতে দাঁড়িয়ে যান। ফজরের সুন্নত পরে (সূর্যোদয়ের পর ২০ মিনিট থেকে দুপুরের আগে) পড়ে নিন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১. কানের ছিদ্রের ভেতরে পানি পৌঁছানো ফরজ নয়, বাইরে ধুয়ে ফেললেই হবে।
২. ঘরের ভেতর ও বাইরে চুল উঁচু করে বাঁধা জায়েজ, তবে নামাজে নয়।
৩. ড্যামেজ চুলের আগা কাটা জায়েজ।
৪. ফজরের সুন্নতের চেয়ে জামাতে শরিক হওয়া জরুরি, সুন্নত পরে পড়বেন।
আল্লাহ তাআলা আপনার সব কাজে সহজতা দান করুন।
(আমিন)