What should I do now?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি আমার লাইফ নিয়ে অনেক বেশি চিন্তিত। আমি অতীতে অনেক গুনাহ করছি, অনেক। বিশেষ করে আমার মূল এবং প্রধান গুনাহ হচ্ছে যিনা। আমি হিদায়েত পাওয়ার পর সব ছেড়ে দেই, এরপর আবার এই ফিতনায় পরে যাই। আমি একা একা বড় হই। বাবা মা কেউ ছিল না। ২০ বছর পর জানতে পারি আমার বাবা মা আছে। কিন্তু ততদিনে আমি লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলেছিলাম হিদায়েত পাওয়ার পর এরপর সেখানে আমার কিনায়া তালাক হয়ে যায়। পরবর্তীতে আমি আবারও আরেকটা হারাম রিলেশন এ জড়িয়ে পরি। আমার কিছু ভালো লাগে না। ছোটবেলা থেকে কারো আদর পাইনি, কেউ একটু ভালোবাসা দিলেই আমি গলে যাই। কিন্তু এগুলা গুনাহ করার কোন কারণ হতে পারে না। আমি সবকিছু ছেড়ে দিতে চাই, আমার বয়স এখন ২৫। আমার বাসা থেকে বিয়ে দেয়ার কোন চিন্তা নাই। তারা চায় ৩০ এর পর আমাকে বিয়ে দিতে। আমি অলরেডি এত ফিতনার মধ্যে পড়েছি, বিশেষ করে গোপনে ঐ বিয়ে করার পর থেকে আমার শারীরিক চাহিদা কাজ করে। আমি আমার জীবন পুরোপুরি নষ্ট করে ফেলেছি। পরিবার চায় আমি বিদেশ যাই, সেখানে গিয়ে সেটেল হই চাকরি করি। কিন্তু আমার মন মানে না, আমার কিচ্ছু ভালো লাগে না। আমি এই গুনাহের জগৎ থেকে বের হতে চাই, আমি আল্লাহর পথে নিজেকে ওয়াকফ করে দিতে চাই, আমি নিজের একটা পরিবার চাই। আমি কী করব আমাকে পরামর্শ দিন। আমার কোন কিছুতে মনোযোগ বসে না, অনেক কষ্ট লাগে। এমন কষ্ট যেটা আমি কাউকে বলতে পারি না।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই আমি আপনার কষ্ট ও অনুতাপের গভীরতা অনুভব করছি। আপনার অবস্থা শুনে আমার খুবই মায়া হচ্ছে। আপনি যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই কঠিন। কিন্তু জেনে রাখুন, আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
"বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর অত্যাচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
আপনার প্রধান সমস্যা হলো যিনা (ব্যভিচার) এবং হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া। এটি নিঃসন্দেহে কবীরা গুনাহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ
"যিনাকারী ব্যক্তি যখন যিনা করে, তখন সে মুমিন থাকে না।" (সহীহ বুখারী: ২৪৭৫)
তবে আপনার তওবা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই, যদি আপনি শর্তানুযায়ী তওবা করেন। তওবার শর্ত হলো:
- গুনাহ থেকে ফিরে আসা (তখনই ছেড়ে দেওয়া)
- কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া
- ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা
- অন্যায়ভাবে অর্জিত কোনো সম্পদ থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা মাফ চাওয়া (যিনার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়, তবে গোপনে বিয়ে করার ফলে কোনো অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে তা সংশোধন করতে হবে)
ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, তওবা কবুল হওয়ার জন্য গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং অনুতপ্ত হওয়াই যথেষ্ট। আল্লাহর রহমত অপরিসীম।
আপনার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
1. আপনার বর্তমান হারাম সম্পর্ক থেকে এখনই আলাদা হয়ে যান
আপনি যদি সত্যিই আল্লাহর পথে ফিরে আসতে চান, তাহলে প্রথম কাজ হলো এখনই এই হারাম সম্পর্ক ছিন্ন করা। হাদিসে এসেছে:
مَنْ تَرَكَ شَيْئًا لِلَّهِ عَوَّضَهُ اللَّهُ خَيْرًا مِنْهُ
"যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কোনো কিছু ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন।" (মুসনাদ আহমদ: ২৩০৭৪)
2. বিয়ের চেষ্টা করুন
আপনার বয়স ২৫, এই বয়সে বিবাহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার পরিবার যদি ৩০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলে, তাহলে আপনি নিজে উদ্যোগী হয়ে একজন আলেম বা দ্বীনি ব্যক্তির মাধ্যমে বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন। ইসলাম আমাদেরকে তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে উৎসাহিত করেছে:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ
"হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়।" (সহীহ বুখারী: ৫০৬৬)
আপনার মধ্যে শারীরিক চাহিদা কাজ করছে, যা স্বাভাবিক। কিন্তু ইসলামের পথ হলো বিবাহ, হারাম সম্পর্ক নয়। বিয়ের মাধ্যমে আপনি এই চাহিদা পূরণ করতে পারবেন, গুনাহ থেকে বাঁচতে পারবেন এবং একটি হালাল পরিবার গড়তে পারবেন।
3. গোপনে বিয়ের বিষয়টি স্পষ্ট করুন
আপনি যে গোপনে বিয়ে করেছিলেন এবং সেখানে তালাক হয়েছে, সেই ব্যাপারে আপনার জন্য করণীয়:
- যদি সেই বিয়েতে আপনার কোনো ইদ্দত ছিল (তালাকের পর মহিলার ইদ্দতকাল), তাহলে তা সম্পন্ন হয়েছে কিনা নিশ্চিত হন।
- আপনার বর্তমান অবস্থায় এখন আপনাকে পূর্ণ তওবা করে বিবাহের নিয়ত করতে হবে। কোনো গোপন বিয়ের ইতিহাস ভবিষ্যতের বিয়েতে বাধা হওয়া উচিত নয়, তবে আপনার বিবাহের প্রস্তাবে সৎ থাকা জরুরি।
4. বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করুন
আপনার পরিবার চায় আপনি বিদেশ যান এবং সেটেল হন। কিন্তু আপনার মন মানছে না, যা বুঝায় আপনার জন্য এটি সময়োপযোগী নয়। আপনি যদি দ্বীনের পথে থাকতে চান, তাহলে বর্তমানে একজন সুশৃঙ্খল দ্বীনি পরিবেশ ও নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগী আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে যদি আপনি বিদেশে দ্বীনি সংগঠন বা মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে ভালো দ্বীনি পরিবেশ পেতে পারেন, তাহলে সেটিও বিবেচনা করতে পারেন।
5. নিজেকে আল্লাহর পথে ওয়াকফ করার নিয়ত
আপনি বলেছেন "আল্লাহর পথে নিজেকে ওয়াকফ করে দিতে চাই"। এটি একটি উত্তম নিয়ত। তবে এর জন্য প্রয়োজন:
- দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করা (কুরআন, হাদিস, ফিকাহ)
- একজন আলেমের শিষ্য হওয়া
- দ্বীনের কাজে অংশ নেওয়া (মসজিদের খেদমত, ইসলামিক দাওয়াত)
আপনি কী ধরনের দ্বীনি কাজ করতে চান, সেটা নির্ধারণ করে একজন বড় আলেমের পরামর্শ নিন।
6. আপনার মানসিক ও আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন
আপনি বলছেন "কোনো কিছুতে মনোযোগ বসে না, অনেক কষ্ট লাগে"। এটি হতাশা ও বিষণ্নতার লক্ষণ হতে পারে। এজন্য করণীয়:
- নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ুন, বিশেষ করে তাহাজ্জুদ নামাজের চেষ্টা করুন
- কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝার চেষ্টা করুন
- দুআ ও ইস্তিগফার বেশি করে পড়ুন: "رَبِّ إِنِّي مَغْلُوبٌ فَانتَصِرْ" "আল্লাহুম্মা ইন্নি আস্আলুকাল হুদা ওয়াত্তুকা ওয়াল আফাফা ওয়াল গিনা"
- প্রতিদিন নিজেকে বুঝিয়ে বলুন: "আমি আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা রাখছি"
7. কাউকে না বলতে পারার কষ্ট
আপনার এই কষ্ট আপনি আল্লাহর কাছে সরাসরি বলতে পারেন। দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে কান্না করে আল্লাহর কাছে নিজের সব কষ্ট পেশ করুন। আপনি একটি ডায়েরি রাখতে পারেন, যেখানে আপনার কষ্টগুলো লিখবেন, তারপর তা আল্লাহর কাছে পেশ করবেন। অথবা একজন বিশ্বস্ত আলেমের কাছে আপনার সমস্যা খুলে বলুন।
ব্যবহারিক পরামর্শ
| করণীয় | বর্ণনা | |--------|--------| | 1. তওবা করুন | এখনই একাগ্রচিত্তে তওবা করুন এবং হারাম সম্পর্ক ছেড়ে দিন | | 2. বিয়ের ব্যবস্থা করুন | নিজে উদ্যোগী হয়ে দ্বীনদার স্ত্রী খুঁজুন, মসজিদের ইমামের সাহায্য নিন | | 3. দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করুন | প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫ মিনিট কুরআন ও হাদিস পড়ুন | | 4. মসজিদে নিয়মিত যান | জামাতে নামাজ পড়ুন এবং দ্বীনি পরিবেশে থাকুন | | 5. ইবাদতে মন দেন | তাহাজ্জুদ, জিকির, তাসবিহ ও ইস্তিগফার বেশি করে পড়ুন | | 6. পেশাদার সাহায্য নিন | আপনার মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে গুরুত্ব সহকারে নিন এবং একজন কাউন্সেলরের সাহায্য নিন |
সমাপ্তি ও দোয়া
আপনার জীবন নষ্ট হয়নি। আপনি এখনও ২৫ বছর বয়সী, সারা জীবন সামনে আছে। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না এবং তা ছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।" (সূরা আন-নিসা: ৪৮)
আপনার তওবা কবুল হোক। আপনি যদি আন্তরিকভাবে তওবা করেন এবং ভবিষ্যতে সতর্ক হন, তাহলে ইনশাআল্লাহ আপনার সব গুনাহ মাফ হবে এবং আপনি একটি পবিত্র জীবন যাপন করতে পারবেন।
وَاتَّبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا - "নিশ্চয়ই ভালো কাজ মন্দ কাজকে মুছে দেয়।" (সূরা হুদ: ১১৪)
আপনার জন্য দুআ করছি। আল্লাহ আপনাকে হেদায়েত দান করুন এবং আপনার কষ্ট দূর করে দিন। আমিন।
পরামর্শ: দয়া করে নিকটস্থ কোনো বিশ্বস্ত আলেমের সাথে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করুন এবং তাকে আপনার পুরো অবস্থা খুলে বলুন। তিনি আপনাকে বিস্তারিত পরামর্শ দিতে পারবেন।
والله أعلم بالصواب