স্বামী স্ত্রীর একসাথে উমরাহ করা বিষয়ক
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি কয়েকটি দিক থেকে বিশ্লেষণ করা জরুরি। প্রথমত, উমরাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ইবাদত, তবে তা ফরজ নয়। দ্বিতীয়ত, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও পিতামাতার প্রতি কর্তব্য। তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন পর স্বামীর সাথে সাক্ষাৎ ও বৈবাহিক চাহিদা পূরণের প্রয়োজনীয়তা।
১. উমরাহয় স্ত্রীকে সঙ্গে নেওয়া বনাম পিতামাতাকে নেওয়া
(ক) পিতামাতার জন্য উমরাহ করা ওয়াজিব নয় যদি তারা নিজেরা সামর্থ্যবান না হন। তবে ছেলের জন্য তাদের উমরাহ করানো উত্তম, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়। যদি পিতামাতা আর্থিকভাবে অক্ষম হন এবং ছেলেরও অতিরিক্ত অর্থ না থাকে, তবে ছেলে নিজে উমরাহ করতে পারেন এবং স্ত্রীকে সঙ্গে নিতে পারেন। এতে পিতামাতার প্রতি অবিচার হয় না।
(খ) স্ত্রীকে নিয়ে উমরাহ করা পিতামাতাকে না নিয়ে যাওয়ার চেয়ে বেশি জরুরি নয়, তবে স্ত্রীর সাথে সময় কাটানো ও তার বৈবাহিক অধিকার রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিন (এখানে ১ বছর ৪ মাস) দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি, তখন স্বামীর জন্য স্ত্রীর সাথে অন্তরঙ্গতা ও মানসিক সান্নিধ্য প্রদান করা ফরজের কাছাকাছি একটি দায়িত্ব।
(গ) হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে এসেছে, স্বামীর জন্য স্ত্রীর সাথে সহবাস ও স্নেহ-প্রেমের সম্পর্ক বজায় রাখা ওয়াজিব (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫৮)। দীর্ঘদিন পর স্বামী দেশে এলে তাকে স্ত্রীর জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া উচিত এবং উমরাহকে অজুহাত বানিয়ে স্ত্রীকে অবহেলা করা অনুচিত।
২. বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয়
আপনার স্বামী যদি শুধু ৬-৭ দিনের জন্য দেশে আসেন এবং বলেন যে তিনি উমরাহ করতে যাবেন এবং আপনার সাথে বেশি সময় থাকতে পারবেন না, তাহলে এটি আপনার বৈবাহিক অধিকারের প্রতি অবিচার। আপনি চাচ্ছেন তার সান্নিধ্য, যা সম্পূর্ণ বৈধ ও প্রয়োজনীয়।
তাই আপনার কর্তব্য হলো ভদ্রভাবে ও শান্তভাবে স্বামীকে বোঝানো যে:
- দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আপনার তার সান্নিধ্যের খুব প্রয়োজন।
- উমরাহ একটি ইবাদত, কিন্তু স্ত্রীর সাথে সময় কাটানো এবং তার চাহিদা পূরণ করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও ফরজ দায়িত্ব।
- তিনি উমরাহর সময়ও আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন। তাহলে ইবাদতও হবে এবং আপনার চাহিদাও পূরণ হবে। আর যদি একা যেতে চান, তাহলে অন্তত উমরাহ শেষ করে বা আগে কিছু দিন সম্পূর্ণভাবে আপনার জন্য রাখুন।
৩. পিতামাতার বিষয়ে
আপনার শ্বশুর আর্থিকভাবে দুর্বল, তাই তারা উমরাহ করতে পারেন না। আপনার স্বামীর উচিত যদি সামর্থ্য থাকে তবে পিতামাতাকেও কোনো দিন উমরাহ করিয়ে দেওয়া। কিন্তু বর্তমান সফরে তাকে শুধু পিতামাতাকে না নেওয়ার কারণে কোনো পাপ হবে না। তবে তিনি যদি চান, আপনি এবং স্বামী মিলে শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা পরবর্তী সময়ের জন্য রাখতে পারেন।
৪. আপনার স্বামীকে কিভাবে বোঝাবেন?
আপনি নিম্নোক্ত যুক্তি দিয়ে বলতে পারেন:
- "আমরা দীর্ঘদিন একসাথে নেই। ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর মিলন ও প্রেমকে উৎসাহিত করে। আপনি যদি উমরাহ করেন, তাহলে আমাকেও নিয়ে চলুন। এতে আমাদের সম্পর্ক আরও মজবুত হবে এবং ইবাদতও হবে।"
- "আপনার সাথে ৬-৭ দিনের মধ্যে অন্তত ২-৩ দিন শুধু আমার জন্য রাখুন। বাকি দিন উমরাহ ও পরিবারের জন্য।"
- "আমার চাহিদা পূরণ না হলে বৈবাহিক জীবনে সমস্যা হতে পারে, যা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়।"
৫. হানাফি ফিকহের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) – স্ত্রীর সাথে সদ্ব্যবহার ও তার চাহিদা পূরণ ওয়াজিব।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া – স্বামী দীর্ঘদিন স্ত্রী থেকে দূরে থাকলে স্ত্রীর অধিকার নষ্ট হয়, সুতরাং স্বামীকে অবশ্যই তার জন্য সময় দিতে হবে।
- ফাতাওয়া উসমানী ও ইমদাদুল ফাতাওয়া – উমরাহের জন্য পিতামাতাকে সঙ্গে নেওয়া মুস্তাহাব, কিন্তু যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া জায়েজ এবং উত্তম।
সারসংক্ষেপ: আপনার স্বামীর উমরাহ করা জরুরি নয়, বরং আপনার সাথে সাক্ষাৎ ও চাহিদা পূরণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে তিনি যেন আপনাকেও নিয়ে উমরাহ করেন অথবা উমরাহর পর/আগে কিছু দিন শুধু আপনার জন্য রাখেন। পিতামাতাকে বাদ দেওয়ায় অবিচার হবে না, তবে তিনি ইচ্ছা করলে ভবিষ্যতে তাদেরও নিয়ে যেতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা আপনার সম্পর্ককে সুন্দর ও মজবুত করুন এবং আপনার স্বামীকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দিন।
(আমিন)