স্বামী স্ত্রীর একসাথে উমরাহ করা বিষয়ক
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
স্বামীর জন্য একা উমরাহ করা জায়েয আছে, তবে আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি যদি আর্থিকভাবে অসচ্ছল হন এবং তাদের উমরাহ করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া অধিক সওয়াবের কাজ। আপনার সাথে উমরাহ করা জরুরী নয়, বরং পিতামাতার সেবা ও তাদের ইবাদতে সহযোগিতা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই পরিস্থিতিতে স্বামীর উচিত:
- প্রথমে নিজের পিতামাতাকে (আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি) উমরাহ করতে সহায়তা করা, যদি সামর্থ্য থাকে।
- যদি সবাইকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না হয়, তবে পিতামাতাকে নিয়ে যাওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
- যদি পিতামাতা বর্তমানে যেতে অসমর্থ হন (যেমন অসুস্থতা বা অনিচ্ছা), তাহলে আপনাকে নিয়ে যেতে পারেন।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও দলিল:
১. পিতামাতার হক ও উমরাহর মর্যাদা:
হাদিসে পিতামাতার সেবা ও খেদমতকে জিহাদের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে।
- হাদিস: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, "আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি?" তিনি বললেন: "সময়ে সালাত আদায় করা।" তারপর বললেন: "পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা।" (সহীহ বুখারী, ৬২৭০)
- উমরাহর ফজিলত: উমরাহ গুনাহ মিটিয়ে দেয় এবং হাজ্জে মাবরুর-এর সমতুল্য সওয়াব দেয়। (সহীহ মুসলিম, ১৩৪৯)
তবে পিতামাতার ইবাদতে সহযোগিতা (যেমন তাদের উমরাহ করানো) তাদের জীবিত থাকা অবস্থায় তাদের হক আদায়ের একটি অংশ। তাই আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি যদি উমরাহ করতে আগ্রহী হন এবং আর্থিকভাবে অক্ষম হন, তাহলে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া অধিক সওয়াবের কাজ।
২. স্ত্রী বনাম পিতামাতা – কার অগ্রাধিকার?
ইসলামে পিতামাতার হক সন্তানের উপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন তারা বৃদ্ধ ও অসহায় হন।
- ফাতাওয়া শামী (রদ্দুল মুহতার): পিতামাতার প্রয়োজন পূরণ করা সন্তানের উপর ওয়াজিব (ফরজের কাছাকাছি), যেখানে স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক নফল ইবাদতের পর্যায়ভুক্ত।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফতোয়া: যদি পিতা-মাতা সন্তানের নিকট সাহায্য চান, তাহলে সন্তানের জন্য তাদের সাহায্য করা জরুরি, এমনকি যদি নিজের পরিবারের প্রয়োজনও থাকে। (কিতাবুল আছল, ৩/২১৬)
তাই আপনার স্বামীর জন্য সবচেয়ে রাস্তা হলো:
✔ যদি তার সামর্থ্য থাকে, তবে শ্বশুর-শাশুড়িকে সাথে নিয়ে আপনাকেও নিয়ে যাওয়া।
✔ যদি সামর্থ্য সীমিত হয়, তাহলে পিতামাতাকে নিয়ে যাওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কেননা তাদের বয়স বেশি, তারা হয়তো ভবিষ্যতে যেতে পারবেন না।
৩. আপনাকে একা নিয়ে যাওয়া – অবিচার হবে কি?
স্বামী যদি আপনাকে নিয়ে উমরাহ করেন এবং পিতামাতাকে বাদ দেন, তবে এটি গুনাহ নয়, তবে পিতামাতার হকের প্রতি অবহেলা হতে পারে যদি তারা আগ্রহী ও অসহায় হন।
- মা’রিফুল কুরআন (৮ম খণ্ড, সূরা বনী ইসরাঈল ২৩-২৪): পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার ও তাদের সেবা করা ফরজ। তাদের উমরাহ করানো সেবার একটি অংশ।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৩/৪৫২): পিতামাতার ইচ্ছা পূরণ করা, বিশেষত ইবাদতের ক্ষেত্রে, নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম।
৪. শশুর-শাশুড়ীকে রেখে যাওয়া – করণীয়:
আপনার শ্বশুর-শাশুড়ী যদি অসুস্থ বা সহায়তাহীন না হন, তাহলে তাদের রেখে যাওয়া জায়েয। তবে তাদের মনে কষ্ট হলে সেটা এড়িয়ে চলা ভালো।
- হাদিস: "যে ব্যক্তি পিতামাতাকে কষ্ট দেয়, সে আমার উম্মতের নয়।" (সহীহ ইবনে হিব্বান, ২/২২৮)
স্বামীর জন্য করণীয়:
- পিতামাতার অবস্থা বোঝা: তারা কি উমরাহ করতে আগ্রহী? তাদের শারীরিক ও আর্থিক অবস্থা কী?
- সাধ্যমতো চেষ্টা: যদি সবাইকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে পিতামাতাকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা।
- স্ত্রীর সাথে আলোচনা: আপনার স্বামীকে এই দলিলগুলো বোঝাতে বলুন এবং তাকে উৎসাহিত করুন আগে পিতামাতার হক আদায়ে।
- বিকল্প ব্যবস্থা: যদি পিতামাতা এখন যেতে না পারেন, তাহলে আপনি স্বামীর সাথে উমরাহ করতে পারেন এবং পরবর্তীতে তাদের ব্যবস্থা করবেন।
সারমর্ম:
উমরাহ নফল ইবাদত, পিতামাতার সেবা ফরজ বা ওয়াজিব। তাই পিতামাতার প্রয়োজন ও আগ্রহ থাকলে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া আপনার স্বামীর জন্য অধিক সওয়াবের কাজ।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন।