নাপাকী, পেশাবের ছিটা, বাচ্চাদের নাপাক কাপড়, ফরজ গোসল এবং প্রসাবজনিত পবিত্রতা নিয়ে জানতে চাই?
Taharah Purity · Hanafi
Question
১. পাখি (কাক )পায়খানা করেছে পাঞ্জাবিতে। পাক করার সময় কি এপিট ওপিট ধুতে হবে? পায়খানার ভেজা ওপর প্রান্তেও চলে গিয়েছে এবং পায়জামা পাঞ্জাবির সাথে লেগে ছিল বলে পয়জামাতেও হালকা দাগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে তবে সেটা একটা পয়সার সমান ও না। পায়জামাও কি ধুইতে হবে জাস্ট ওই জায়গা?
২. আরেকটা বিষয় অল্প অল্প নাপাকী কিন্তু একটা পয়সার ও কম কিন্তু কয়েক জায়গায় অল্প অল্প করে ভরেছে সব মিলিয়ে এক পয়সার সমান বা বড় হয়ে যাবে এটার বিধান কি?
৩. যে পরিমাণ নাপাকী কাপড়ে লাগল মাফ তবে অন্য কাপড় পরিধান করার ব্যবস্থা থাকলে সেটা পরে নামাজ পড়তে বলা হয়ে থাকে, সেই সামান্য নাপাকি লাগা কাপড়ও কি তিনবার ধুয়ে পাক করতে হবে? যে পরিমাণ মাফ সেটা নরমাল কাপড় যেমন একবার ধুয়েই শুকাতে দেই এভাবে ধৌত করলে হবে?? এই সামান্য নাপাক লাগা কাপড়ের সাথে অন্য ভালো কাপড় একসাথে ধোঁয়া যাবে?
৪. বাচ্চাদের প্যান্ট সাধারণত পাক করে ধোঁয়া হয়না কারন তাদের তো নামাজ নেই। পেশাবের কাপড় একবার ধুয়েই শুকাতে দেয়া হয়। পরবর্তীতে বাচ্চা যখন সেই প্যান্ট পড়বে এবং ভেজা হাতে নিলে প্যান্টের সাথে হাত লাগার কারণে কি হাত ধৌত করতে হবে? বাচ্চার মা ভেজা হাতে কোলে নিলো এবং এতে করে প্যান্ট ও তো সামান্য ভেজা অনুভব হয় এই অবস্থায় অন্য কেউ কোলে নিলে তার হাত শুকনা কিন্তু সেই প্যান্ট এর ভেজা যদি অনুভূত হয় তাহলে কি তাকেও হাত ধৌত করতে হবে? পুরো বিষয়টা হলো বাচ্চার নাপাক প্যান্ট জাস্ট একবার ধুয়ে শুকানোর পরের কথা।
৫. পেশাবের সামান্য ছিটা শুই পরিমাণ থেকে কিছুটা বেশি যেটা ৩ গ্রামের কম হলে তো মাফ কিন্তু যদি এই পরিমাণ সরাসরি গায়ে লাগে এবং শুকায় যায় পরবর্তীতে এর উপর দিয়ে তেল মালিশ করলে নাপাকী বিস্তৃতি হতে পারে?
৬. পাক কাপড় পরিধান করে ফরজ গোসল করলে সেই কাপড় কি নাপাক হবে যেহেতু ফরজ গোসলের সময় নাপাকী লেগে থাকে যেটা দুর করতে হয়। দুর করার সময় নাপাক পানি গড়ায় পরে যেটা পায়জামাতেও লাগে। তাহলে গোসলের পর জাস্ট সেই পায়জামা একবার ধুয়ে শুকাতে দিলে পাক হবে? মেয়েদের ফরজ গোসলের আদব কি হবে? সেই কাপড় এর পাক নাপাকের বিষয়টাও বললে ভালো হয়।
৭. এক ভাইয়ের পক্ষ থেকে প্রশ্ন। উনি জানতে চেয়েছেন উনার প্রসাব থেকে পাক হতে সময় লাগে। অনেকক্ষণ টিস্যু নিয়ে হাটাহাটি করলেও কিছুপর লক্ষ্য করলে হালকা প্রসাব লক্ষ করা যায় যেটা খুবই সামান্য। সবসময় এমন হয় বিষয়টা এমন না আবার মাঝে মাঝে নাকি তাতাতারিও হয়ে যায়। উনি লক্ষ্য করেছেন টিস্যু ধরে হাটাহাটি করলে বেশি সময় লাগে। জাস্ট প্রসাব করে চলে আসলে একটু পর এমনিতেই নাকি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। তো এভাবে উনি প্রসাব এর আগে পায়জামা পরিবর্তন করে নেন পরবর্তীতে পাক হয়ে চেঞ্জ করে আবার পাক পায়জামা পড়েন। উনি বুঝাতে চাইছেন এইযে কিছু সময় তিনি যে প্রসাব করেই চলে আসতেছেন এতে সামান্য হলেও প্রসাব ওই পায়জামায় লাগতেছে যদিও সেটা চেঞ্জ করে কিন্তু এইজে প্রসাব এর যে ভয়াবহ হাদীস আছে তিনিও সেই হাদীসের আওতায় আসবেন ওই সামান্য সময়ের জন্য? তিনি সেম কাজটা রাতেও এভাবে করেন রাতের জন্য আলাদা ড্রেস ঠিক করে রেখেছেন ফলে রাতে উনার যে কয়বার প্রসাব ত্যাগ আর প্রয়োজন পড়ে উনি জাস্ট ত্যাগ করে চলে আসেন। পরে ফজরের পূর্বে জাস্ট ধুয়ে ( তখন প্রসাব করেন না) পবিত্র হয়ে অন্য পায়জামা পরিধান করে নামাজ পড়েন। এইযে সারারাত প্রসবের ফোঁটা থেকে সে বাঁচলো না তিনি সেই হাদীসের আওতায় পড়বেন?
Answer
উত্তর দেওয়া হচ্ছে হানাফী মাযহাবের আলোকে।
প্রশ্ন ১: পাখির (কাক) পায়খানা পাঞ্জাবিতে লেগেছে, এবং পায়জামায়ও হালকা দাগ আছে। পাক করার নিয়ম কী?
- উত্তর: কাকের পায়খানা নাজাসাতে গালিজা (ভারী নাপাকী)। তবে যদি তা এক দিরহাম (প্রায় ৩.৩ গ্রাম বা এক পয়সা সমান) পরিমাণের কম হয়, তবে তা মা‘ফু (ক্ষমা করা)। শুধু সেই স্থান ধুয়ে ফেলাই যথেষ্ট। গোটা কাপড় ধোয়ার প্রয়োজন নেই।
- পায়জামায় যে দাগ লেগেছে, তা যদি আলাদা স্থানে হয় এবং এক পয়সা সমান না হয়, তবে শুধু সেই জায়গা ধুলেই হবে। তবে যদি নাপাকী পায়জামায় এমনভাবে লেগে থাকে যে, তা পাঞ্জাবি থেকে স্থানান্তরিত হয়ে পায়জামায় ভিজা অবস্থায় লেগেছে, তাহলে পায়জামার ঐ স্থানও ধুতে হবে।
- রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার: নাজাসাতে গালিজার পরিমাণ এক দিরহামের কম হলে মা‘ফু।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: কাপড়ে নাপাকী লেগে থাকলে শুধু ঐ জায়গা ধোয়া যথেষ্ট।
প্রশ্ন ২: একাধিক স্থানে অল্প অল্প নাপাকী লেগেছে, যা মিলিয়ে এক পয়সা সমান বা বেশি হয়। এটা কি মা‘ফু?
- উত্তর: হ্যাঁ, যদি প্রতিটি স্থানের নাপাকী আলাদাভাবে এক দিরহামের কম হয়, তাহলে সবগুলো জায়গা মিলিয়েও মা‘ফু হবে। কারণ নাপাকীর বিধান আলাদা আলাদা স্থানের জন্য স্বতন্ত্র। তবে যদি একই স্থানে একাধিকবার নাপাকী লেগে থাকে, তাহলে একত্রে গুনে এক দিরহামের বেশি হলে ধুতে হবে।
- রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী: বিভিন্ন স্থানের নাপাকী আলাদাভাবে মা‘ফু হলে একত্রে গণ্য করা হবে না।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: একাধিক জায়গায় নাপাকী থাকলে প্রতিটি স্বতন্ত্রভাবে বিবেচ্য।
প্রশ্ন ৩: মা‘ফু পরিমাণ নাপাকী লাগা কাপড় কি তিনবার ধুতে হবে? অন্যান্য কাপড়ের সাথে ধোয়া যাবে?
- উত্তর: মা‘ফু পরিমাণ নাপাকীর জন্য তিনবার ধোয়া জরুরি নয়। শুধু একবার ভালোভাবে ধুলেই পাক হবে। তবে ভারী নাপাকী (যেমন পেশাব, পায়খানা) তিনবার ধোয়া সুন্নাত।
- অন্যান্য কাপড়ের সাথে ধোয়া: যদি নাপাকী দৃশ্যমান অপসারিত হয়ে যায়, তবে একসাথে ধোয়া যাবে। তবে নাপাকী কাপড় থেকে পানি অন্য কাপড়ে না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।
- রেফারেন্স:
- বাহেশতী জেওর: নাজাসাতে গালিজা তিনবার ধোয়া উত্তম, কিন্তু মা‘ফু পরিমাণের জন্য একবারই যথেষ্ট।
প্রশ্ন ৪: বাচ্চার নাপাক প্যান্ট একবার ধোয়ার পর শুকানো হয়েছে। এখন কেউ ভেজা হাতে স্পর্শ করলে কি হাত ধুতে হবে?
- উত্তর: প্যান্ট শুকিয়ে গেলে তাতে নাপাকী বাহ্যিকভাবে থাকে না। কিন্তু ভিজা হাতে স্পর্শ করলে হাত নাপাক হবে। কারণ শুকনো নাপাকী ভিজা হাতে স্থানান্তরিত হয়।
- যদি মা ভেজা হাতে স্পর্শ করে, তবে তার হাত ধুতে হবে। যদি অন্য কেউ শুকনো হাতে স্পর্শ করে, তাহলে হাত নাপাক হবে না, তবে সংক্রমণ এড়াতে সাবধানতা ভালো।
- রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: শুকনো নাপাকী ভিজা হাতে লাগলে হাত নাপাক হয়।
প্রশ্ন ৫: পেশাবের ছিটা গায়ে লেগে শুকিয়ে গেছে। পরে তেল মালিশ করলে কি নাপাকী বিস্তৃত হবে?
- উত্তর: পেশাবের ছিটা যদি এক দিরহামের কম হয় এবং শুকিয়ে যায়, তবে তা মা‘ফু। এর উপর তেল মালিশ করলেও নাপাকী বিস্তৃত হবে না, কারণ শুকনো নাপাকী অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয় না (তেলের মাধ্যমেও নয়)। তবে যদি নাপাকী ভিজা অবস্থায় থাকে, তাহলে বিস্তৃত হবে।
- রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার: শুকনো নাপাকী অন্যের সাথে মিশলেও নাপাকী স্থানান্তরিত হয় না।
প্রশ্ন ৬: ফরজ গোসলের সময় পায়জামায় নাপাক পানি লেগেছে। গোসলের পর কি পায়জামা পাক হবে?
- উত্তর: ফরজ গোসলের সময় স্ত্রী-স্পর্শ বা বীর্যপাতজনিত নাপাকী দূর করতে হয়। এই পানি যদি পায়জামায় লাগে, তবে পায়জামা নাপাক হবে। গোসলের পর পায়জামা একবার ধুয়ে শুকালে পাক হবে। তিনবার ধোয়া জরুরি নয়।
- মেয়েদের জন্য: মেয়েরাও একই নিয়মে পায়জামা ধুতে পারেন। তবে গোসলের সময় এমন কাপড় পরা ভালো যা পরে ধৌত করা সহজ।
- রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী: নাপাক পানি লেগে গেলে কাপড় ধৌত করাই যথেষ্ট।
প্রশ্ন ৭: প্রসাবের পর পাক হতে সময় লাগে, অল্প ফোঁটা বের হয়। টিস্যু ব্যবহার না করে চলে আসলে কি গুনাহ হবে?
- উত্তর: হাদীসে প্রসাব থেকে পূর্ণ পবিত্রতা অর্জনের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে (সহীহ মুসলিম)। তবে যে ব্যক্তি স্বাভাবিক প্রসাবের পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে (যাতে ফোঁটা বন্ধ হয়) এবং পরে ভালোভাবে ধৌত করে, তার জন্য এই সাময়িক ফোঁটা মা‘ফু।
- যদি কেউ টিস্যু ব্যবহার না করে শুধু পায়জামা পরিবর্তন করে এবং পরবর্তীতে গোসল/ওযু করে ফেলে, তাহলে হাদীসের আওতায় আসবে না। তবে উত্তম হলো সম্পূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করা।
- উল্লেখ্য: রাতে যদি প্রসাবের ফোঁটা থেকে সতর্কতা হিসেবে আলাদা পায়জামা রাখেন, তবে এটি প্রশংসনীয়। ফজরের আগে ধুয়ে নামাজ পড়লে তা সহীহ।
- রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া শামী: প্রসাবের পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা সুন্নাত।
- মিশকাত: এক ফোঁটা প্রসাবের জন্যও শাস্তি দেওয়া হবে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পবিত্রতা না নেওয়া হয়। কিন্তু এখানে ব্যক্তি সতর্ক।
সারসংক্ষেপ:
- নাপাকীর পরিমাণ এক দিরহামের কম হলে মা‘ফু।
- একবার ধুলেই পাক হয়, তিনবার জরুরি নয়।
- শুকনো নাপাকী ভিজা হাতে স্পর্শ করলে হাত নাপাক হয়।
- প্রসাবের পর সম্পূর্ণ পবিত্রতা অর্জনের চেষ্টা করা উচিত, কিন্তু সাময়িক ফোঁটা মা‘ফু।
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।