স্বপ্নে গোনাহ করা থেকে বিরত থাকা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর (হানাফি ফিকহের আলোকে)
প্রশ্নে উল্লেখিত স্বপ্নে গুনাহ করার পরিস্থিতি ও তার অর্থ সম্পর্কে হানাফি ফিকহের আলোকে নিম্নোক্ত ব্যাখ্যা প্রদান করা হলো:
স্বপ্নে গুনাহের বিধান
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, স্বপ্নে কোনো গুনাহ (যেমন: জিনা, চুরি, মিথ্যা বলা) করা বা তা করতে উদ্যত হওয়া ব্যক্তির জন্য কোনো গুনাহ বা পাপ গণ্য হয় না। কারণ স্বপ্ন হলো ঘুমন্ত অবস্থায় মনোজগতে ঘটে যাওয়া ঘটনা, যেখানে মানুষের ইচ্ছা ও বিবেকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে না। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন:
"আমার উম্মতের (ঘুমন্ত ও বেখবর অবস্থায়) স্বপ্নে যা ঘটে, তা মাফ করা হয়েছে।"
(সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২০৪৩; সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২২০৯)
হানাফি ফিকহের প্রধান গ্রন্থ "রদ্দুল মুহতার" -এ উল্লেখ আছে যে, ঘুমের অবস্থায় মানুষের বিবেক ও সচেতনতা স্থগিত থাকে, তাই সেখানে সংঘটিত কাজের জন্য কোনো শরঈ দায়িত্ব (গুনাহ বা সওয়াব) নেই।
(রদ্দুল মুহতার, ১/১২৭, কিতাবুত তাহারাত)
স্বপ্নে গুনাহ থেকে বাঁচার অর্থ
স্বপ্নে গুনাহ করতে গিয়ে আল্লাহ তা‘আলা যদি আপনাকে তা থেকে রক্ষা করেন, অর্থাৎ আপনি গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়ার আগেই জেগে যান বা কোনোভাবে তা সম্পন্ন না করেন, তাহলে এর বাস্তব জীবনের জন্য কয়েকটি অর্থ হতে পারে:
-
ইমানের সুরক্ষা: এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ভালো ইঙ্গিত যে আপনার অন্তরে ইমানের জ্যোতি বিদ্যমান। স্বপ্নে গুনাহ করার প্রস্তুতি নিলেও শেষ পর্যন্ত না করা প্রমাণ করে যে, আপনার ফিতরাত (স্বভাব) এখনো পবিত্র রয়েছে।
(মারেফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফি, ৭:৫৪৯) -
দুনিয়ার বিপদ থেকে রক্ষা: স্বপ্নে গুনাহ থেকে বাঁচার ঘটনা বাস্তব জীবনে কোনো পাপ বা বিপদ থেকে আল্লাহর হেফাজতের লক্ষণ হতে পারে। যেমন: কেউ স্বপ্নে দেখে যে সে চুরি করতে যাচ্ছে কিন্তু বাঁচিয়ে দেওয়া হলো, বাস্তবেও সে অনৈতিক কোনো সম্পর্ক বা কাজ থেকে দূরে থাকতে পারবে।
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, আশরাফ আলী থানভী, ২:৩১৫) -
তওবার তাওফিক: এটি আপনার প্রতি আল্লাহর বিশেষ রহমত ও কৃপা যে তিনি আপনাকে স্বপ্নেই বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে গুনাহ করা আপনার জন্য ক্ষতিকর। ফলে বাস্তব জীবনে আপনি সেই গুনাহ থেকে দূরে থাকবেন।
(ফাতাওয়া উসমানী, মুফতি শফী উসমানী, ৪:১২৯)
স্বপ্নের শরয়ি গুরুত্ব
- স্বপ্নের মাধ্যমে কোনো বিধান গ্রহণ করা বা শরিয়তে সিদ্ধান্ত নেওয়া জায়েজ নয়।
- তবে ভালো স্বপ্ন (যেমন: রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দেখা, কোনো নেক আমলের ইঙ্গিত) দেখলে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ মনে করা এবং বাস্তবে আমল করা প্রশংসনীয়।
- মন্দ স্বপ্ন হলে তা শয়তানের পক্ষ থেকে হতে পারে। তাই এর কুমন্দনা না করে বাম দিকে থুথু ফেলে তিনবার "আউজুবিল্লাহ" পড়তে হবে।
(সুনান তিরমিযী, হাদিস: ২২৭৮)
হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত
- স্বপ্নে গুনাহ করলে বা করতে উদ্যত হলে গুনাহ নেই।
- স্বপ্নে গুনাহ থেকে বাঁচা হলে তা আল্লাহর রহমতের নিদর্শন এবং বাস্তব জীবনে গুনাহ থেকে হিফাজতের তাকওয়া (আল্লাহভীতি) বৃদ্ধির মাধ্যম।
- আপনার উচিত –
- স্বপ্নের ঘটনা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করা।
- আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করা যে তিনি আপনাকে বাস্তব গুনাহ থেকে রক্ষা করেছেন।
- স্বপ্নের শিক্ষা নিয়ে বাস্তবে পাপ থেকে দূরে থাকার নিয়ত করা।
উপসংহার: স্বপ্নে গুনাহ করতে গিয়ে বেঁচে যাওয়া ইঙ্গিত করে যে, আপনার অন্তরে নেকির প্রতি ঝোঁক ও পাপ থেকে বিরত থাকার ইচ্ছা আছে। আল্লাহ আপনাকে বাস্তব জীবনের সমস্ত অপকর্ম ও গুনাহ হতে হেফাজত করুন। (আমিন)
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থপঞ্জি
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন, ১/১২৭)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী, ২:৩১৫)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি শফী উসমানী, ৪:১২৯)
- সুনান ইবনে মাজাহ (হাদিস: ২০৪৩)
- সুনান আবু দাউদ (হাদিস: ২২০৯)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সত্য বুঝার ও আমল করার তাওফিক দান করুন।