ইবাদতে রিয়া হলে করণীয় কী?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: ইবাদতে রিয়া হওয়া প্রসঙ্গে
প্রস্তাবনা
রিয়া (লোক দেখানো) একটি মারাত্মক আধ্যাত্মিক রোগ, যা ইবাদতের সওয়াব ধ্বংস করে দেয়। কুরআন ও হাদিসে এর কঠোর নিন্দা এসেছে। কিন্তু শয়তানের ওয়াসওয়াসা বা মনে রিয়া আসা নিজেই গুনাহ নয়; বরং যখন তা ইচ্ছাকৃতভাবে কাজে পরিণত হয় বা অন্তর তা পছন্দ করে, তখনই ক্ষতি হয়। হানাফি ফিকহের কিতাবাদিতে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে।
১. ইবাদতে রিয়ার ভয় এবং স্বাদ কমে যাওয়া : করণীয়
আপনি যখন অনুভব করছেন যে আপনার ইবাদতে রিয়া মিশে যাচ্ছে এবং তার স্বাদ কমে যাচ্ছে, তখন নিচের পদক্ষেপগুলো নিন:
ক. জানুন: শুধু মনের মধ্যে রিয়া আসা (ওয়াসওয়াসা) গুনাহ নয়। ইমাম ইবনে আবেদিন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ (১/৪৬৫) এ উল্লেখ করেন, যতক্ষণ না অন্তর সেই রিয়ায় সন্তুষ্ট হয় এবং কাজে প্রকাশ পায়, ততক্ষণ তা ক্ষতিকর নয়। তাই অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন না হয়ে শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান।
খ. নিয়তের সংশোধন: প্রতিবার ইবাদত শুরুর আগে স্পষ্টভাবে নিয়ত করুন—‘আমি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই কাজ করছি।’ হাদিসে আছে, “নিয়তের উপরই আমলের ফল নির্ভর করে” (বুখারি, মুসলিম)। হানাফি ফিকহে ‘আল-হেদায়া’ (১/২২) তে নিয়তের গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে।
গ. গোপন ইবাদতের অভ্যাস: যেসব ইবাদত গোপনে করা সম্ভব (যেমন তাহাজ্জুদ, নফল রোজা, দান), সেগুলো গোপনে করুন। বাহিশতি জেওর (ভাগ ৫, রিয়া অধ্যায়) এ মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন, “গোপন ইবাদত রিয়া থেকে বাঁচার সর্বোত্তম উপায়।”
ঘ. দুআ করুন: নবী (সা.) শিখিয়েছেন: “আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন আন উশরিকা বিকা শাইয়ান ওয়া আনা আলামু...” (আমি জানা সত্ত্বেও তোমার সাথে কাউকে শরীক করা থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই)। এই দুআ নিয়মিত পড়ুন।
ঙ. ইবাদতে অধ্যবসায়ী থাকুন: স্বাদ কমে গেলেও ইবাদত ছাড়বেন না। ইমাম গাজ্জালী (রহ.) ‘ইহইয়া উলুমিদ্দীন’ এ বলেন, “কখনো কখনো আল্লাহ বান্দার ইখলাস পরীক্ষার জন্য ইবাদতের স্বাদ কেড়ে নেন। ধৈর্য ধরে করতেই থাকুন।”
চ. রিয়া প্রতিরোধে জ্ঞানার্জন: রিয়ার প্রকৃতি ও তার প্রতিকার জানতে হানাফি আলেমদের কিতাব পড়ুন। যেমন- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানি), ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) এতে রিয়া সংক্রান্ত বিস্তারিত ফাতাওয়া আছে।
২. দাওয়াত বা বুঝানোর সময় নিজের উদাহরণ দেওয়া
কাউকে দাওয়াত দেওয়ার সময় বা ইসলামি বিষয় বুঝানোর সময় নিজের উদাহরণ দেওয়া কি রিয়া হবে? এর উত্তর নির্ভর করে নিয়তের উপর।
-
যদি নিয়ত হয়: শুধুমাত্র অপরকে উৎসাহিত করা, বোঝানো, বা দাওয়াতের কৌশল হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করা—তা জায়েজ এবং সওয়াবের কাজ হতে পারে। ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৩২) তে এসেছে, “কাউকে ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত করতে নিজের ভালো কাজের কথা বলা, যদি অহংকার বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্য না থাকে, তবে তা রিয়া নয়।”
-
কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে অন্তরে যদি সামান্য পরিমাণেও লোকের প্রশংসা কামনা বা নিজের বড়ত্ব প্রকাশের ইচ্ছা থাকে, তাহলে তা রিয়া হয়ে যাবে। ইমাম ইবনে আবেদিন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ (২/১০২) এ বলেন, “যখন কাজটি শুধু লোক দেখানোর জন্য হয়, তখনই তা রিয়া। আর দাওয়াতের ক্ষেত্রে নিজের উদাহরণ দেওয়া এক প্রকার শিক্ষা, তাই সেটি রিয়া নয়, যদি ইখলাস থাকে।”
সতর্কতা:
- নিজের উদাহরণ দেওয়ার সময় ‘আমি করেছি’ না বলে ‘আমরা করেছি’ বা ‘অনেকে করেন’ বলে প্রকাশ করা ভালো।
- উদাহরণ দেওয়ার পর অন্তর যেন অহংকারে ভরে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন।
উপসংহার
ইবাদতে রিয়ার ভয় একটি ভালো লক্ষণ; কারণ মুনাফিকরা কখনো রিয়া নিয়ে ভাবে না। তাই ভয় পেয়ে ইবাদত না ছেড়ে বরং ইখলাস বাড়ানোর চেষ্টা করুন। নিয়মিত দুআ করুন, আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করুন। আর দাওয়াতের ক্ষেত্রে নিজের উদাহরণ দিলে তা সাওয়াবের কাজ হতে পারে, যদি নিয়ত খালিস থাকে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রিয়া থেকে হেফাজত করুন। (আমিন)
প্রাসঙ্গিক হানাফি কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন),
- বাহিশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী),
- ফাতাওয়া উসমানী (তাকী উসমানি),
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী),
- আল-হেদায়া (মারগিনানী)।