জাকাত ফান্ডের টাকা সাময়িক কর্জে হাসানাহ ফান্ডে ব্যবহার করা যাবে কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
জাকাতের টাকা দ্বারা কর্জে হাসানা (সুদবিহীন ঋণ) ফান্ড গঠন করা বা সেই ফান্ডে ব্যবহার করা জায়েয নয়। কারণ জাকাতের অর্থ নির্দিষ্ট আটটি খাতে ব্যয় করতে হবে এবং তা অবশ্যই তামলীক (মালিকানা হস্তান্তর) শর্তে প্রদান করতে হবে, যা কর্জের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় না। নিচে বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
জাকাতের অর্থের ব্যবহারের মূলনীতি
কুরআন করীমে জাকাতের খাত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে:
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ (সূরা তাওবা: ৬০)
অর্থ: "নিশ্চয়ই সাদাকা (জাকাত) হলো ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী, যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন, দাস-মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরজ। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।"
এ আয়াতে জাকাতের অর্থ ব্যয়ের আটটি খাত উল্লেখ আছে। কর্জে হাসানা (ঋণ) এই খাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই জাকাতের অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া বৈধ নয়।
হানাফি ফিকহের দলিল
১. তামলীক (মালিকানা হস্তান্তর) শর্ত: জাকাত আদায়ের জন্য জরুরি হলো তামলীক—অর্থাৎ জাকাতের মালিকানা পুরোপুরি মুস্তাহিককে হস্তান্তর করতে হবে। কর্জ বা ঋণের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তর হয় না; বরং তা প্রত্যর্পণযোগ্য (قرض يجب رده)। ফলে জাকাতের নিয়ত পূর্ণ হয় না।
- আল-হিদায়া ও শারহু মা‘আনি’ল আছার-এ উল্লেখ আছে, জাকাতের অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া জায়েয নয়, বরং তা হিবা (দান) বা তামলীক-এর মাধ্যমে দিতে হবে।
- রাদ্দুল মুহতার (৩/২৭০)-এ বলা হয়েছে: "لَا يَجُوزُ دَفْعُ الزَّكَاةِ عَلَى وَجْهِ الْقَرْضِ" অর্থাৎ জাকাত কর্জের মাধ্যমে দেওয়া জায়েয নয়।
২. বাকি টাকা পরবর্তীতে ব্যবহার: যদি জাকাত ফান্ডে কিছু টাকা অব্যবহৃত থেকে যায়, তাহলে তা যত দ্রুত সম্ভব সংশ্লিষ্ট মুস্তাহিকদের মাঝে বণ্টন করতে হবে। এই টাকা কর্জ ফান্ডে রাখা বা অন্য কোনো অ-জাকাত খাতে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।
সমসাময়িক হানাফি আলেমদের ফতোয়া
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর ফতোয়ায় স্পষ্টভাবে বলেছেন:
"জাকাতের অর্থ ঋণ (কর্জে হাসানা) হিসেবে দেওয়া জায়েয নয়। বরং তা ফকির-মিসকিনকে হিবা বা দান করতে হবে। তবে যদি ঋণের পর তা ক্ষমা করে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি তামলীক শর্ত পূরণ না হওয়ার কারণে এখনও সমস্যা থেকে যায়। তাই জাকাতের টাকা সরাসরি দান করাই উত্তম।"
(ফতোয়ায়ে উসমানি, জাকাত অধ্যায়)
ইমদাদুল ফতোয়া-তেও বলা হয়েছে, জাকাতের টাকা ঋণ দেওয়া হারাম, কারণ এতে জাকাত আদায় হয় না।
জাকাত ফান্ডে টাকা বেঁচে গেলে করণীয়
১. অবিলম্বে অভাবীদের তালিকা তৈরি করে টাকা বণ্টন করে দিন।
২. যদি বণ্টনে বিলম্ব হয়, তবে টাকা একটি পৃথক জাকাত অ্যাকাউন্টে জমা রাখুন, কিন্তু অন্য কোনো কাজে (ঋণ, বিনিয়োগ ইত্যাদি) ব্যবহার করবেন না।
৩. কোনো মুস্তাহিককে কর্জ দেওয়ার ইচ্ছা থাকলে তা নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে করুন, জাকাতের টাকা থেকে নয়।
উপসংহার
জাকাত ফান্ডের অব্যবহৃত টাকা কর্জে হাসানা ফান্ডে ব্যবহার করা জায়েয নয়। তা অবশ্যই নির্ধারিত আট খাতে তামলীকসহ বণ্টন করতে হবে। অন্যথায় জাকাত আদায় হবে না এবং গুনাহ হবে।