অ্যালকোহল যুক্ত প্রোডাক্ট সম্পর্কে

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 1460
Questioner: manna begum
Question Asked: 10 Jun 2026, 05:10 PM
Reviewed & Published: 10 Jun 2026, 05:13 PM
Views: 61
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ٱلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ ٱللَّٰهِ وَبَرَكَاتُهُ
নরমালি বডি লোশন বা অন্যান্য প্রোডাক্ট,সান্সস্কিন বা মেয়েদের কসমেটিক্স যেগুলো থাকে,প্রায় প্রোডাক্টে অন্যান্য উপাদানের নামের সাথে অ্যালকোহল যুক্ত থাকে,এই সবগুলো কি হারাম ধরা হবে নাকি অন্য উপাদানের সাথে যে অ্যালকোহল নাম যুক্ত থাকে সবগুলো হারাম নয় ?

এ বিষয় বিস্তারিত বুঝিয়ে বলবেন,

বুঝার সুবিধার্থে নিচে একটি ছবি যুক্ত করেছি,বিভিন্ন নামযুক্ত অ্যালকোহল থাকে,এগুলা কি ব্যবহার করা যাবে ?

Answer

وعلیکم السلام ورحمة اللہ وبرکاتہ

بسم اللہ الرحمن الرحیم

প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর:
প্রসাধনী ও বডি লোশন প্রভৃতিতে ব্যবহৃত অ্যালকোহলের বিধান নির্ভর করে তার উৎস ও প্রভাবের উপর। শুধুমাত্র "অ্যালকোহল" নাম থাকলেই তা হারাম নয়; বরং যে অ্যালকোহল নেশা সৃষ্টি করে এবং তা অন্যের সাথে মিশ্রিত না করে পৃথক অবস্থায় থাকলে তা নাপাক ও হারাম। কিন্তু অধিকাংশ প্রসাধনীতে ব্যবহৃত অ্যালকোহল (যেমন: Cetyl Alcohol, Stearyl Alcohol, Cetearyl Alcohol ইত্যাদি) ফ্যাটি অ্যালকোহল, যা নেশা সৃষ্টি করে না এবং তা পাক ও ব্যবহার করা জায়েজ। পক্ষান্তরে Ethanol বা Ethyl Alcohol যদি নেশাকর পরিমাণে থাকে এবং তা খাঁটি অবস্থায় স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়, তবে তা ব্যবহার করা জায়েজ নয়। তবে অত্যল্প পরিমাণে যদি এমনভাবে মিশ্রিত থাকে যে তার স্বাদ, গন্ধ ও রং পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং নেশা সৃষ্টির সম্ভাবনা না থাকে, তবে সেটি ব্যবহার করা নাজায়েয হবে না—এই বিষয়ে হানাফি ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

মোটকথা, আঙ্গুর বা খেজুর থেকে যে এলকোহল তৈরী হয়, তা কমবেশ সবই হারাম। তবে এছাড়া অন্য কিছু দ্বারা তৈরী হলে, নেশা আসলে হারাম নতুবা হারাম হবে না।

বিস্তারিত আলোচনা:

ইসলামী শরিয়তে অ্যালকোহলের বিধান নির্ভর করে তার নেশা সৃষ্টির ক্ষমতার উপর। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
(سورة المائدة: 90)

"হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ধারক তীরগুলি শয়তানের কাজের মধ্যে নোংরা বস্তু। সুতরাং তোমরা এগুলি থেকে বিরত থাক, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।"

হাদীসে এসেছে:

كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ، وَكُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ
(صحيح مسلم: 2003)

"প্রত্যেক নেশাকর বস্তুই মদ, এবং প্রত্যেক নেশাকর বস্তুই হারাম।"

হানাফি ফিকহে বিস্তারিত নিয়ম:
হানাফি মাযহাবে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতানুসারে, নেশা সৃষ্টিকারী তরল পানি জাতীয় বস্তুর অল্প বা বেশি পরিমাণ—সবটুকুই নাপাক ও হারাম। কিন্তু অন্যান্য ইমামগণের (যেমন: ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ) মতে, নেশা সৃষ্টিকারী বস্তু যদি এমন পরিমাণে অল্প হয় যে তাতে নেশা হয় না, তবে তা ব্যবহার করা জায়েজ। তবে উভয় মতের সমন্বয়ে ফতোয়া দেওয়া হয় যে, যদি কোনো বস্তুতে নেশাকর অ্যালকোহল অল্প পরিমাণে মিশ্রিত থাকে এবং সেই মিশ্রণে অ্যালকোহলের স্বাদ, গন্ধ ও রং বিদ্যমান থাকে, তবে তা নাপাক ও ব্যবহার করা জায়েজ নয়। কিন্তু যদি অ্যালকোহল এতটাই অল্প থাকে যে তার কোনো প্রভাবই অবশিষ্ট নেই, তখন তা পাক ও ব্যবহারযোগ্য বলে গণ্য হবে। (রদ্দুল মুহতার, ১ম খণ্ড, ৪৩৪-৪৩৬; ফাতাওয়া আলমগিরী, ৫ম খণ্ড, ৩৫২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪র্থ খণ্ড, ১৪৪)

প্রসাধনীতে ব্যবহৃত অ্যালকোহলের প্রকারভেদ:
প্রসাধনী ও স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টে সাধারনত দুই ধরনের অ্যালকোহল ব্যবহৃত হয়:

  1. ফ্যাটি অ্যালকোহল (Fatty Alcohol): এগুলো সাধারণত তেল বা চর্বি থেকে তৈরি। যেমন: Cetyl Alcohol, Stearyl Alcohol, Cetearyl Alcohol, Lanolin Alcohol ইত্যাদি। এগুলো নেশা সৃষ্টি করে না, বরং প্রসাধনীতে ময়েশ্চারাইজার ও ইমালসিফায়ার হিসেবে কাজ করে। এগুলো পবিত্র এবং ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ। (মা'আরিফুল কুরআন, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩০৫; ফাতাওয়া উসমানী, ২য় খণ্ড, ৪৪২)

  2. সাধারণ অ্যালকোহল (Ethanol / Ethyl Alcohol): এটি মূলত নেশাকর অ্যালকোহল। কিন্তু প্রসাধনীতে এটি সাধারণত অত্যন্ত অল্প পরিমাণে (যেমন: ১-৫%) ব্যবহৃত হয় এবং অন্যান্য উপাদানের সাথে মিশ্রিত অবস্থায় থাকে। এমতাবস্থায় হানাফি ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, যদি এটি এতই অল্প হয় যে পৃথকভাবে এর কোনো প্রভাব (স্বাদ, গন্ধ, রং) অবশিষ্ট নেই, তবে তা ব্যবহার করা জায়েজ। কিন্তু যদি স্পষ্টভাবে এর গন্ধ বিদ্যমান থাকে, তাহলে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে তা ব্যবহার জায়েজ নয়। তবে অধিকাংশ আধুনিক ফুকাহা (যেমন: মুফতি মুহাম্মদ শফি সাহেব, মুফতি তাকি উসমানি সাহেব) এই মত দিয়েছেন যে, প্রসাধনীতে যে পরিমাণ অ্যালকোহল ব্যবহৃত হয় তা নেশা সৃষ্টি করে না এবং অন্যান্য উপাদানের সাথে মিশে গিয়ে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে, তাই তা ব্যবহার জায়েজ—এই ভিত্তিতে অনেক প্রতিষ্ঠান এ ধরনের প্রোডাক্টকে হালাল সনদ প্রদান করে। (ফাতাওয়া উসমানী, ২য় খণ্ড, ৪৪০-৪৪৫; কিতাবুল ফাতাওয়া, ৪র্থ খণ্ড, ১৪৫)

সতর্কতা:
তবে যেহেতু বিষয়টি নাজাসাত ও হারামের সাথে জড়িত, তাই যদি কোনো প্রোডাক্টে Ethanol বা Alcohol Denat. স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে এবং তা থেকে অ্যালকোহলের গন্ধ পাওয়া যায়, তবে তা এড়িয়ে চলা উত্তম। বিশেষ করে যেসব প্রোডাক্টে অ্যালকোহলের পরিমাণ বেশি এবং তা টপিক্যালি ব্যবহার করলেও ত্বকের মাধ্যমে শোষিত হতে পারে, সেসব ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

সংক্ষিপ্ত নিয়ম:

  • Cetyl Alcohol, Stearyl Alcohol, Cetearyl Alcohol, Lanolin Alcohol ইত্যাদি ফ্যাটি অ্যালকোহল—হারাম নয়, জায়েজ।
  • Ethanol / Ethyl Alcohol / Alcohol Denat. যদি নেশার মাত্রায় বিদ্যমান হয় (যেমন: পারফিউম, স্প্রে, টিংচার) —হারাম ও নাপাক। কিন্তু যদি অত্যল্প পরিমাণে অন্যান্য উপাদানের সাথে মিশ্রিত অবস্থায় থাকে এবং এর কোনো প্রভাব অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে তা জায়েজ—তবে এ বিষয়ে সতর্কতা ও আলেমদের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।

আপনার সংযুক্ত করা ছবিতে বিভিন্ন নামের অ্যালকোহলের মধ্যে অধিকাংশই ফ্যাটি অ্যালকোহল (যেমন: Cetyl Alcohol, Stearyl Alcohol, Cetearyl Alcohol) —এগুলো ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ ইনশাআল্লাহ।

واللہ اعلم بالصواب
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.