ইসলামিক বিয়ে নিয়ে বিভিন্ন জিজ্ঞাসা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
প্রশ্ন ১ঃ সেই ওড়নায় যদি সামান্য পুতি,সুতা আর ঝালরের কাজ থাকে তবে সেই ওড়না পড়া কি খাস পর্দার ক্ষেত্রে অনুচিত হবে?
প্রশ্ন ২ঃবিয়ের দিন কনে হালকা ডিজাইনের বোরখা হিজাব পড়লে খাস পর্দা কি হবে?
প্রশ্ন ৩ঃ চাচাতো /মামাতো ভাই যাদের এখন ১২/১৩ বছর চলছে কিন্তু কথাবার্তা বা আচরন ,গলার স্বর, ব্যাহিক চেহারায় (গোঁফ,দাড়ি ) বালেগ হওয়ার লক্ষণ এখনও আসে নি।তাদের সামনে কি পুরা বড় হিজাব পড়ে শরীর ,হাত পা ভালভাবে ঢেকে শুধু মুখ খোলা রাখা জায়েজ?
প্রশ্ন ৪ঃ বিয়ের জন্য বাড়িতে হালকা আলোকসজ্জা বা বরের বসার জায়গা ফুল দিয়ে সাজানো বা গেট সাজানো এগুলো কি জায়েজ নাকি অপচয়?
প্রশ্ন ৫ঃ বিয়ে পরানোর পরে দেখা যায় বর কনে কে একসাথে বসায়ে আয়নায় তাদেরকে দেখতে বলা হয়। জিজ্ঞাসা করা হয় কি দেখছ বা কেমন লাগছে বউ কে এমন টাইপ প্রশ্ন। এভাবে আয়না দেখানো কি ইসলামিক বিয়ের ক্ষেত্রে জায়েজ?
Answer
প্রশ্ন ১: ওড়নায় পুতি, সুতা ও ঝালরের কাজ থাকলে খাস পর্দার ক্ষেত্রে তা অনুচিত হবে কি?
জবাব:
খাস পর্দার উদ্দেশ্য হলো নন-মাহরামের দৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণরূপে আড়াল করা এবং কোনো প্রকার জিনিস যাতে পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে। যদি ওড়নায় সামান্য পুতি, সুতা ও ঝালরের কাজ থাকে যা সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তাহলে তা খাস পর্দার আদর্শের পরিপন্থী হবে। তবে যদি কাজটি এতই সামান্য হয় যে তা দৃষ্টি আকর্ষণ করে না বা সাজসজ্জা হিসেবে গণ্য হয় না, তাহলে তা ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু পর্দার মূল লক্ষ্য হলো অযথা সৌন্দর্য প্রদর্শন না করা। তাই উত্তম হলো কোনো প্রকার কাজ ছাড়া সাধারণ কালো ওড়না ব্যবহার করা।
দলিল:
- ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: "মহিলার জন্য বোরকার উপর এমন কিছু থাকা উচিত যা দৃষ্টি আকর্ষণ করে না, কারণ পর্দার উদ্দেশ্য হলো আকর্ষণ থেকে বেঁচে থাকা।" (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪০৬)
- বেহেশতী জেওরে উল্লেখ আছে: "পর্দার অর্থ হলো নিজেকে এমনভাবে ঢেকে রাখা যাতে কোনো অঙ্গ বা সাজসজ্জা প্রকাশ না পায়।"
সিদ্ধান্ত:
সামান্য পুতি/সুতা/ঝালরের কাজ থাকলে তা যদি সাজসজ্জার মধ্যে গণ্য হয়, তবে সেই ওড়না খাস পর্দার জন্য অনুচিত। উত্তম হলো কোনো প্রকার কাজ ছাড়া সরল ওড়না ব্যবহার করা।
প্রশ্ন ২: বিয়ের দিন কনে হালকা ডিজাইনের বোরকা/হিজাব পড়লে খাস পর্দা হবে কি?
জবাব:
খাস পর্দার মানে হলো বোরকা বা পোশাক এমনভাবে নকশা ও সাজসজ্জা থেকে মুক্ত হবে যা দৃষ্টি আকর্ষণ করে। "খাস পর্দা" মূলত বোরকা ও হিজাবের নিচে স্বাভাবিক রূপ লুকানোর নীতি। যদি পর্দার পোশাকটি হালকা ডিজাইনযুক্ত হয় এবং তা নন-মাহরামদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তবে তা খাস পর্দার উদ্দেশ্য পূরণ করে না। বিয়ে উপলক্ষে অল্প সাজসজ্জা স্বামীর জন্য জায়েজ, কিন্তু নন-মাহরামদের সামনে তা প্রদর্শন করা নাজায়েজ।
দলিল:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় বলা হয়েছে: "মহিলার জন্য বোরকা বা হিজাব এমন হওয়া উচিত যাতে দৃষ্টি আকর্ষণ না হয়।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩২৯)
- ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন: "মহিলার পর্দা এমন হবে যা তার দেহের গঠন ও সাজসজ্জা লুকিয়ে রাখে।" (আল-মাবসূত, সারাখসী)
সিদ্ধান্ত:
হালকা ডিজাইনযুক্ত বোরকা/হিজাব নন-মাহরামদের সামনে পরলে তা খাস পর্দা হিসেবে গণ্য হবে না, কারণ এটি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিয়ের দিনেও নন-মাহরামদের (যেমন বরের বন্ধু, আত্মীয়) সামনে এই পোশাক পরিহার করা উচিত।
প্রশ্ন ৩: ১২/১৩ বছর বয়সী চাচাতো/মামাতো ভাইদের সামনে শুধু মুখ খোলা রেখে পুরো শরীর ঢেকে রাখা জায়েজ?
জবাব:
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ না হওয়া) নন-মাহরাম বালকের সামনে মহিলার জন্য এমন পর্দা করা জরুরি নয় যা বালেগ পুরুষের জন্য আবশ্যক। কিন্তু সতর্কতামূলক পর্দা করা উত্তম। যদি বালকদের চেহারে বা আচরণে বালেগ হওয়ার কোনো লক্ষণ না থাকে, যেমন গোঁফ, দাড়ি, গলার ভারী সুর ইত্যাদি, এবং তারা যুবকদের মতো কোনো কুপ্রবৃত্তি পোষণ করে না, তাহলে মহিলার জন্য তাদের সামনে মুখ, হাত-পা খোলা রাখা জায়েজ। তবে শরীরের অন্যান্য অংশ (যেমন কান, গলা, বাহু, পা) ঢেকে রাখা জরুরি।
দলিল:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) এ উল্লেখ আছে: "অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক যে কামভাব বুঝে না, তার সামনে মহিলার জন্য মুখ ও হাত-পা খোলা রাখা জায়েজ।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩০২) তে বলা হয়েছে: "যে বালক পৌঢ়ত্বে উপনীত হয়নি এবং তার মধ্যে কোনো কামভাব সৃষ্টি হয়নি, তার সামনে পর্দা করা ফরজ নয়; তবে সতর্কতামূলক পর্দা উত্তম।"
সিদ্ধান্ত:
যেহেতু প্রশ্নে উল্লিখিত বালকদের বয়স ১২/১৩ বছর কিন্তু দাড়ি-গোঁফ, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন ইত্যাদি লক্ষণ নেই, তাই তাদের সামনে পুরো শরীর ঢেকে শুধু মুখ খোলা রাখা জায়েজ। তবে সতর্কতা ও সংযম বজায় রাখা উত্তম।
প্রশ্ন ৪: বিয়ের জন্য আলোকসজ্জা, ফুলের গেট ও গেট সাজানো জায়েজ নাকি অপচয়?
জবাব:
বিয়ে একটি আমোদ-প্রমোদের অনুষ্ঠান, তবে ইসলামে অপচয় ও বিলাসিতা নিষিদ্ধ। বিয়েতে সামান্য সাজসজ্জা যা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে না এবং যা অপচয় হিসেবে না গণ্য হয়, তা জায়েজ। কিন্তু অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা, যেমন দামি আলোকসজ্জা বা অযথা ফুলের গেট তৈরি করা অপচয় (ইসরাফ) বলে গণ্য। নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত:
- যদি সাজসজ্জা বিয়ের আনন্দ বাড়াতে সাহায্য করে এবং তা মধ্যপন্থায় করা হয়, তাহলে জায়েজ।
- কিন্তু যদি তা অপচয়, অহংকার, বা প্রতিযোগিতার জন্য করা হয়, তাহলে জায়েজ নয়।
দলিল:
- কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: "নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।" (সূরা বানী ইসরাইল, ২৭)
- ফাতাওয়া উসমানীতে (খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫২৭) বলা হয়েছে: "বিয়েতে অযথা অর্থ অপচয় করা এবং সাজসজ্জায় বাড়াবাড়ি করা নাজায়েজ। তবে সাধারণ ও মাঝারি আকারের সাজসজ্জা জায়েজ।"
সিদ্ধান্ত:
ফুল দিয়ে গেট সাজানো, হালকা আলোকসজ্জা ইত্যাদি যদি অপচয়ের পর্যায়ে না যায় এবং বিয়ের সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টির জন্য হয়, তাহলে জায়েজ। কিন্তু অতিরিক্ত অর্থ ও সম্পদ নষ্ট করা অপচয়। নিজের আর্থিক সীমার মধ্যে সাদামাটা সাজসজ্জা উত্তম।
প্রশ্ন ৫: বিয়ে পরানোর পরে বর-কনেকে আয়নায় দেখানো এবং ‘কেমন লাগছে’ ইত্যাদি প্রশ্ন করা জায়েজ?
জবাব:
বিয়ে পরানোর পর বর-কনেকে একত্র বসিয়ে আয়না দেখানো বা তাদের চেহারা নিয়ে মন্তব্য করা ইসলামি বিয়ের প্রচলিত নিয়ম নয়। এটি একটি আঞ্চলিক রীতি। কারণ
- সাধারণত এ সময় নারী-পুরুষ একত্র হয় এবং পরনারী/পরপুরুষ দেখার বিষয় থাকে। তাই তখন এটা নিষিদ্ধ।
দলিল:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় (খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৭২) বলা হয়েছে: "নবদম্পতিকে আয়না দেখানো বা তাদের চেহারা সম্পর্কে প্রশ্ন করা একটি অনিষ্টকর প্রথা; যা বর্জন করা উচিত।"
- বেহেশতী জেওরে (আশরাফ আলী থানভী) বিয়ের পর এমন রসম থেকে বেঁচে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সারসংক্ষেপ:
- পর্দার পোশাক ও ওড়না যত সহজ ও আকর্ষণমুক্ত হবে, ততই উত্তম।
- অপ্রাপ্তবয়স্ক নন-মাহরাম ছেলেদের সামনে মুখ খোলা জায়েজ, তবে শরীর ঢাকা জরুরি।
- বিয়েতে মধ্যপন্থী সাজসজ্জা জায়েজ, কিন্তু অপচয় নয়।
উত্তর প্রদানে সহায়ক হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহ
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী)
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। (আমীন)