Sura baqara ayah 232 ব্যাখ্যা
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
Sura Al-Baqarah, Ayah 232
এখানে তো আল্লাহ হিলালা বিয়ের কথা বলেননি। বলেছেন তালাকের পর ইদ্দত পালনের পর স্বামী-স্ত্রী চাইলেই আবার পুনরায় বিয়ে করতে পারবেন। তাহলে কেন আমাদেরকে সমাজে হিলালা বিয়ে করতে বলা হয়?
Answer
প্রশ্নের উত্তর: সূরা বাকারা ২:১৩২ আয়াত ও হিলালা বিয়ের সম্পর্ক
আলহামদুলিল্লাহ। প্রশ্নকারী বোন ফাতেমা হোসেন মুনা সাহেবার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সূরা বাকারার ২:২৩২ আয়াত উল্লেখ করে বলেছেন: “এখানে তো আল্লাহ হিলালা বিয়ের কথা বলেননি। বলেছেন তালাকের পর ইদ্দত পালনের পর স্বামী-স্ত্রী চাইলেই আবার পুনরায় বিয়ে করতে পারবেন। তাহলে কেন আমাদেরকে সমাজে হিলালা বিয়ে করতে বলা হয়?” এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমাদেরকে কুরআনের দুটি আয়াত ও সহীহ হাদীসের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে।
১. সূরা বাকারা ২:২৩২ আয়াতের ব্যাখ্যা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا تَعْضُلُوهُنَّ أَنْ يَنْكِحْنَ أَزْوَاجَهُنَّ إِذَا تَرَاضَوْا بَيْنَهُمْ بِالْمَعْرُوفِ “আর যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দাও এবং তারপর তারাও নির্ধারিত ইদ্দত পূর্ণ করতে থাকে, তখন তাদেরকে পূর্ব স্বামীদের সাথে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নিয়মানুযায়ী বিয়ে করতে বাধাদান করো না।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৩২)
এই আয়াতটি প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক (যা ফিরিয়ে নেওয়ার অবকাশ থাকে) অথবা এমন তালাকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যা তৃতীয় তালাকে পৌঁছেনি। অর্থাৎ, এক বা দুই তালাকের পর যদি একজন স্ত্রী ইদ্দত শেষ করে, তাহলে তার অভিভাবক তাকে পূর্ব স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিয়ে করতে বাধা দিতে পারবে না। এই পুনর্বিয়ে বৈধ ও জায়েয, কারণ এক বা দুই তালাকের পর পুনরায় বিয়ে করার অনুমতি কুরআনেই রয়েছে (সূরা আল-বাকারা, ২:২২৮)।
২. তৃতীয় তালাকের বিধান: সূরা বাকারা ২:২৩০
এখন প্রশ্ন হলো, তিন তালাকের পর কী হয়? আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন:
فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ “অতঃপর যদি সে (তৃতীয়) তালাক দেয়, তবে তারপর সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৩০)
এই আয়াত অনুসারে, তিন তালাকের পর প্রথম স্বামীর জন্য স্ত্রী সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায়। তাকে পুনরায় বিয়ে করার জন্য অবশ্যই স্ত্রীকে অন্য একজনের সঙ্গে সঠিকভাবে বিয়ে করতে হবে, সেই বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে (সহবাসসহ), এবং তারপর সেই দ্বিতীয় স্বামী তাকে তালাক দিলে বা মৃত্যুবরণ করলেই কেবল সে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হবে। একে ‘তাহলীল’ বা ‘হিলালা’ বিয়ে বলা হয়।
৩. হিলালা বিয়ে কেন প্রয়োজন?
সুতরাং, সমাজে তিন তালাকের পর হিলালা বিয়ে করার প্রয়োজনীয়তা কুরআনের ২:২৩০ আয়াতের সরাসরি নির্দেশ। প্রশ্নে উল্লেখিত ২:২৩২ আয়াতটি এক বা দুই তালাকের ক্ষেত্রে, আর ২:২৩০ আয়াতটি তিন তালাকের ক্ষেত্রে। তাই উভয় আয়াতের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।
৪. হিলালা বিয়ের শর্ত ও সতর্কতা
হিলালা বিয়ে শুধুমাত্র তখনই বৈধ হবে যখন তা নিয়মতান্ত্রিক, সৎ উদ্দেশ্যে এবং প্রকৃত বিবাহের মতো সম্পন্ন হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্পষ্টভাবে প্রতারণামূলক হিলালা (যেখানে পূর্বপরিকল্পনা থাকে যে দ্বিতীয় স্বামী তালাক দেবে) নিষেধ করেছেন এবং এর অভিশাপ দিয়েছেন:
لَعَنَ اللَّهُ الْمُحَلِّلَ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ “আল্লাহ লা’নত করেছেন তাহলীলকারী ও তাহলীল গ্রহণকারীকে।” (সুনান আত-তিরমিযী, হাদীস ১১২; ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৯৩৫; শাইখ আলবানী ‘সহীহ’ বলেছেন)
অর্থাৎ, যদি কোনো পুরুষ স্ত্রীকে তিন তালাক দেওয়ার পর তাকে হালাল করার জন্য ঠিক করে (ভাড়া বা চুক্তি করে) একজন পুরুষকে বিয়ে দেওয়া হয়, এবং সেই পুরুষ শুধু তালাক দেওয়ার জন্য বিয়ে করে, তাহলে এটি হারাম ও অভিশপ্ত। বরং দ্বিতীয় স্বামী সৎ উদ্দেশ্যে বিয়ে করবে, সহবাস করবে, এবং যদি তার ইচ্ছা হয় সে বিয়ে টিকিয়ে রাখবে, যদি না ইচ্ছা হয় তবে তালাক দিতে পারে। তবেই তা বৈধ হবে।
৫. সালাফী উলামাদের মতামত
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) এবং ইবনুল কাইয়িম (রহ.) উভয়ই এই বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, হিলালা বিয়ে কেবল তখনই বৈধ যখন তা প্রকৃত বিয়ে হয়, কোনো প্রকার পূর্বশর্ত বা প্রতারণা ছাড়া। ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন:
“তাহলীলের মূলনীতি হলো: কোনো পুরুষ যদি তিন তালাকের পর কোনো নারীকে বিয়ে করে, তাহলে তাকে সেই নারীর সঙ্গে এমনভাবে মিলিত হতে হবে যা স্বাভাবিক স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঘটে, এবং তালাক দেওয়ার জন্য তার কোনো প্রকার পূর্ব চুক্তি থাকবে না।” (যাদুল মা‘আদ, ৫/২৫৬)
শাইখ ইবন বায (রহ.) ও শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.)-এর ফতোয়াও একই। তারা বলেছেন: “প্রতারণার মাধ্যমে তাহলীল করা হারাম; এটি নবীর (ﷺ)-এর লা’নতপ্রাপ্ত কাজ। আর এটি শুধুমাত্র সেই ক্ষেত্রেই বৈধ যখন দ্বিতীয় স্বামী নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিয়ে করে এবং সহবাস করে, তারপর স্বাভাবিকভাবে তালাক বা মৃত্যু হয়।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবন বায, ২০/২৮৫; শারহুল মুমতি‘, ১২/৩২৫)
৬. সারসংক্ষেপ ও উত্তর
প্রশ্নগুলা: “সূরা ২:২৩২-এ হিলালার কথা নেই, কিন্তু সমাজে কেন হিলালা বিয়ে করতে বলা হয়?” উত্তর: সূরা ২:২৩২ তা প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক পরবর্তী পুনর্বিয়ের অনুমতি দেয়। কিন্তু তিন তালাক হওয়ার পর সে স্ত্রী প্রথম স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায়, যা সূরা ২:৩৩০-এ স্পষ্ট। তাই তিন তালাকের পর পুনরায় হালাল হওয়ার জন্যই হিলালা বিয়ে প্রয়োজন। এটি আল্লাহরই নির্ধারিত বিধান। কিন্তু সমাজে যে ‘হিলালা’ প্রচলিত সেটি প্রায়শই প্রতারণামূলক, যা নবীর (ﷺ) লা’নতপ্রাপ্ত। তাই প্রকৃত ইলম ও তাকওয়ার সাথে এই বিধান পালন করতে হবে।
উপদেশ
- তিন তালাক দেওয়া অত্যন্ত জঘন্য কাজ। নবী (ﷺ) বলেছেন: “তিন তালাক একসাথে দেওয়া আমার উম্মতের মধ্যে একটি মজাক (ঠাট্টা) হিসাবে পরিণত হয়েছে।” (মুসনাদ আহমাদ, হাদীস ২৩৭৮; শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন) তাই মুসলমানদের উচিত তালাকের ব্যাপারে সতর্ক থাকা।
- যদি কখনো তিন তালাক হয়ে যায়, তাহলে স্ত্রীকে হালাল করার জন্য প্রকৃত ও নিয়মতান্ত্রিক বিয়ের পথই একমাত্র। প্রতারণা বা চুক্তিবদ্ধ হিলালা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক জ্ঞান ও আমল দান করুন।