ফেসবুক স্ক্রলিং বা গোনাহ থেকে বাঁচতে দানের নিয়ত
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার এই গুনাহ টা হয়ে গেলে আমি ১০০ রাকাত নামাজ পড়বো, অর্থাৎ এমন শর্ত জুড়ে দেওয়া যা ওই মানুষটার জন্য কষ্টকর, ফলে সে ওই গুনাহ থেকে এক মাস হলেও বেঁচে থাকবে,,এমনটা করা কি তার জন্য জায়েজ? অথবা ফেসবুক স্ক্রলিং থেকে বাঁচতে, যদি ফেসবুকে আগামী এক ঘন্টার মধ্যে ঢুকা হয় তাহলে ১০০ টাকা দান করবো ইত্যাদি শর্তাদি জুড়ে দেওয়া।
আর যদি এর মধ্যে গুনাহ না হয় তাহলে কি তাকে সেই ১০০ রাকাত নামাজ আদায় করতে হবে? যেমনটা মানতের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে,মানতের ইচ্ছা পূরন না হলেও মানত পূরন করতে হয়।।
Answer
উত্তর বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আপনার বর্ণিত পদ্ধতিতে গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য শর্তযুক্ত প্রতিজ্ঞা করা (যেমন- "যদি আমি গুনাহ করি, তাহলে ১০০ রাকাত নামাজ পড়বো" বা "ফেসবুকে ঢুকলে ১০০ টাকা দান করবো") জায়েজ আছে। তবে এর বিধান ও ফলাফল বুঝতে হলে ইসলামী ফিকহে 'নযর' (মানত) ও 'শর্তযুক্ত প্রতিজ্ঞা'-র নিয়মাবলী জানা জরুরি।
১. শর্তযুক্ত নযর বা মানত (নযর মু'আল্লাক)
ইসলামে মানত দুই প্রকার:
- নযর মুতলাক (শর্তহীন মানত): যেমন- "আমি ১০০ রাকাত নামাজ পড়বো"।
- নযর মু'আল্লাক (শর্তযুক্ত মানত): যেমন- "যদি আল্লাহ আমাকে সুস্থ করেন, তাহলে আমি ১০০ টাকা দান করবো" – এখানে শর্ত পূরণ হলেই কেবল দান ওয়াজিব হয়, অন্যথায় নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৭৩৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৬২)
আপনার বর্ণিত উদাহরণটি দ্বিতীয় প্রকারের (নযর মু'আল্লাক)। অর্থাৎ:
- শর্ত (গুনাহ করা/ফেসবুকে ঢোকা) পূর্ণ হলে – মানত পূরণ করা ওয়াজিব হবে।
- শর্ত পূর্ণ না হলে – মানত পূরণ করা ওয়াজিব নয়।
সুতরাং 'মানতের ইচ্ছা পূরণ না হলেও মানত পূরণ করতে হবে'- এটি শর্তহীন মানতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আপনার বর্ণিত শর্তযুক্ত মানতের ক্ষেত্রে নয়। (আল-হিদায়া, ৪/১১৭; শারহু মা‘আনি’ল আসার, ৩/২২৫)
২. গুনাহ থেকে বাঁচতে এমন শর্ত আরোপ করা জায়েজ কি?
হ্যাঁ, জায়েজ। বরং এটি আত্মশুদ্ধি ও গুনাহ থেকে দূরে থাকার একটি কার্যকরী কৌশল হতে পারে। তবে শর্তটি এমন হতে হবে যা ইসলামী শরিয়তের পরিপন্থী নয়, যেমন:
- খুবই কষ্টকর বা ক্ষতিকর কিছু (যেমন- "অমুক অঙ্গ কেটে ফেলবো") জায়েজ নয়।
- নামাজ ও দান ইবাদত, তাই তা জায়েজ।
হাদীসে মানত করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে কারণ তা ভাগ্য পরিবর্তন করে না, তবে একবার করে ফেললে তা পূরণ করা ওয়াজিব। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৬৯৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৬৩৯) আপনি এটিকে 'নিজের জন্য একটি কষ্টকর শর্ত' হিসেবে ব্যবহার করছেন, যা নিষেধ নয়। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, এই জাতীয় নযর জায়েজ এবং শর্ত পূরণ হলে তা আদায় করতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে, ৫/২৮৫; উসুলুশ শাশী, ৭২)
৩. ফেসবুক স্ক্রলিং থেকে বাঁচার উদাহরণ
এটিও একই নিয়মে পড়বে। আপনি যদি বলেন, "যদি আমি আগামী এক ঘণ্টায় ফেসবুকে ঢুকি, তাহলে ১০০ টাকা দান করবো" – তাহলে শর্ত পূর্ণ হলে (ঢুকলে) দান করা ওয়াজিব হবে, না ঢুকলে কিছুই ওয়াজিব নয়।
৪. সতর্কতা
- মানত করার সময় দৃঢ় ইচ্ছা থাকা জরুরি। হালকা বা ঠাট্টাচ্ছলে বললে মানত সহীহ হবে না। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৯১)
- শর্ত পূরণ হয়ে গেলে মানত পূরণ করা ফরজের কাছাকাছি ওয়াজিব। ইচ্ছাকৃতভাবে না করলে গুনাহ হবে এবং পরে কাযা করতে হবে।
- গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য তাওবা ও ইবাদতে ধারাবাহিক থাকা উত্তম, তবে এই পদ্ধতি ব্যবহারে দোষ নেই। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২২৪; বেহেশতি জেওর, ৫/১৫৯)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
- আপনার বর্ণিত পদ্ধতি জায়েজ।
- শর্ত পূর্ণ না হলে কিছুই করতে হবে না (এটি সাধারণ মানতের মতো নয়)।
- শর্ত পূর্ণ হলে (গুনাহ হলে বা ফেসবুকে ঢুকলে) তা পূরণ করা ওয়াজিব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে গুনাহ থেকে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন। (আমিন)