রাতের বেলা ঘুমের আমল।আর দিনের বেলা ঘুমের আমল কি কি
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন:
রাতের বেলা ঘুমের আমল কী কী? আর দিনের বেলা ঘুমের আমল কী কী?
উত্তর:
ইসলামে ঘুম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সুযোগ। রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুমের আগে ও পরে বেশ কিছু আমল শিক্ষা দিয়েছেন। রাতের ঘুম ও দিনের ঘুম (কাইলূলা) উভয়ের জন্যই পৃথক কিছু সুন্নত ও আদব রয়েছে। নিচে হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহের আলোকে উভয়ের আমল উল্লেখ করা হলো।
🕋 রাতের বেলা ঘুমের আমল (নিদ্রার পূর্বে ও পরে)
রাতের ঘুমের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নত আমলগুলো নিম্নরূপ:
-
ওযু করে শোয়া
- হাদীস: “তুমি যখন শয্যা গ্রহণ করতে চাও, তখন সালাতের ওযুর মতো ওযু করো।” (বুখারী, মুসলিম)
- হানাফী ফিকহ: ‘বাহিশতী যেওয়ার’ - প্রথম অধ্যায়ে ওযু করে শোয়ার গুরুত্ব বর্ণিত।
-
বিছানা ঝেড়ে নেওয়া
- হাদীস: “তোমাদের কেউ যখন বিছানায় যায়, সে যেন তার লুঙ্গির আঁচল দিয়ে বিছানা ঝেড়ে নেয়, কারণ সে জানে না তার পরে কী আছে।” (বুখারী, মুসলিম)
-
আয়াতুল কুরসী পাঠ করা
- হাদীস: “যে ব্যক্তি রাতে আয়াতুল কুরসী পড়ে শোবে, আল্লাহ তার জন্য একজন রক্ষক নিয়োগ করেন এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তার নিকট আসতে পারে না।” (বুখারী)
-
সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়া
- তিন সূরা পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে সারা শরীরে মাসেহ করা (সকাল-সন্ধ্যার আমল, তবে শোয়ার আগেও পড়া সুন্নত)।
-
সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (আমানার রাসূলু)
- হাদীস: “যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ে, তা তার জন্য যথেষ্ট।” (বুখারী, মুসলিম)
-
ঘুমের দু‘আ পড়া
- বিখ্যাত দু‘আ:
“بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ أَمُوتُ وَأَحْيَا” – “হে আল্লাহ! তোমার নামেই আমি মরি এবং জীবিত হই।” (বুখারী) - আরও দু‘আ: “اللَّهُمَّ قِنِي عَذَابَكَ يَوْمَ تَبْعَثُ عِبَادَكَ” (আবু দাউদ)
- বিখ্যাত দু‘আ:
-
ডান কাতে শোয়া
- রাসূল ﷺ ডান কাতে শুয়ে কিবলামুখী হয়ে শুতেন। (বুখারী, মুসলিম)
- ‘রাদ্দুল মুহতার’ ও ‘ফতোয়া উসমানী’তে এই সুন্নতের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
-
তাকবীর, তাহলীল ও তাসবীহ পড়া
- ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৪ বার আল্লাহু আকবার – এটি রাতে শোয়ার আগেও পড়া যায় (মুসলিম)।
-
সূরা মুলক (তাবারাকাল্লাযী) পড়া
- হাদীস: “সূরা মুলক কবরের আযাব থেকে রক্ষা করে।” (তিরমিযী, হাকিম)
-
ঘুম থেকে জেগে দু‘আ পড়া
- “الحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ” (বুখারী)
রেফারেন্স: ‘বাহিশতী যেওয়ার’ ১ম খণ্ড (ঘুমের আদব), ‘রাদ্দুল মুহতার’ ১/২২৪, ‘ফতোয়া উসমানী’ ১/২৩০।
☀️ দিনের বেলা ঘুমের আমল (কাইলূলা বা দুপুরের ঘুম)
দিনের বেলা ঘুমকে ইসলামে ‘কাইলূলা’ বলা হয়। এটি সুন্নত এবং স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। হানাফী ফিকহে দিনের ঘুমের জন্য নিম্নলিখিত আমলগুলো বর্ণিত:
-
জোহরের আগে বা পরে ঘুমানো
- হাদীস: “কাইলূলা করা সুন্নত, কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ তা করতেন।” (ইবনে মাজাহ, সহীহ)
- ইমাম আবু হানীফা (রহ) ও অন্যান্য হানাফী ইমামগণ দুপুরের ঘুমকে মুস্তাহাব বলেছেন। (‘আল-হিদায়া’, ‘ফতোয়া আলমগীরী’)
-
ঘুমের পূর্বে ওযু করা
- দিনের ঘুমেও ওযু করা সুন্নত, যদিও রাতের মতো আবশ্যক নয়। (‘ইমদাদুল ফাতাওয়া’ ১/২৩০)
-
ডান কাতে শোয়া
- রাতের মতোই আদব: ডান কাতে শোয়া উত্তম, তবে প্রয়োজনে বাম কাতেও শোয়া যায়।
-
আয়াতুল কুরসী ও সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়া
- বিশেষ করে ‘কাইলূলা’র সময় শয়তানের প্রভাব থেকে বাঁচতে এই আমল পড়া মুস্তাহাব। (‘মা‘আরিফুল কুরআন’, সূরা ফালাকের তাফসীর)
-
ঘুমের দু‘আ
- দিনের ঘুমে ওই একই দু‘আ পড়া যায়: “بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ أَمُوتُ وَأَحْيَا”
- তবে দিনের ঘুমকে ‘মৃত্যু’র উদাহরণ না ধরে ‘বিশ্রাম’ মনে করে কিছু বিশেষজ্ঞ ভিন্ন দু‘আ পড়েছেন। তবে সাধারণত রাতের দু‘আই যথেষ্ট।
-
অতিরিক্ত ঘুম না করা
- দিনের ঘুম যাতে ইবাদত ও কাজে ব্যাঘাত না ঘটায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা। ফকীহগণ বলেছেন: দিনের ঘুম ইচ্ছাকৃতভাবে ফজরের পর বা আসরের পর না করা উত্তম। (‘বাহিশতী যেওয়ার’)
-
ঘুম থেকে জেগে দু‘আ
- জেগে ওঠার পর “الحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا...” পড়া সুন্নত।
রেফারেন্স: ‘বাহিশতী যেওয়ার’ ১ম খণ্ড (কাইলূলার আদব), ‘ইমদাদুল ফাতাওয়া’ ১/২৩৫, ‘রাদ্দুল মুহতার’ ১/২২৬, ‘ফতোয়া উসমানী’ ৪/২৪০।
⚠️ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নোট (হানাফী ফিকহ অনুযায়ী)
- ঘুম আগে দুই রাকাত সালাতুত তাসবীহ বা নফল পড়া – কোনো কোনো ফকীহ বলেছেন, রাতে ঘুমের আগে ইশার পর দুই রাকাত নফল পড়া মুস্তাহাব। (‘শরহে মা’আনিল আসার’)
- দিনের ঘুমে পানাহার বা বক্তৃতা ইত্যাদি – ‘উসুলুশ শাশী’তে আছে: দিনের ঘুমের জন্য বিশেষ কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, তবে অনেকক্ষণ ঘুমাতে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ তা কাজ থেকে বিরত রাখে।
- কাইলূলার সময় – সাধারণত জোহরের আগে বা পরে অল্প সময় (২০-৩০ মিনিট) ঘুমানো সুন্নত।
উপসংহার: রাত ও দিন উভয় সময়ের ঘুমের জন্যই ইসলাম সুন্দর আদব ও আমল শিখিয়েছে। রাতের ঘুম বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আর দিনের ঘুম (কাইলূলা) সুন্নত। উভয়ের ক্ষেত্রে ওযু, কিবলামুখী হয়ে ডান কাতে শোয়া এবং কুরআন-যিকির পাঠ করা উত্তম। আল্লাহ তাআলা আমাদের আমল করার তাওফীক দিন। (আমীন)