হালাল হারাম মিশ্রিত সম্পদ থেকে হাদিয়া গ্রহন

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 1410
Questioner: Saiful Islam
Question Asked: 09 Jun 2026, 02:51 PM
Reviewed & Published: 09 Jun 2026, 03:02 PM
Views: 76
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১।আমার ছোটো ভাই ইউরোপে রেস্টুরেন্টে পিৎজা বানায় এবং ডেলিভারির জব করে। সে শুকুরের মাংসের পিৎজা বানায় কিনা জানিনা। পিৎজা তো মুরগি, গরুর ও হয়। সে যদি শুকুর, গরু, মুরগি দিয়ে পিৎজা বানায় তার ইনকাম কি হালাল হারাম মিশ্রিত।

২।হারাম অর্থ থেকে কেউ কিছু দিলে ব্যাবহার করা কি হারাম যেমন টাকা, মোবাইল ইত্যাদি?

৩।আর যদি না জানি তার ইনকাম হারাম কিনা আর জিজ্ঞেস না করে ব্যাবহার করি তাহলে কি হবে?

Answer

প্রশ্নের উত্তর (Hanafi Fiqh অনুযায়ী)

প্রশ্ন ১: ছোট ভাই ইউরোপে পিৎজা রেস্টুরেন্টে কাজ করে। সে শুয়োরের মাংসের পিৎজাও বানায় কিনা জানি না। তার ইনকাম কি হালাল-হারাম মিশ্রিত?

উত্তর:
আপনার ভাইয়ের কাজ যদি শুধুমাত্র হালাল উপকরণ (গরু, মুরগি, সবজি ইত্যাদি) দিয়ে পিৎজা তৈরি এবং ডেলিভারি করা হয়, তাহলে তার উপার্জন হালাল। কিন্তু যদি তিনি শুয়োরের মাংস (পর্ক) দিয়ে পিৎজা বানান অথবা যে রেস্টুরেন্টে পর্ক পিৎজা বিক্রি হয় সেখানে তিনি ঐ পর্ক পিৎজা তৈরিতে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন, তাহলে তার সেই কাজের উপার্জন হারাম হবে।

কারণ, হারাম কাজে সরাসরি অংশগ্রহণকারীর উপার্জনও হারাম। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

"যে ব্যক্তি এমন কাজ করে যা শরিয়তে নিষিদ্ধ, তার উপার্জন হারাম।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৪)

একইভাবে, ফতোয়ায়ে উসমানী-তে এসেছে:

"যদি কোনো ব্যক্তি এমন রেস্টুরেন্টে চাকরি করে যেখানে শুয়োরের মাংসও বিক্রি হয় এবং তার কাজের মধ্যে ঐ মাংস পরিবেশন বা তৈরি করা অন্তর্ভুক্ত থাকে, তবে তার বেতন জায়েয হবে না। তবে যদি সে শুধু হালাল খাবার তৈরিতে নিয়োজিত থাকে এবং তার কাজ হারামের সাথে সম্পর্কিত না হয়, তাহলে বেতন হালাল।" (ফতোয়ায়ে উসমানী, ২/৫৪)

সতর্কতা:
আপনার ভাই যদি নিশ্চিত না হন যে তিনি কখনো পর্ক পিৎজা বানান না, অথবা রেস্টুরেন্টে পর্ক পিৎজা বিক্রি হয় এবং তাকে সেটা বানাতে হতে পারে, তাহলে তার জন্য ঐ চাকরি ত্যাগ করে হালাল উপার্জনের ব্যবস্থা করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে অকল্পনীয় উৎস থেকে রিজিক দেন।" (সূরা আত-তালাক, ২-৩)


প্রশ্ন ২: কেউ যদি হারাম অর্থ (যেমন সুদ, চুরি, পর্ক বিক্রির টাকা) থেকে কিছু দেয় (টাকা, মোবাইল ইত্যাদি), তাহলে তা গ্রহণ করা কি হারাম?

উত্তর:
এ বিষয়ে হানাফি ফিকহের বিস্তারিত মতামত নিম্নরূপ:

  • যদি জানা যায় যে ঐ অর্থ নির্দিষ্ট কোনো হারাম লেনদেন থেকে এসেছে (যেমন চুরি, জবরদখল, প্রতারণা), তাহলে সেই অর্থ গ্রহণ করা হারাম, কারণ তা প্রকৃত মালিকের সম্পদ। এটি নিজের জন্য ব্যবহার করা জায়েয নয়।
  • যদি অর্থটি সাধারণ হারাম ব্যবসা থেকে আসে (যেমন সুদি ব্যাংক, পর্ক ব্যবসা, মদ ব্যবসা) কিন্তু দাতা নিজেই এর মালিক, তাহলে গ্রহণ করা নাজায়েয নয়; বরং দাতার ওপর গুনাহ হবে। আপনার ওপর কোনো দোষ নেই। তবে উত্তম হলো এড়িয়ে চলা, যাতে দাতার গুনাহে শামিল না হওয়া যায় এবং তাকে হারাম উপার্জন থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করা যায়।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেছেন:

"যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে, তার মালিকানা সাব্যস্ত হয়। তাই কেউ যদি তা থেকে কিছু দেয়, তবে গ্রহণকারী তা নিতে পারে। তবে তাকওয়া হল তা গ্রহণ না করা।" (রদ্দুল মুহতার, ৫/২৬৫)

ফতোয়ায়ে উসমানী-তে এসেছে:

"সুদ, ঘুষ, পর্ক ইত্যাদি থেকে উপার্জিত সম্পদ নিজের জন্য ব্যবহার করা দাতার জন্য গুনাহ, কিন্তু গ্রহীতার জন্য তা নাজায়েয নয়, যদি না তা অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ আত্মসাৎ করে দেওয়া হয়। তবে এ ধরনের গিফট গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকাই সংযমের কাজ।" (ফতোয়ায়ে উসমানী, ২/৩২১)

সারসংক্ষেপ:

  • হারাম অর্থ [নির্দিষ্ট মালিকবিহীন] হলেও গ্রহণ করা জায়েয, কিন্তু উত্তম নয়
  • যদি অর্থ চুরি, ডাকাতি বা জোরপূর্বক নেওয়া হয়, তাহলে গ্রহণ করা হারাম।

প্রশ্ন ৩: যদি আমি জানি না তার উপার্জন হারাম কিনা, এবং জিজ্ঞেস না করেই ব্যবহার করি, তাহলে কী হবে?

উত্তর:
মূলনীতি হলো: যে কোনো মুসলিমের সম্পদ হালাল ধরা হবে, যতক্ষণ না তার হারাম হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। (আল-আসলে আল-ইবাহা, উসুলুল ফিকহ)

সুতরাং আপনার ভাইয়ের আয়ের প্রকৃতি সম্পর্কে আপনি যদি কিছুই না জানেন (অর্থাৎ তিনি কী কী উপকরণ দিয়ে পিৎজা বানান, রেস্টুরেন্টে পর্ক আছে কিনা ইত্যাদি), তাহলে তার দেওয়া টাকা বা উপহার গ্রহণ করা এবং ব্যবহার করা জায়েয। আপনার জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নেই।

ইমাম কাসানী (রহ.) বলেন:

"মুসলিমের সম্পদ পবিত্র ও হালাল, যতক্ষণ না বিপরীত প্রমাণিত হয়।" (বাদায়েউস সানায়ে, ৭/১৪৭)

তবে উত্তম হলো: যদি আপনি জানতে পারেন যে তার কাজের স্থানে পর্ক ব্যবসা হয়, তাহলে সরাসরি জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হওয়া ভালো। কিন্তু না জানলে কোনো দোষ নেই

ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া-তে আছে:

"যদি কোনো ব্যক্তির আয়ের উৎস সম্পর্কে জানা না থাকে, তবে তার থেকে হাদিয়া বা উপহার নেওয়া জায়েয, কারণ আসল হলো পবিত্রতা।" (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ৫/৩৪৪)


সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা:

  1. ভাইয়ের জন্য: তিনি যদি নিশ্চিত হন যে পর্ক পিৎজা তৈরিতে তার অংশগ্রহণ নেই, তাহলে চাকরি চালিয়ে যেতে পারেন। নতুবা চাকরি পরিবর্তন করা উচিত।
  2. আপনার জন্য: ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করলে গুনাহ হবে না, তবে তার কর্ম সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে জিজ্ঞেস করে নেওয়া ভালো।
  3. হারাম ইন্কামের টাকা/জিনিস গ্রহণ করা জায়েয, কিন্তু তাকওয়া হলো পরিহার করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল রিজিক দান করুন এবং হারাম থেকে দূরে রাখুন। আমীন।

রেফারেন্স:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
  • ফতোয়ায়ে উসমানী
  • ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া
  • বাদায়েউস সানায়ে
  • ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী)

বি.দ্র.: প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে আলোচ্য বিষয়গুলোর উপরোক্ত উল্লেখিত কিতাব থেকে দলিল ব্যবহার করা হয়েছে।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.