পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য দূর থেকে কি কি আমল করা যাবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১/ পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য দূর থেকে কি কি আমল করা যাবে? দুয়া করা ছাড়া
২/ সকাল সন্ধ্যার মাসনুন আমল করা যাবে উনাদের জন্য?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি মূলত দু’টি বিষয় নিয়ে:
১. পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য দু‘আ ছাড়া দূর থেকে কী কী ‘আমল করা যাবে?
২. সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন ‘আমল (যিকির-আযকার) কি তাদের জন্যও করা যাবে?
নিচে হানাফী ফিকহের আলোকে দলীলসহ উত্তর দেওয়া হলো।
১. পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য দূর থেকে দু‘আ ছাড়া কী কী ‘আমল করা যাবে?
হানাফী মাযহাবে জীবিত বা মৃত যে কোনো মুসলিমের জন্য নেক ‘আমলের সওয়াব পৌঁছানো (ইসালে সওয়াব) জায়েয এবং তা দ্বারা উপকৃত হয়। [রদ্দুল মুহতার, ২/২৪২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৮]
দু‘আ ছাড়া নিম্নোক্ত ‘আমলগুলি দূর থেকে পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য করা যেতে পারে:
ক. কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানো:
- ইমাম আহমদ রজা খান, শাহ আব্দুল হক মোহাদ্দিসে দেহলভী, আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রহ.)-সহ অধিকাংশ হানাফী আলিমের মতে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব জীবিত ও মৃত উভয়ের জন্য পৌঁছানো যায়। [রদ্দুল মুহতার, ২/২৪২; ফাতাওয়া উসমানী, ১/৪২২]
খ. দান-সদকা করা:
- দান-সদকার সওয়াব সরাসরি পৌঁছায়। হাদীসে এসেছে, “মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার আমলনামা বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু তিনটি আমল বন্ধ হয় না: সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম এবং সন্তানের দু‘আ।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৬৩১]
- তাই পরিবারের সদস্যদের (জীবিত বা মৃত) জন্য সওয়াবের নিয়তে সদকা করা যায়।
গ. নফল নামায পড়ে সওয়াব পৌঁছানো:
- হানাফী মতে নফল নামাযের সওয়াব অন্যকে হাদিয়া দেওয়া জায়েয। [ফাতাওয়া শামী, ২/২৪২; বাহিশতী জেওর, ২/১৫৪]
- তবে ফরয নামাযের সওয়াব অন্যকে দেওয়া যায় না।
ঘ. যিকির-আযকার, তাসবীহ-তাহলীল ও দরূদ পাঠ করে সওয়াব পৌঁছানো:
- সকাল-সন্ধ্যার যিকির বা অন্য কোনো তাসবীহের সওয়াব নিয়তে পাঠ করে “আল্লাহুম্মা আওসিল ছাওয়াবা...” বলে পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্যে করা যায়।
ঙ. রোযার সওয়াব পৌঁছানো?
- ফরয রোযার সওয়াব দেওয়া যায় না, তবে নফল রোযার সওয়াব দেওয়া যায় বলে অধিকাংশ হানাফী উলামার মত। [ফাতাওয়া শামী, ২/৪২৩]
চ. ইস্তিগফার ও তওবা:
- পরিবারের সদস্যদের জন্য ইস্তিগফার করা (যেমন: “রব্বানাগফিরলী ওয়া লিওয়ালিদাইয়্যা”) সুন্নত। এটি দু‘আর অন্তর্ভুক্ত হলেও দু‘আ ছাড়া ইস্তিগফারকে ‘আমল বলা যায়।
সতর্কতা:
- এসব ‘আমল করার সময় নিজের জন্যও নিয়ত রাখা উত্তম। কেননা নিজের ‘আমল নিজে করাই মূল। তবে অন্যকে সওয়াব পৌঁছানোর জন্য আলাদা নিয়ত করলে তা জায়েয।
- দূর থেকে ‘আমল করার জন্য কোনোরূপ নির্দিষ্ট স্থান বা দিকনির্দেশনার প্রয়োজন নেই। শুধু মনে মনে বা মুখে বলে দেওয়াই যথেষ্ট।
২. সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন ‘আমল কি পরিবারের অন্যদের জন্য করা যাবে?
**জ্বি, করা যাবে। এক্ষেত্রে তারা ছওয়াব পাবে। তবে সকাল সন্ধ্যায় তারা উক্ত আমল নিজে করলে হাদীসে বর্ণিত যে ফজিলত পেতো,সেটি পাবেনা। উক্ত ফজিলত পাওয়ার জন্য প্রত্যককে নিজের আমল করতে হবে।
** তবে এখানে দুটি দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা জরুরি:
ক. নিজের জন্য করা মাসনূন ‘আমল:
- সকাল-সন্ধ্যার যিকির (যেমন সূরাহ ইখলাস, ফালাক, নাস, আয়াতুল কুরসী, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত ইত্যাদি) মূলত নিজের সুরক্ষা ও বরকতের জন্য। এগুলো পাঠ করে নিজের সওয়াব অন্যকে হাদিয়া দেওয়া জায়েয, তবে নিজে না পড়ে শুধু অন্যের জন্য পড়া ঠিক নয়। বরং নিজে পড়ার পর বা একই সাথে নিয়ত করে দেওয়া যায়।
খ. পরিবারের সদস্যদের জন্য সরাসরি পাঠ:
- যদি আপনি ইচ্ছে করেন যে “আমি এই যিকিরটি আমার মা/বাবার জন্যও পড়ছি” – তাহলে তা জায়েয। হাদীসে আছে, “যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ ১০০ বার পাঠ করে, তার পাপ মাফ হয়...।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬৯২]
- এই যিকির অন্যকে হাদিয়া দিলে তার জন্যও সওয়াব পৌঁছায়।
গ. মাসনূন দু‘আ ও যিকিরে পরিবারের উল্লেখ:
- অনেক মাসনূন দু‘আতেই পরিবারের জন্য দোয়া রয়েছে, যেমন: “রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুর্রাতা আ’য়ুন” (সূরা ফুরকান, ২৫:৭৪)। সকাল-সন্ধ্যার যিকিরের সাথে এ জাতীয় দোয়া পড়া সুন্নত।
হানাফী রেফারেন্স:
- “মাসনূন যিকির নিজের ও পরিবারের জন্য পড়া জায়েয। তবে অন্য কারো জন্য নির্দিষ্ট করে সকাল-সন্ধ্যার যিকির না পড়া উত্তম, বরং দু‘আ করে দেওয়া উচিত। কেননা মাসনূন যিকির নির্দিষ্ট ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য নয়, বরং সাধারণ কল্যাণের জন্য।” [ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫/২৩৪; ফাতাওয়া উসমানী, ১/৪২৮]
- তবে হানাফী মতে ইসালে সওয়াবের ক্ষেত্রে কুরআন তিলাওয়াত ও যিকিরের সওয়াব পৌঁছানো জায়েয, তাই সকাল-সন্ধ্যার যিকিরও পাঠ করে সওয়াব পৌঁছানো বৈধ। [রদ্দুল মুহতার, ২/২৪৩]
উপসংহার:
- সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকির নিজে পড়া সুন্নত। এর সওয়াব পরিবারের অন্য সদস্যদের হাদিয়া দেওয়া জায়েয। তবে শুধু তাদের জন্য আলাদাভাবে এ আমল করা ঠিক নয়; বরং নিজে পড়ার পর তাদের জন্যও দু‘আ ও নিয়ত করে নেওয়া ভালো।
★সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকির নিজে পড়া সুন্নত। এর সওয়াব পরিবারের অন্য সদস্যদের হাদিয়া দেওয়া জায়েয। এতে তারাও ছওয়াব পাবে।
তবে সকাল সন্ধ্যায় তারা উক্ত আমল নিজে করলে হাদীসে বর্ণিত যে ফজিলত পেতো,সেটি পাবেনা। উক্ত ফজিলত পাওয়ার জন্য প্রত্যককে নিজের আমল করতে হবে
- দু‘আ ছাড়া অন্য ‘আমল যেমন কুরআন তিলাওয়াত, দান, নফল নামায, যিকির ইত্যাদি পরিবারের সদস্যদের জন্য দূর থেকে করা যায় এবং এর সওয়াব পৌঁছায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন।