গীবত কি? শ্বশুর পরিবারের ঝগড়া-বিবাদের ঘটনা অন্যের কাছে বলা কি গীবত?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গীবত (পরনিন্দা)-এর সংজ্ঞা ও ব্যতিক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
১. গীবতের সংজ্ঞা
গীবত হল কোনো মুসলিম ভাই বা বোনের এমন বিষয় আলোচনা করা যা শুনলে সে অপছন্দ করে, যদিও তা সত্য হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"গীবত কি জানো? সাহাবীরা বললেন: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন: তুমি তোমার ভাইয়ের এমন বিষয় উল্লেখ করো যা সে অপছন্দ করে। জিজ্ঞাসা করা হলো: যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সেই বিষয় সত্যিই থাকে? তিনি বললেন: তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে থাকে, তবে তুমি তার গীবত করলে। আর যদি না থাকে, তবে তুমি তার উপর অপবাদ দিলে।"
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৮৯)
অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির দোষ বা ত্রুটি তার অনুপস্থিতিতে অন্যদের কাছে বলা গীবতের অন্তর্ভুক্ত, যদিও তা বাস্তব হয়।
২. গীবতের ব্যতিক্রম
গীবত সাধারণত হারাম; তবে কিছু ক্ষেত্রে তা জায়েয বা ওয়াজিব হতে পারে। হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব রদ্দুল মুহতার ও ফাতাওয়া হিন্দিয়া-তে নিম্নোক্ত ব্যতিক্রমগুলো উল্লেখ করা হয়েছে:
- অত্যাচার দূর করতে সাহায্য চাওয়া: কেউ জুলুম করলে তার বিরুদ্ধে বিচারক বা কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ করা।
- শরীয়তসম্মত পরামর্শ চাওয়া: যেমন কেউ বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে জানতে চাইলে তার ভালো-মন্দ বলা।
- সৎ উপদেশ দেওয়া এবং অন্যকে ক্ষতি থেকে বাঁচানো।
- অহংকার বা বিদআতের মতো প্রকাশ্য পাপ সম্পর্কে সতর্ক করা।
- নিজের সহায়-সম্পর্কিত বিষয়ে কথা বলা: যেমন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমস্যা হলে উভয়ের পরিবারের সদস্যদের কাছে সমাধানের জন্য বলা।
(বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৭৫; বাহিশতী জেওর, গীবত অধ্যায়)
৩. আপনার প্রশ্নের প্রাসঙ্গিক আলোচনা
আপনি শ্বশুরবাড়ির কারো সাথে ঝগড়া-বিবাদের ঘটনা অন্য কারো কাছে শেয়ার করছেন। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করা জরুরি:
ক) আপনি কার কাছে বলছেন?
- যদি আপনি আপনার স্বামীকে তার নিজ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বলছেন, তাহলে এটি গীবত হবে না। কারণ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পরস্পরের পরিবারের বিষয়ে আলোচনা বৈধ, বিশেষত সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে।
- তবে যদি আপনি অন্য কোনো আত্মীয় বা বন্ধু-বান্ধবকে বলেন, যারা ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত নয় এবং কোনো সমাধানেও ভূমিকা রাখতে পারে না, তাহলে সেটি গীবত হবে।
খ) আপনার উদ্দেশ্য কী?
- যদি উদ্দেশ্য হয় নিজের মন হালকা করা বা অকারণে অন্যদের কাছে কারো দোষ বর্ণনা করা, তাহলে তা নিশ্চিতভাবে গীবত।
- কিন্তু যদি আপনার উদ্দেশ্য হয় পরামর্শ নেওয়া বা সমস্যা সমাধানের জন্য মধ্যস্থতাকারীর সাহায্য চাওয়া, তাহলে সেটি গীবতের ব্যতিক্রমের আওতায় পড়ে। যেমন: আপনি যদি আপনার বড় ভাই বা পরিবারের কোনো বিজ্ঞ ব্যক্তিকে বলেন, যিনি উভয় পক্ষের সাথে কথা বলে সমঝোতা করাতে পারেন।
গ) কী পরিমাণ তথ্য বলছেন?
- শুধু প্রয়োজনীয় তথ্যই বলবেন, অতিরিক্ত বিবরণ ও আবেগঘটিত অযথা কথাবার্তা পরিহার করবেন। অন্যদের দোষ বা ত্রুটি অনাবশ্যকভাবে বর্ণনা করা গীবত।
৪. হানাফি ফিকহের নির্দেশনা
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর অনুসারী ফকীহগণ বলেছেন: কোনো মুসলিমের দোষ অন্যের কাছে বলা তখনই জায়েয, যখন কোনো শরয়ী প্রয়োজন থাকে। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২২৫)
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) মা‘আরিফুল কুরআন-এ সূরা হুজুরাতের তাফসীরে লিখেছেন:
"গীবতের ব্যতিক্রম কেবল সেসব ক্ষেত্রেই, যেখানে সৎপরামর্শ বা অন্যায় প্রতিরোধের প্রয়োজন রয়েছে। নিছক নিজের মনোবেদনা লাঘবের জন্য অন্যের নিন্দা করাও গীবতের অন্তর্ভুক্ত।"
আল্লামা ইবনে আবেদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন:
"যদি কেউ কোনো দোষ বর্ণনা করে তার মাধ্যমে অন্যায় প্রতিরোধ বা হক আদায়ের উদ্দেশ্য থাকে, তবে তা জায়েয। অন্যথা নয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮০)
৫. বাস্তব পরামর্শ
- প্রথমে স্বামীর সাথে আলোচনা করুন: শ্বশুরবাড়ির যেকোনো সমস্যা প্রথমে আপনার স্বামীকে জানানোই কর্তব্য। তিনি সমাধানের চেষ্টা করবেন।
- নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী গ্রহণ করুন: যদি সমস্যা গুরুতর হয়, তবে পরিবারের কোনো সম্মানিত সদস্য বা আলেমের সাহায্য নিন। প্রয়োজনীয় তথ্য তাদের জানানো গীবত নয়, বরং সৎপরামর্শের অন্তর্ভুক্ত।
- অতিরিক্ত বিস্তারিত পরিহার করুন: কে কী বলেছে, কীভাবে বলেছে এসব বিস্তারিত বলা থেকে বিরত থাকুন। শুধু সমস্যার নির্যাস বলুন।
- নিজের মনকে সংযত রাখুন: রাগ ও আবেগের বশবর্তী হয়ে অন্যদের কাছে কারো দোষ বর্ণনা করা গীবত। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন।
৬. সংক্ষিপ্ত উত্তর
- বিবাদ বা ঝগড়ার ঘটনা যদি আপনি কোনো অপ্রয়োজনে অথবা অকারণে (যে শুনে কোনো উপকার হবে না) অন্য কারো কাছে শেয়ার করেন, তাহলে তা গীবত হবে।
- যদি উদ্দেশ্য হয় সমস্যা সমাধানের জন্য পরামর্শ নেওয়া বা অন্যায় দূর করা, এবং আপনি সীমিত ও প্রয়োজনীয় তথ্যই বর্ণনা করেন, তাহলে তা গীবত নয়।
- স্বামীকে তার পরিবারের বিষয়ে বলা কখনো গীবত নয়; বরং দাম্পত্য জীবনে পরামর্শের অংশ।
৭. সর্বোত্তম পন্থা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে কেউ কি পছন্দ করে যে, সে তার মৃত ভাইয়ের গোশত খায়? নিশ্চয়ই তোমরা তা ঘৃণা করো।" (সূরা হুজুরাত: ১২)
আপনার জন্য উত্তম পন্থা হলো:
- কোনো ঘটনা অন্যের কাছে বলার আগে নিজের নিয়ত পরীক্ষা করুন।
- শুধু সমস্যার সমাধানের জন্যই কথা বলুন।
- পরনিন্দা ও অহেতুক দোষ বর্ণনা থেকে বিরত থাকুন।
- সরাসরি সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে বসে সমঝোতার চেষ্টা করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে গীবতের মতো জঘন্য পাপ থেকে হেফাজত করুন এবং পারস্পরিক সদ্ভাব ও ক্ষমার মনোভাব দান করুন। (আমিন)