যেন তেন ভাবে বলা কথা ভঙ্গ করলে তার কাফফারা এবং অন্যান্য
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
প্রশ্ন ১ঃ এখন এভাবে কথা বলে সেই কথা না রাখার জন্য কি আমাকে কাফফারা দিতে হবে?দিলে সেটা কিভাবে? বিয়ের আগেই সেটা আদায় করতে হবে?
প্রশ্ন ২ঃ "আল্লাহর কসম" না বলে এমনি যদি মনে মনে কিছু না করার দৃঢ় শপথ করি আবার পরে তা রক্ষা করতে না পারি তখন কি কাফফারা দিতে হবে?দিলে কিভাবে?
আমার প্রায় সারা বছরই সাদা স্রাব থাকে কম বেশি। কিন্তু আমি মাজুর না। দেখা যায় যে, বেসির ভাগ সময়ই একদম অল্প অল্প বিন্দু মত করে বের হতে থাকে । তাই হাত দিয়ে চেক না করলে বুঝিই না।কারন খুব অল্প অল্প করে বের হয় উরুর চামড়া বা কাপরে লাগে না কখনো।
কিন্তু সমস্যা হল নামাজের মধ্যে এগুলা কখন বের হয় বেশিরভাগ সময়ই আমি কিছু টের পাই না।তাই আমাকে প্রতি নামাযে সালাম ফিরে বার বার হাত দিয়ে চেক করতে হয়। দেখা যায় জহরে ৪ রাকাত সুন্নাত নিয়ত করে পড়া শেষ করে চেক করলাম তখন লজ্জাস্থানের বাইরে একদম মুখে অল্প বিন্দু পরিমান স্রাব পেলাম হাতে।।এর পর আরও ২/৩ বারে এভাবেে পড়ে পড়ে চেক করার পর হয়ত শেষ করতে পারি সুন্নাত।।তারপর ফরয।।এভাবে পরতে পরতে ওয়াক্তের প্রায় শেষের দিকে চলে আসে কখনো কখনো।
নামাজের মধ্যে এগুলা কখন বের হয় বেশিরভাগ সময়ই আমি কিছু টের পাই না।কিন্তু অনেক দিন যাবত বার বার চেক করার ফলে পূর্বের রেকর্ড থেকে আমার সবসময়ই প্রবল ধারনা থাকে যে, আমার কিছু না কিছু বের হয়েছেই।এবং এটা বেসির ভাগ সময়ই সত্য আবার কখনো শুকনাও পাই। আর বেসির ভাগ সময় এমন থাকার ফলে স্পষ্ট ভেজা কাকে বলে আমি আলাদা করতে পা্রি না মনে হয়।আমার সব সময়ই মনে হয় যে ভেজা।
প্রশ্ন ৩ঃ সালাম ফিরে এভাবে বার বার চেক করা কি ঠিক? আবার এত অল্প পরিমানে বের হয় যে চেক না করলে তো বুঝি ই না। তাহলে কিভাবে নামাজ পরব?
প্রশ্ন ৪ঃ শুধু স্পষ্ট বের হচ্ছে যখন অনুভব করব তখন তো চেক করব। কিন্তু এই যে আমার সবসময়ই প্রবল ধারনা থাকে যে, আমার কিছু না কিছু বের হয়েছেই। এই অবস্থায়ও কি আমি প্রবল ধারনা হলেই বা স্পষ্ট ভেজা মনে হলেই চেক করব? নাকি কিভাবে চেক করব
এভাবে আমি নামাজে মনোযোগ ও রাখতে পারি না।আবার স্বাভাবিক জীবন জাপন করাও খুবই কষ্টকর। বাসায় কতধরনের দায়িত্ব থাকে মেয়ে হিসেবে।
Answer
উত্তর
প্রশ্নগুলোর উত্তর নিম্নে হানাফি ফিকহের কিতাব ও উলামায়ে কেরামের মতামতের আলোকে দেয়া হলো। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
প্রশ্ন ১: মায়ের সাথে কথার কথা বলা ও তা না রাখার কাফফারা
উত্তর: আপনি যে কথাটি বলেছেন, তা কোনো কসম (শপথ) ছিল না, বরং এটি ছিল আবেগ ও অভিমানের বশে বলা একটি সাধারণ কথা। ইসলামী শরিয়তে কাফফারা ওয়াজিব হয় তখনই, যখন আল্লাহর নাম বা গুণাবলি উল্লেখ করে কোনো কাজ করার বা না করার দৃঢ় শপথ করা হয় এবং তা ভঙ্গ করা হয়। আপনার বক্তব্যে "আল্লাহর কসম" বা এর মতো কোনো শপথের বাক্য ছিল না। তাই এটি কোনো ইয়ামিন (শপথ) হিসেবে গণ্য হবে না। ফলে এটি ভঙ্গ করার জন্য কোনো কাফফারা ওয়াজিব নয়।
তবে, মায়ের সাথে এমন কথা বলা এবং পরে তা না রাখা একটি ভুল ও গুনাহের কাজ। এর জন্য আপনাকে তাওবা-ইস্তিগফার করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিয়ের আগে বা পরে কোনো কাফফারা দিতে হবে না।
হানাফি ফিকহের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার: ইয়ামিনের জন্য "ওয়াল্লাহি" বা এর মতো স্পষ্ট শপথের বাক্য প্রয়োজন। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৭১৪)
- ফতোওয়া উসমানী: ইয়ামিন শুধু মুখে উচ্চারণ করলে হয়, মনে মনে করলে নয়। (ফতোওয়া উসমানী, ১/৪৯০)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: আবেগ বা রাগের বশে বলা কথা ইয়ামিন হিসেবে গণ্য হয় না, যদি না শপথের নিয়ত থাকে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৯৫)
উপসংহার: কোনো কাফফারা প্রযোজ্য নয়। শুধু তাওবা করুন।
প্রশ্ন ২: "আল্লাহর কসম" না বলে মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করলে কাফফারা
উত্তর: হানাফি মতে, ইয়ামিন (শপথ) শুধু মুখে উচ্চারণ করলেই হয়, অন্তরের সংকল্প বা নিয়তে নয়। যদি আপনি "আল্লাহর কসম" না বলে শুধু মনে মনে কোনো কাজ না করার দৃঢ় সংকল্প করেন, তাহলে তা একটি সাধারণ প্রতিজ্ঞা (ওয়াদা) হবে, ইয়ামিন হবে না। তাই এটি ভঙ্গ করলে কাফফারা ওয়াজিব হয় না। তবে এ প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা গুনাহের কাজ, তাই তাওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে সংকল্প রক্ষার চেষ্টা করতে হবে।
হানাফি ফিকহের রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া: ইয়ামিনের জন্য মুখে উচ্চারণ আবশ্যক, অন্তরের নিয়ত যথেষ্ট নয়। (আল-হিদায়া, ২/৭৫)
- শরহু মাআনিল আসার: ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফের মতে, ইয়ামিন শুধু মুখের কথায় হয়। (শরহু মাআনিল আসার, ২/৪৫৬)
- ফতোওয়া আলমগীরী: যদি কেউ কসমের বাক্য না বলে মনে মনে কিছু করার ইচ্ছা করে, তা ইয়ামিন নয়। (ফতোওয়া আলমগীরী, ১/২৭৫)
উপসংহার: কাফফারা ওয়াজিব নয়, তাওবা করুন।
প্রশ্ন ৩ ও ৪: সাদা স্রাব, নামাজে বারবার চেক করা এবং মনোযোগের সমস্যা
উত্তর: আপনার বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, আপনার মধ্যে ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ-প্রবণতা) তৈরি হয়েছে। শরিয়তের মূলনীতি হলো: নিশ্চিত জিনিস সন্দেহ দ্বারা দুর্বল হয় না। অর্থাৎ, যতক্ষণ না আপনি নিশ্চিত হবেন যে স্রাব বের হয়েছে, ততক্ষণ আপনার ওজু ও নামাজ সহীহ থাকবে। শুধু ধারণা বা প্রবল ধারণার ওপর ভিত্তি করে ওজু ভাঙবে না।
নামাজের ভেতর বা শেষে বারবার চেক করা উচিত নয়। কারণ এটি ওয়াসওয়াসাকে বাড়িয়ে তোলে এবং নামাজের মনোযোগ নষ্ট করে। আপনি যদি নামাজ শেষে হাতে সামান্য ভেজা পান, তবে যদি তা বের হওয়ার কোনো অনুভূতি না থাকে, তাহলে আপনার নামাজ সহীহ হবে, কারণ আপনি নিশ্চিত নন যে তা নামাজের ভেতর বের হয়েছে।
আপনার জন্য করণীয়:
-
ওয়াজিব হলো: নামাজের শুরুতে ওজু করে নিন। এরপর নামাজের ভেতর কোনো অনুভূতি না হলে ওজু ভাঙবে না। নামাজ শেষে যদি দেখেন কিছু বের হয়েছে, কিন্তু নামাজের সময় তা টের পাননি, তাহলে আপনার নামাজ সহীহ।
-
**যদি নামাজের ভেতর স্পষ্ট অনুভব করেন যে কিছু বের হচ্ছে (পানি বা বাতাসের মতো), তাহলে ওজু ভেঙে যাবে এবং নামাজ ভেঙে যাবে। তখন আবার ওজু করে নামাজ পড়তে হবে।
-
বারবার চেক করা বা হাত দিয়ে পরীক্ষা করা বন্ধ করুন। এটি শয়তানের কাজ। আপনি যদি অতিরিক্ত সন্দেহে ভোগেন, তাহলে নিজেকে মাজুর (ওজরের অধিকারী) গণ্য করতে পারেন। মাজুর হওয়ার শর্ত হলো: কোনো একটি ওয়াক্তে অন্তত একবার করে স্রাব বের হওয়া এবং সম্পূর্ণ ওয়াক্ত জুড়ে ওজু ধরে রাখতে না পারা। আপনার ক্ষেত্রে যদি প্রায়ই স্রাব বের হয় এবং আপনি পুরো ওয়াক্ত একবার ওজু করে নামাজ পড়তে না পারেন, তাহলে আপনি মাজুর হিসেবে গণ্য হবেন। মাজুর অবস্থায় প্রতিটি ফরজ নামাজের জন্য নতুন ওজু করতে হবে এবং সেই ওজু দিয়ে যত খুশি নামাজ পড়তে পারবেন, যদিও স্রাব বের হতে থাকে।
-
প্রবল ধারণা থাকলেই চেক করবেন না। বরং শুধু তখনই চেক করবেন যখন আপনি স্পষ্ট কোনো কিছু অনুভব করবেন (ভেজা, চাপ ইত্যাদি)।
হানাফি ফিকহের রেফারেন্স:
- বাহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার উপায় এবং নিশ্চিত না হলে ওজু না ভাঙার নির্দেশ। (বাহেশতি জেওর, ওজুর অধ্যায়)
- ফতোওয়া উসমানী: স্রাব বের হওয়ার স্পষ্ট অনুভূতি না থাকলে ওজু ভাঙবে না। (ফতোওয়া উসমানী, ১/২৩২)
- রদ্দুল মুহতার: মাজুর হওয়ার শর্ত ও বিধান। (রদ্দুল মুহতার, ১/৩০৪)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য শরিয়তের সহজ পন্থা গ্রহণের নির্দেশ। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/১০৫)
উপসংহার: নামাজে মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে ওয়াসওয়াসা ত্যাগ করুন। শুধু স্পষ্ট অনুভূতি না থাকলে ওজু ভাঙবেন না। আপনার অবস্থা যদি দীর্ঘমেয়াদী এবং কষ্টকর হয়, তবে মাজুর হওয়ার নিয়ম অনুসরণ করুন এবং নিজের মানসিক চাপ কমাতে বিশেষজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নিন।