কোনো মুসলিমের ঈমান নিয়ে সন্দেহ হলে তার সাথে আল-ওয়ালা ওয়াল-বারার প্রয়োগ কেমন হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কোনো মুসলিমকে কি উপযুক্ত বর্ণিত ব্যাক্তি থেকে নিজেকে উত্তম মনে করতে হবে?(যেহেতু মুসলিমরা ঈমান এর কারণে কাফেরদের থেকে উত্তম)
Answer
উত্তর
প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তি যদি কোনো কুফরী বা শিরকের কারণে নিজের ঈমান নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে, তাহলে তার সাথে আল-ওয়ালা ওয়াল-বারার (ভালোবাসা ও বিরাগ) বিধান কী? সাধারণ মানুষ তো তাকে তাকফির করতে পারে না—এক্ষেত্রে তার সাথে অন্য মুসলিমদের মতোই আচরণ করতে হবে? আর নিজেকে কি তার চেয়ে উত্তম মনে করতে হবে (যেহেতু মুসলিমরা ঈমানের কারণে কাফেরদের চেয়ে উত্তম)?
১. ঈমান নিয়ে সন্দেহের হুকুম
শরিয়তে ঈমানের মৌলিক বিষয়সমূহ (যেমন আল্লাহ, রাসূল, কিতাব, আখিরাত) নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা কুফরি। তবে শুধুমাত্র ওয়াসওয়াসা (মনের খেয়াল বা শয়তানি প্ররোচনা) অথবা জ্ঞানের অভাবে সৃষ্ট সন্দেহ তাৎক্ষণিকভাবে কুফর সাব্যস্ত হয় না, যতক্ষণ না ব্যক্তি তা অন্তরে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং প্রকাশ্যে কুফরী কথা বলে বা কাজ করে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যদি কোনো মুসলিম কুফরী শব্দ উচ্চারণ করে কিন্তু তার অন্তর মুমিন থাকে, তাহলে তাকে কাফের বলা যাবে না (রাদ্দুল মুহতার, ৪/২২৪)। তবে যদি সে ঈমানের মূল বিষয় অস্বীকার করে বা কুফরী কাজে লিপ্ত হয়, তাহলে সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়।
২. তাকফিরের শর্ত
হানাফি ফিকহে তাকফির (কাউকে কাফের সাব্যস্ত করা) অত্যন্ত সতর্কতার বিষয়। সাধারণ মানুষ তাকফির করতে পারে না; এটি শুধুমাত্র আলিম ও মুফতিদের দায়িত্ব। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো মুসলিমের কুফরী স্পষ্ট প্রমাণিত না হয়, ততক্ষণ তাকে মুসলিমই গণ্য করতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি তার ভাইকে 'কাফের' বলে, তবে যদি সে (ভাই) সত্যিই কাফের না হয়, তাহলে সেই অভিশাপ তাকে (উচ্চারণকারীকে) ফিরে আসে।" (সহিহ বুখারি: ৬১০৩; সহিহ মুসলিম: ৬০)।
অতএব, প্রশ্নোক্ত ব্যক্তির ঈমান সম্পর্কে শুধুমাত্র সন্দেহ থাকলেই তাকে কাফের বলা জায়েয নয়। তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রমাণ বা শরয়ি ফতোয়া না থাকা পর্যন্ত তাকে মুসলিম হিসেবেই আচরণ করতে হবে।
৩. আল-ওয়ালা ওয়াল-বারার প্রয়োগ
- ওয়ালা (ভালোবাসা) ও বারা (বিরাগ) ইসলামের মৌলিক নীতি। আমরা মুমিনদের ভালোবাসি এবং কাফেরদের অপছন্দ করি।
- যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তি মুসলিম হিসেবে বিবেচিত, ততক্ষণ তার প্রতি মুসলিম ভ্রাতৃত্বের সব অধিকার (সালাম, দেখা-সাক্ষাৎ, খাওয়া-দেওয়া, লেনদেন, জানাযা ইত্যাদি) বজায় থাকবে।
- যদি সে স্পষ্টভাবে কুফরী করে এবং তওবা না করে, তাহলে আলিমদের ফতোয়া অনুযায়ী তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখা ওয়াজিব। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়; তাই বিদ্যমান অবস্থায় তার সাথে সাধারণ মুসলিমের মতো আচরণ করাই উত্তম।
৪. নিজেকে উত্তম মনে করা
মুমিন অবশ্যই কাফের থেকে উত্তম, কারণ আল্লাহ বলেন: "তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানুষের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে..." (সূরা আলে ইমরান: ১১০)। তবে অহংকার ও আত্মশ্লাঘা নিষিদ্ধ। কেউ কুফরীতে লিপ্ত হলেও তাকে হেয় মনে করা জায়েয নয়; বরং নিজের ঈমানের শুকরিয়া করা এবং তার হেদায়েতের জন্য দোয়া করা উচিত। যদি ব্যক্তিটি এখনো মুসলিম গণ্য হয়, তবে তাকে 'কাফেরের মতো' ভেবে নিজেকে বড় মনে করা অন্যায়। বরং কেউ ঈমান নিয়ে সন্দেহে পড়লে তার প্রতি দয়া ও সহানুভূতি দেখানো জরুরি।
৫. উপদেশ
প্রশ্নকারী উল্লেখ করেছেন যে সাধারণ মানুষ তাকে তাকফির করতে পারে না—এটি সঠিক কথা। তাই বর্ণিত ব্যক্তির সাথে:
- ভালো আচরণ করা জরুরি।
- তাকে নরমভাবে বোঝানো, তার সন্দেহ দূর করার চেষ্টা করা।
- আলিমদের কাছে তার বিষয়ে ফতোয়া জানতে চাওয়া।
- তাকে তওবা ও ঈমান পুনরুদ্ধারের তাগিদ দেওয়া।
এবং নিজেকে তার চেয়ে উত্তম মনে করা থেকে বিরত থাকা, বরং নিজের ঈমান রক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা।
সারসংক্ষেপ: সন্দেহের কারণে তাকে কাফের বলা যাবে না। তাকে মুসলিম হিসেবেই গণ্য করতে হবে এবং তার সাথে সাধারণ মুসলিমদের মতো আচরণ করতে হবে। নিজেকে তার চেয়ে উত্তম মনে করা উচিত নয়; বরং তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (৪/২২৪) – কুফরী শব্দ উচ্চারণের হুকুম
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৫০-৪৫২) – তাকফিরের শর্ত
- ফাতাওয়া আলমগিরি (২/২৫৪) – মুসলিমের সাথে আচরণ
- সহিহ বুখারি (৬১০৩), সহিহ মুসলিম (৬০) – তাকফিরের সতর্কতা