ইসলামে নিজেকে অন্যের চেয়ে উত্তম ভাবার বিধান, বেনামাজি ও দুর্বল ঈমানের ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২. যদি কারো ঈমান নিয়ে সন্দেহ থাকে তবে
আমি কি নিজেকে তার চেয়ে উত্তম মনে করব?
৩. কঠিন সময়, খারাপ সময় এরকম শব্দ যদি যদি সময়কে গালি না দেওয়ার উদ্দেশ্যে বরং শুধু পরিস্থিতি বোঝাতে ব্যাবহার হয় তবে তা কি জায়েয?
Answer
প্রশ্ন:
- যদি কেউ বেনামাজি হয় তবে আমি কি নিজেকে তার চেয়ে উত্তম মনে করব?
- যদি কারো ঈমান নিয়ে সন্দেহ থাকে তবে আমি কি নিজেকে তার চেয়ে উত্তম মনে করব?
- কঠিন সময়, খারাপ সময় ইত্যাদি শব্দ যদি সময়কে গালি না দেওয়ার উদ্দেশ্যে বরং শুধু পরিস্থিতি বোঝাতে ব্যবহার হয় তবে তা কি জায়েয?
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين
১. বেনামাজি ব্যক্তিকে নিজের চেয়ে উত্তম মনে করার বিধান
ইসলামে নিজেকে অন্যের চেয়ে উত্তম মনে করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি যদি কোনো ব্যক্তি প্রকাশ্যে নামাজ না পড়ে, তবুও তার অন্তরের অবস্থা ও শেষ পরিণতি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান নেই। মহান আল্লাহ বলেন:
فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ
অর্থ: "তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না।" (সূরা আন-নাজম: ৩২)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেন:
لَا تَقُولُوا لِمَنْ أَظْهَرَ لَكُمْ إِيمَانًا: لَسْتَ مُؤْمِنًا
অর্থ: "যে ব্যক্তি তোমাদের সামনে ঈমান প্রকাশ করে, তাকে তুমি ‘তুমি মুমিন নও’ বলে না দাও।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ২৪৪৪)
যদি কেউ নামাজ না পড়ে, তবে তার জন্য দু‘আ করা উচিত, তাকে উপদেশ দেওয়া উচিত; কিন্তু নিজেকে তার চেয়ে উত্তম ভাবা অহংকারের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম আওযাঈ (রহ.) বলেছেন: "আমি যদি জানি যে, আমার একজনের জুতার ফিতা আল্লাহর কাছে আমার চেয়ে উত্তম, তবে আমি নিজেকে মন্দ বলি না।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫/৫২)
সুতরাং নিজেকে উত্তম মনে করা উচিত নয়। বরং নিজের শেষ পরিণতি নিয়ে ভীত থাকাই কর্তব্য।
২. ঈমান নিয়ে সন্দেহ থাকলে নিজেকে উত্তম ভাবার বিধান
কারো ঈমান নিয়ে সন্দেহ করাও জায়েয নয়, যতক্ষণ না স্পষ্ট কুফরি বা শিরকি কথা/কাজ প্রকাশ না পায়। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ
অর্থ: "হে ঈমানদারগণ, কোনো জাতি যেন অপর জাতিকে উপহাস না করে; কেননা তারা তাদের চেয়ে উত্তম হতে পারে।" (সূরা আল-হুজুরাত: ১১)
আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"মুসলিমের ব্যাপারে সুধারণা রাখা ওয়াজিব, আর মন্দ ধারণা করা হারাম।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৫)
অতএব, কারো ঈমান নিয়ে সন্দেহ করাও জায়েয নয়, আর নিজেকে তার চেয়ে উত্তম ভাবা তো আরও মারাত্মক। এটি বড় গুনাহ।
৩. "কঠিন সময়", "খারাপ সময়" ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারের বিধান
শরীয়তে সময়কে গালি দেওয়া (যেমন: সময় খারাপ, সময় অভিশপ্ত) নিষিদ্ধ, কারণ সময় আল্লাহর সৃষ্টি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:
لَا تَسُبُّوا الدَّهْرَ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الدَّهْرُ
অর্থ: "তোমরা সময়কে গালি দিও না, কেননা আল্লাহই সময় (তিনি সময়ের নিয়ন্ত্রক)।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৪৬)
তবে শুধু পরিস্থিতি বর্ণনা করতে "সময়টা কঠিন", "খারাপ সময় পার করছি" বলা জায়েয, যতক্ষণ তা অভিযোগ বা অভিশাপের নয়। যেমন রাসূল (ﷺ) নিজেও বলতেন: «نعوذ بالله من جهد البلاء» (আমরা কঠিন বিপদ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই)। (সহীহ বুখারী)
তবে সতর্ক থাকা উচিত যে, কথাটি যেন আল্লাহর ফয়সালার প্রতি অসন্তুষ্টির পর্যায়ে না যায়। শাইখুল ইসলাম মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন: "দৈনন্দিন দুঃখ-কষ্ট বর্ণনা করাতে দোষ নেই, কিন্তু ধৈর্যহীন হয়ে সময়কে মন্দ বলা বা 'আমার সময়ই খারাপ' বলা নাজায়েয।" (মা‘আরিফুল কুরআন, ৮/৭৯৬)
সারসংক্ষেপ:
-
বেনামাজি ব্যক্তির চেয়ে নিজেকে উত্তম ভাবার অনুমতি নেই। শেষ পর্যন্ত সেও আল্লাহর কাছে উত্তম মানুষ হতে পারে।
-
ঈমান নিয়ে সন্দেহ থাকলেও নিজেকে উত্তম ভাবা হারাম; বরং তার জন্য দু‘আ করুন।
-
"কঠিন সময়", "খারাপ সময়" — শুধু অবস্থা বোঝাতে ব্যবহার জায়েয, তবে সময়কে গালি দিলে হারাম।
উল্লিখিত কিতাব:
- সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম
- রদ্দুল মুহতার (১/৪০৫)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/৫২)
- মা‘আরিফুল কুরআন (৮/৭৯৬)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪১৫)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন।