হানাফি ফিকহ অনুযায়ী ওযু-গোসলের নিয়ত মুখে বলা ও কাবা শরীফের ছবির ঘরে পোশাক পাল্টানোর বিধান।
Taharah Purity · Hanafi
Question
যদি ঘরে ইসলামিক ক্যালিগ্ৰাফি বা কাবা শরীফের ছবি থাকে তবে সে ঘরে সবার অগোচরে কাপড় পাল্টানো,সতর খোলা রাখা বা কাপড় আঁটোসাঁটো অবস্থায় থাকা কি জায়েয?
Answer
উত্তর (Answer)
১. ওযু ও গোসলের নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা
প্রশ্ন: ফরজ গোসল বা ওযুর পূর্বে "আমি ওযু করছি" বা "আমি ফরজ গোসল আদায় করছি" বললে কি সুন্নত আদায় হবে?
উত্তর: না, এটি সুন্নত পদ্ধতি নয়। ইসলামী শরিয়তে ওযু ও গোসলের জন্য অন্তরে নিয়ত করা ফরজ বা ওয়াজিব, কিন্তু মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়। হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, ওযু ও গোসলের সময় মুখে নিয়ত বলা বিদআত বা গাইরে মাসনুন (অপ্রচলিত) বলে গণ্য। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, নিয়ত হলো অন্তরের ইচ্ছা, যা মুখে প্রকাশ করা আবশ্যক নয়। বরং চুপচাপ অন্তরে নিয়ত করাই সুন্নত ও সহজ পদ্ধতি।
- রেফারেন্স:
- ফতোয়া উসমানী (১/২৭৮): “ওযু ও গোসলের নিয়ত মুখে বলা সহিহ নয়; বরং অন্তরে নিয়ত করাই যথেষ্ট।”
- বাহেশতি জেওর (পৃষ্ঠা ৪৮, অধ্যায়: পবিত্রতা): “ওযুর সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলা সুন্নত, কিন্তু নিয়ত মুখে বলার কোনো প্রমাণ নেই।”
- রদ্দুল মুহতার (১/৮৯): “ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ওযু ও গোসলের জন্য মুখে নিয়ত জরুরি নয়।”
- ইমদাদুল ফতোয়া (১/১০২): “নিয়ত অন্তরের কাজ; মুখে বলা বিদআতের পর্যায়ে পড়ে।”
সারসংক্ষেপ: সুন্নত পদ্ধতি হলো—ওযু শুরু করার সময় অন্তরে নিয়ত করা (যেমন: "আমি নাপাকি দূর করার জন্য ওযু করছি") এবং গোসলের সময় অন্তরে নিয়ত করা (যেমন: "আমি ফরজ গোসল আদায় করছি")। মুখে উচ্চারণ না করলেই সুন্নত আদায় হবে।
২. ঘরে কাবা শরীফের ছবি বা ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি থাকলে সতর খোলা রাখা
প্রশ্ন: ঘরে কাবা শরীফের ছবি বা ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি থাকলে সেখানে সবার অগোচরে কাপড় পাল্টানো, সতর খোলা রাখা বা আঁটোসাঁটো কাপড় পরা জায়েজ কি?
উত্তর: ঘরে কাবা শরীফের ছবি বা পবিত্র স্থানের প্রতীক থাকলে সেখানে সতর খোলা রাখা বা অসম্মানজনক অবস্থান করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) বলে গণ্য। যদিও এটি সরাসরি হারাম নয়, তবে পবিত্র বস্তুর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য এড়িয়ে চলা উচিত।
-
কাপড় পাল্টানো বা সতর খোলা: যদি ঘরে কাবা শরীফের ছবি থাকে, তাহলে সেখানে সতর খোলা রাখা বা অগোচরে কাপড় পাল্টানো মাকরূহ। কারণ, এটি পবিত্র বস্তুর প্রতি অসম্মান প্রকাশ করে। তবে যদি ছবিটি শুধু শোভার জন্য হয় এবং কেউ তা অসম্মান করার ইচ্ছা না করে, তাহলে জায়েজ আছে, কিন্তু উত্তম হলো পর্দা করে বা অন্য ঘরে গিয়ে কাজ করা।
- রেফারেন্স:
- মা'আরিফুল কুরআন (সূরা আল-হাজর: ২১-২২): “পবিত্র বস্তুর সম্মান করা ঈমানের অংশ।”
- ফতোয়া উসমানী (২/৫২৮): “যে ঘরে কুরআন বা পবিত্র বস্তু থাকে, সেখানে অশ্লীলতা বা সতর খোলা রাখা মাকরূহ।”
- রদ্দুল মুহতার (১/৬৪৫): “পবিত্র বস্তুর সামনে নগ্নতা প্রকাশ করা অনুচিত।”
- রেফারেন্স:
-
আঁটোসাঁটো কাপড় পরা: কাপড় আঁটোসাঁটো হলে যদি সতর (শরীরের আবশ্যকীয় অংশ) চেপে ধরে এবং স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে, তাহলে তা মাকরূহ। তবে যদি কাপড় আঁটোসাঁটো হলেও সতর পুরোপুরি ঢাকা থাকে এবং শরীরের গঠন স্পষ্ট না হয়, তাহলে জায়েজ আছে। তবে উত্তম হলো ঢিলেঢালা পোশাক পরা।
- রেফারেন্স:
- বাহেশতি জেওর (পৃষ্ঠা ২৪, অধ্যায়: পোশাক): “পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আঁটোসাঁটো পোশাক পরা মাকরূহ, কারণ তা সতর প্রকাশ করে।”
- ইমদাদুল ফতোয়া (২/২১৪): “কাবা শরীফের ছবির সামনে অসম্মানজনক পোশাক পরা থেকে বিরত থাকা উচিত।”
- রেফারেন্স:
সারসংক্ষেপ:
- ঘরে কাবা শরীফের ছবি বা ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি থাকলে সেখানে সতর খোলা রাখা বা কাপড় পাল্টানো মাকরূহ। সম্মানার্থে অন্য ঘরে বা পর্দা দিয়ে কাজ করা উত্তম।
- আঁটোসাঁটো কাপড় পরা যদি সতর স্পষ্ট করে তবে মাকরূহ, নইলে জায়েজ। তবে ঢিলেঢালা পোশাক পরাই অধিক সুন্নত ও সম্মানজনক।
সতর্কতা: ঘরে কাবা শরীফের ছবি রাখা সম্পর্কে কোনো কোনো আলেম মাকরূহ বলেছেন যদি তাতে সম্মান বজায় না থাকে। উত্তম হলো, পবিত্র বস্তুর ছবি না রেখে ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে আল্লাহর নাম বা আয়াত লেখা রাখা, এবং সেগুলোর সম্মান রক্ষা করা।