গান শোনা এবং নাচা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।গান শোনো আনন্দ পেলে, নাচলে, অঙ্গ পতঙ্গ নাড়া চরা করলে কি কুফরি হবে?
Answer
উত্তর
প্রশ্ন:
১. গান শোনা কি কুফরি?
২. গান শোনো আনন্দ পেলে, নাচলে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়া চাড়া করলে কি কুফরি হবে?
উত্তর প্রদান
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলামের দৃষ্টিতে গান-বাদ্যযন্ত্র শোনা, নাচা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অশ্লীল নড়াচড়া করা গুনাহের কাজ (হারাম ও কবীরা গুনাহ)। তবে কুফরি (ঈমান থেকে বের করে দেওয়ার মতো অপরাধ) হওয়ার জন্য শুধু গুনাহ করাই যথেষ্ট নয়; বরং এর সাথে হালাল মনে করা, বিদ্রূপ করা, অথবা শরীয়তের কোনো অকাট্য বিধানকে অস্বীকার করার মতো মনোভাব জড়িত থাকতে হয়।
নীচে কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. গান শোনা কি কুফরি?
উত্তর: সাধারণভাবে গান শোনা কুফরি নয়। তবে এটি একটি ঘোর হারাম ও কবীরা গুনাহ। কুফরি তখনই হবে যখন কেউ গান শোনাকে হালাল ও বৈধ মনে করবে, অথবা গান শোনার মাধ্যমে শরীয়তের কোনো স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞাকে উপহাস করবে।
প্রমাণ ও ব্যাখ্যা:
-
কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا ۚ أُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ
“আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অবান্তর কথাবার্তা ক্রয় করে, যাতে জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে এবং তাকে ঠাট্টা-বিদ্রূপের বস্তু করে নেয়। তাদের জন্যই রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।”
(সূরা লুকমান: ৬)তাফসীরে ইবনে কাসীর, তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআনে উল্লেখ আছে যে, এখানে “লাহওয়াল হাদীস” বলতে গান-বাজনা ও অশ্লীল বিনোদনকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু আয়াতটি কুফর প্রমাণ করে না, বরং হারাম ও পথভ্রষ্টতা প্রমাণ করে।
-
হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ
“আমার উম্মতের মধ্যে এমন এক সম্প্রদায় আসবে, যারা জেনা (ব্যভিচার), রেশম (পুরুষের জন্য), মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল হিসেবে গ্রহণ করবে।”
(সহীহ বুখারী, ৫৫৯০)এ হাদীসে “হালাল মনে করা” কুফর বা গুরুতর পাপের পর্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু বাজনা বাজানো বা গান শোনা কুফর নয়; বরং একে জায়েয মনে করাই কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
-
ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী দামাত বরাকাতুহুম)-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে:
“গান-বাদ্য শোনা গুনাহে কবীরা। কিন্তু তা কুফরী নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত না কেউ হালাল মনে করে বা শরীয়তের উপর বিদ্রূপ করে।”
(ফাতাওয়া উসমানী, ৬/৫২১) -
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) এ এসেছে:
“যে ব্যক্তি গান-বাদ্যকে হালাল জানে এবং মদ্যপানকে হালাল জানতে থাকে, সে কাফির হয়ে যায়।”
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯২, কিতাবুল হুদুদ)
সারকথা:
- গান শোনা = গুনাহ (হারাম)
- গান শোনাকে হালাল বা বৈধ মনে করা = কুফরি হতে পারে
- গান শোনা ও নাচা - যদি না হালাল মনে করে এবং না শরীয়তকে মজা করে = কুফরি নয়, বরং বড় পাপ
২. গান শোনে আনন্দ পেলে, নাচলে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়া চাড়া করলে কি কুফরি হবে?
উত্তর: না, এতে কুফরি হয় না; বরং এটি গুনাহের কাজ। নিম্নোক্ত শর্ত ব্যতীত কুফরী সাব্যস্ত হবে না:
১. যদি কেউ মনে করে যে গান শোনা বা নাচা হালাল (অর্থাৎ আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশের বিপরীতে নিজের রায়কে প্রামাণ্য মনে করে)
২. যদি কেউ এ কাজ করে শরীয়তের বিধানকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করার জন্য
৩. যদি কারো বিশ্বাস হয় যে নাচ-গান ইবাদত বা সওয়াবের কাজ (যেমন কোনো ধর্মীয় গানের নামে অশ্লীলতা)
অন্যথায় শুধুমাত্র নফসের অনুসরণে গান শোনা ও নাচা গুনাহে কবীরা হলেও তা কুফর নয়।
প্রমাণ:
-
হাদীসে এসেছে:
يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ، تَصَدَّقْنَ، فَإِنِّي رَأَيْتُكُنَّ أَكْثَرَ أَهْلِ النَّارِ... قَالَتْ: يَا رَسُولَ اللهِ، فَمَا لَنَا أَكْثَرُ أَهْلِ النَّارِ؟ قَالَ: تُكْثِرْنَ اللَّعْنَ وَتَكْفُرْنَ الْعَشِيرَ
অর্থ: নবীজী ﷺ বলেছেন: “হে নারীগণ, তোমরা বেশি বেশি দান কর। কারণ আমি দেখেছি তোমরাই জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী।” তারা জিজ্ঞাসা করলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল, কেন আমরা জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী?’ তিনি বললেন: “তোমরা বেশি বেশি অভিশাপ কর এবং স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞ হও।”**
(সহীহ বুখারী, ৩০৪)এখানে নারীদের স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতাকে ‘কুফর’ (ছোট কুফর) বলা হয়েছে, কিন্তু তা ঈমানের বাইরে নিয়ে যায় না। তেমনি গান শোনা ও নাচাও গুনাহ ও কুফরে আমলী (ছোট কুফরী) হতে পারে, কিন্তু ঈমানী কুফর (মুরতাদ হওয়া) নয়।
-
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, গুনাহ করলে কুফর হয় না যতক্ষণ না কেউ হালাল মনে করে অথবা ফরয বা হারাম অস্বীকার করে। (আল-ফিকহুল আকবর)
হানাফী কিতাবের উদ্ধৃতি:
- রদ্দুল মুহতার: “গান-বাজনা ও নাচ-গান করা হারাম, কিন্তু কুফর নয়। কুফর তখন হয় যখন হালাল মনে করা হয়।” (৬/৩৯২)
- ফাতাওয়া আলমগীরী: “যে ব্যক্তি গান শুনতে ভালোবাসে এবং তাতে আনন্দ পায়, সে পাপী, কিন্তু কাফির নয়।” (৫/৩৫৮)
- ফাতাওয়া উসমানী: “নাচ-গান ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নড়াচড়া করা বড় পাপ, কিন্তু কুফর নয়। অনেকে ভুলে কুফরি ফতোয়া দিয়ে ফেলে, যা সঠিক নয়।” (৬/৫২২)
সতর্কবার্তা
উক্ত কাজগুলো কুফরি না হলেও ঘোর হারাম ও কবীরা গুনাহ। মুমিনের উচিত গান-বাজনা, নাচ-গান ও অশ্লীল বিনোদন থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা। তাওবা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং নেক আমল বৃদ্ধি করা জরুরি।
যদি কেউ এই পাপগুলো করে এবং তার অন্তরে লজ্জা ও অনুতাপ থাকে, তবে সে ঈমানদারই। তবে যদি গর্ব করে বা হালাল মনে করে তবে ঈমানের জন্য বিপদ।
মনে রাখবেন
- গান শোনার কারণে ঈমান চলে যায় না, কিন্তু গুনাহ হয়।
- নাচা বা অঙ্গ নড়ানোর কারণেও কুফর হয় না, কিন্তু পাপ বাড়ে।
- হালাল মনে করা বা ইসলামকে মজা করা ছাড়া কুফর সাব্যস্ত হয় না।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভুল-ত্রুটি থেকে হেফাজত করুন এবং সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।
ওয়াল্লাহু তা‘আলা আ‘লামু বিস্-সাওয়াব।