ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি নিঃস্ব অবস্থায় মারা গেলে করণীয়

Family Life · Hanafi

Question No: 1309
Questioner: Fifty Shades
Question Asked: 06 Jun 2026, 08:12 PM
Reviewed & Published: 06 Jun 2026, 08:31 PM
Views: 49
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার বাবা একদম নিঃস্ব অবস্থায় মারা গিয়েছেন। তার জমানো কোনো অর্থ-সম্পদ নেই। পৈতৃক সম্পত্তি আছে, কিন্তু তা আমার চাচারা আমাদের দেয়নি, এখন পর্যন্ত ভাগ বণ্টন করেনি, আমাদের ভাগ আমরা পাইনি। আমার মা খুব কষ্ট করে সংসার চালায়। আমি মেয়ে, বড় সন্তান। আমি এখনো উপার্জনক্ষম হইনি। আমরা কোনোভাবেই এই মুহূর্তে আমার বাবার কিছু ঋণ পরিশোধ করার অবস্থায় নেই। আমার বাবার সম্পত্তি থেকে ঋণ দিতে বলেছি আমার চাচাদের, কিন্তু তারা দিবে দিবে করেও দেয় না। আমার বাবার পরকালের অবস্থা নিয়ে আমরা খুব বিচলিত, আল্লাহর কাছে সবসময় দোয়া করি যাতে সব ঠিক হয়ে যায়, আল্লাহ যাতে দ্রুত একটা সমাধান করে দেন। এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় কি?

Answer

উত্তর

প্রশ্নটির মাধ্যমে আপনি আপনার মৃত বাবার ঋণ ও পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন। ইসলামী ফিকহের (হানাফী মাযহাব) আলোকে এর সমাধান নিচে দেওয়া হলো।


১. মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধের বিধান

  • ঋণ আদায় করা ফরজ: মৃত ব্যক্তির ঋণ তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে প্রথমে পরিশোধ করতে হবে। যদি কোনো সম্পদ না থাকে, তাহলে ওয়ারিশদের (উত্তরাধিকারীদের) উপর তা পরিশোধ করা ওয়াজিব নয়। তবে তারা যদি নিজেদের ইচ্ছায় তা পরিশোধ করে, তবে মৃত ব্যক্তি এর সওয়াব পাবে এবং তাদের জন্য নেকির কাজ হবে। (সূরা আল-বাকারা: ২৮০, রদ্দুল মুহতার: ৪/১৬৩)

  • আপনার দায়িত্ব: যেহেতু আপনার বাবার নিজস্ব কোনো সঞ্চিত সম্পদ নেই এবং পৈত্রিক সম্পত্তি এখনো আপনার হাতে আসেনি, তাই আপনারা (মা ও সন্তান) এখনই সেই ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য নন। আপনার বাবার পরকালীন অবস্থা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন নেই; আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকুন এবং নেক কাজের মাধ্যমে তার জন্য সওয়াব পাঠানোর চেষ্টা করুন।


২. পৈত্রিক সম্পত্তি ও বাবার প্রাপ্য অংশ

  • পৈত্রিক সম্পত্তি বাবার রেখে যাওয়া মালের অন্তর্ভুক্ত: আপনার বাবা যদি তার পিতার (আপনার দাদার) সম্পত্তি থেকে তার প্রাপ্য অংশ না পান, তবে তাঁর মৃত্যুর পর সেই অংশ তাঁর রেখে যাওয়া মাল হিসেবেই গণ্য হবে। আপনার চাচারা যেহেতু এখনো ভাগ-বণ্টন করেননি, তাই আপনার বাবার সেই প্রাপ্য অংশ তাঁর ঋণ পরিশোধের জন্য ব্যবহার করা জরুরি।

  • চাচাদের করণীয়: আপনার চাচারা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ভাগ-বণ্টন ও ঋণ পরিশোধে দেরি করেন, তবে তারা গুনাহগার হবেন। তারা ইসলামী আইন অনুযায়ী আপনার বাবার অংশ থেকে ঋণ পরিশোধ করে বাকি সম্পদ ওয়ারিশদের (আপনাদের) মধ্যে বণ্টন করতে বাধ্য। (আল-হেদায়া: ৪/৩৪৪, ফাতাওয়া উসমানী: ২/৪২৫)


৩. আপনার বর্তমান করণীয়

  • চাচাদের সাথে আলোচনা: আবারও তাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, আপনার বাবার ঋণ পরিশোধ করা ও সম্পদ বণ্টন করা একটি ফরজ ইবাদত। যদি তারা না মানেন, তবে স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম বা এলাকার সম্মানিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করুন।

  • আইনি সহায়তা: যদি পারিবারিক সমাধান সম্ভব না হয়, তাহলে আপনি বা আপনার মা ইসলামী শরিয়াহ আদালত বা সাধারণ আইনি আদালতে মামলা করতে পারেন। কারণ পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে আপনার প্রাপ্য অংশ আপনার বাবার ঋণ পরিশোধ ও আপনার ভরণপোষণের জন্যও জরুরি।

  • অস্থায়ী সমাধান: যদি চাচারা এখনো সম্পত্তি না দেয়, তবে আপনার মা তার প্রাপ্য অংশ (২৫%) দাবি করতে পারেন এবং সেটি দিয়ে পরিবারের সংসার চালাতে পারেন। আপনি যদি এখনো উপার্জনক্ষম না হন, তাহলে আপনার মায়ের উপর আপনার ভরণপোষণ ওয়াজিব।

  • দোয়া ও সদকা: আপনার বাবার জন্য নিয়মিত দোয়া করুন এবং তাঁর নামে সদকা দিন (যদি সক্ষম হন)। এতে আল্লাহ তাআলা তাঁর কবরের আজাব হালকা করে দেবেন। (সহীহ বুখারী: ২৪১৭)


৪. গুরুত্বপূর্ণ হাদীস

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"মুমিনের আত্মা তার ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত সাথে বন্দি থাকে (অর্থাৎ জান্নাতে যেতে বাধা পায়)।"
(তিরমিযী: ১০৭৮, ইবনে মাজাহ: ২৪১৩)

তবে এই হাদীসটি তখন প্রযোজ্য যখন ঋণ পরিশোধের মতো সম্পদ থাকে কিন্তু তা দেওয়া হয় না। আপনার ক্ষেত্রে সম্পদ না থাকায় বা দেরি হওয়ায় তাঁর অবস্থা আল্লাহর রহমতের ওপর নির্ভরশীল। আপনি বেশি বেশি ইস্তিগফারদান-সদকা করতে পারেন।


উপসংহার

  • আপনাদের কোনো গুনাহ নেই যদি এখন ঋণ পরিশোধ করতে না পারেন।
  • চাচাদের উপরই বর্তায় আপনার বাবার অংশ থেকে ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব। তারা তা করতে বাধ্য।
  • যদি তারা না দেয়, তাহলে আপনি উপায় হিসেবে শান্তিপূর্ণ আলোচনা ও আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন।
  • নিজেরা ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। আল্লাহ তায়ালা যেকোনো সমস্যার সমাধান দ্রুতই করে দেন। (সূরা আত-তালাক: ২-৩)

আল্লাহ তাআলা আপনাদের ধৈর্য দিন এবং আপনার বাবার পরকালীন অবস্থা ভালো করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.