মাজারভক্ত শাশুড়ির সাথে বসবাস করা কি জায়েজ?
Family Life · Hanafi
Question
তার কারনে আমরা একই বিল্ডিং এ আলাদা বাসা নেই। কিন্তু আমার স্বামি চায় আবার যেন একসাথে থাকি। এক্ষেত্রে আমার করনীয় কি?
Answer
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারিণীর শাশুড়ি মাজারপূজা, কুসংস্কার, ভন্ড পীরের দাওয়াত দেওয়া, গরুর মাংস না আনা ইত্যাদি শিরকি ও বিদ‘আতি কাজে লিপ্ত। তিনি পুত্রবধূকে সন্তান না হওয়া, সড়ক দুর্ঘটনার অভিশাপ দেন এবং তার চরিত্রে মিথ্যা অপবাদ দেন। বর্তমানে তারা আলাদা বাসায় থাকছেন, কিন্তু স্বামী চান আবার একই বাসায় থাকতে। এখন করণীয় কী?
মূল আলোচনা
১. শাশুড়ির কাজ-কর্মের শরয়ি মূল্যায়ন
শাশুড়ি মাজারপূজা, পীরের কাছে দাওয়াত দেওয়া, জুতা পরে ঘরে প্রবেশ না দেওয়া, গরুর মাংস না আনা—এসব শিরক, বিদ‘আত ও কুসংস্কার। কোরআন ও সুন্নায় শিরক ও বিদ‘আতের তীব্র নিন্দা এসেছে। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না।” (সূরা নিসা ৪:৪৮)
এমন মানুষদের সাথে সম্পর্ক রাখা ইসলাম সমর্থন করে না, তবে দাওয়াত ও সংশোধনের উদ্দেশ্যে সম্পর্ক রাখা উত্তম। কিন্তু যদি তারা নিজেদের বিদ‘আতে অটল থাকে এবং অন্যদেরকে ক্ষতি করে, তাহলে তাদের থেকে দূরে থাকা জরুরি।
২. শাশুড়ির অপবাদ ও অভিশাপ দেওয়া
শাশুড়ি মিথ্যা অপবাদ ও অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছেন—এটা ইসলামে হারাম ও কবিরা গুনাহ। আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا “যারা মুমিন পুরুষ ও নারীদেরকে (নির্দোষ অবস্থায়) কষ্ট দেয়, তারা নিশ্চয় মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য গুনাহ বয়ে নেয়।” (সূরা আহযাব ৩৩:৫৮)
ইমাম ইবনু আবিদিন (রহ.) বলেন, “যে ব্যক্তি অপরকে অভিশাপ দেয় বা অপবাদ দেয়, তার থেকে দূরে থাকা ওয়াজিব, যদি তা থেকে বাঁচার অন্য উপায় না থাকে।” (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪০৬)
৩. স্বামীর ইচ্ছা ও স্ত্রীর অধিকার
একসঙ্গে থাকলে স্ত্রী শাশুড়ির অভিশাপ, অপবাদ ও শিরকি পরিবেশের শিকার হবেন। ইসলাম স্ত্রীকে বিচ্ছিন্ন বাসস্থানের অধিকার দিয়েছে, যদি স্বামীর পরিবার থেকে ক্ষতি হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ “কোনো ক্ষতি করা যাবে না এবং কারো ক্ষতির বিনিময়ে ক্ষতি করা যাবে না।” (ইবনু মাজাহ ২৩৪১)
ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় বলা হয়েছে, “যদি স্বামীর পরিবার স্ত্রীকে কষ্ট দেয়, তাহলে স্ত্রী আলাদা থাকতে পারবে এবং স্বামীকে পৃথক বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৫২)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন, “স্ত্রীর জন্য জায়েজ নয় যে, যে ঘরে তার ধর্মীয় অনুশীলনে বিঘ্ন হয় বা যেখানে তাকে অপমান ও কষ্ট দেওয়া হয়, সেখানে থাকতে বাধ্য করা হয়।” (জাওয়াহিরুল ফিকহ, ২/৪১৪)
৪. শাশুড়ির প্রতি কী করা উচিত?
- দাওয়াত ও সংশোধন: সম্ভব হলে নরম ভাষায় শাশুড়িকে সঠিক ইসলাম বুঝান। তবে যদি তিনি অটল থাকেন এবং বিষয়টি ঝগড়ায় পর্যবসিত হয়, তবে দূরে থাকাই উত্তম।
- সম্মান ও সম্পর্ক রক্ষা: আলাদা বাসায় থেকেও দেখা-সাক্ষাৎ, ফোন, দোয়া ও প্রয়োজনীয় সাহায্য চালিয়ে যাওয়া যায়। একাধিকবার ফাতাওয়ায় বলা হয়েছে, “শাশুড়ি যদি হারাম কাজে লিপ্ত হয়, তবে পুত্রবধূর ওপর তার সংস্পর্শে থাকা জরুরি নয়।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/১৫৪)
৫. স্বামীর সঙ্গে আলোচনা
- স্বামীকে বোঝান যে, একসঙ্গে থাকলে স্ত্রী (প্রশ্নকারিণী) শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হবেন, যা ইসলামে হারাম।
- স্বামী তার মায়ের সন্তান, তাই তার প্রতি দায়িত্বশীল, তবে স্ত্রীর প্রতি জুলুম করা জায়েজ নয়।
- হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার স্ত্রীর প্রতি সর্বোত্তম।” (তিরমিজি ৩৮৯৫)
৬. করণীয় কী? (সারসংক্ষেপ)
- একসঙ্গে না থাকা: বর্তমানে যে আলাদা বাসায় থাকছেন, সেটিই উত্তম। স্বামীকে বোঝান যে, শাশুড়ির অপবাদ ও শিরকি পরিবেশ বরদাশত করা সম্ভব নয়।
- সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করে সীমিত যোগাযোগ: প্রয়োজনে ফোনে খোঁজখবর রাখুন, দোয়া করুন। কিন্তু এমন জায়গায় থাকা জায়েজ নয় যেখানে আপনার ধর্ম ও ইজ্জত বিপন্ন হয়।
- স্বামীকে দ্বীনি পরামর্শ: কোনো আলেমের মাধ্যমে স্বামীকে বোঝানোর ব্যবস্থা করুন।
- ধৈর্য ও দোয়া: আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন এবং শাশুড়ির হেদায়েতের জন্য দোয়া করতে থাকুন।
উল্লেখযোগ্য ফাতাওয়া
- ফাতাওয়া উসমানি (১/৪১৯) : “যদি স্বামীর পরিবারের লোকেরা স্ত্রীকে ধর্মীয়ভাবে বিভ্রান্ত করে বা কষ্ট দেয়, তাহলে স্ত্রীর জন্য পৃথক থাকা জায়েজ।”
- বাহিশতি জেওয়ার (আধুনিক সংস্করণ) : “কুসংস্কার ও শিরকে লিপ্ত ব্যক্তির সাথে বসবাস করা জায়েজ নয়, যদি তা নিজের ঈমানের জন্য ক্ষতিকর হয়।”
চূড়ান্ত উত্তর
প্রশ্নকারিণীর জন্য একসঙ্গে থাকা জায়েজ নয়, বরং বর্তমান অবস্থায় আলাদা বাসায় থাকাই উত্তম। স্বামীকে বোঝাতে হবে যে, এটি স্ত্রীর প্রতি জুলুম এবং ধর্মীয় কর্তব্য পালনে বাধা। তবে সম্পর্ক ছিন্ন না করে মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব পালনের বিকল্প পথ বের করতে হবে (যেমন নিয়মিত দেখা, ডাক দেওয়া, প্রয়োজনে সাহায্য করা)।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ধৈর্য দিন এবং আপনার স্বামীকে সঠিক পথ বুঝার তওফিক দিন। (আমিন)