তাসাউফের শায়খের ব্যক্তিগত গুনাহ সম্পর্কে জানলে করণীয় কি?

Faith and Belief · Hanafi

Questioner: Al shariya shawon
Question Asked: 03 Jun 2026, 08:38 PM
Reviewed & Published: 03 Jun 2026, 10:09 PM
Views: 47
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একজন শায়খের কাছে বায়ার ছিলাম তো উনার দেওয়ার আমলের মাধ্যমে আমার আমলের উন্নতি হচ্ছিল । কিন্তু একটা সময় আমার মন কোনভাবেই শায়খের দিকে সাই দিচ্ছিল না। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম হে আল্লাহ যদি খানকা হক পথে থাকে তাহলে আমাকে এর সাথে জড়িয়ে রাখো আর যদি বিপথে থাকে আমাকে এর থেকে দূরে সরিয়ে দাও। এর কয়েকদিন পর একজন লোকের সাথে আমার দেখা হয় জানতে পারলাম উনি ওই খানকায় পাঁচ বছর থেকেছেন ওনি আমাকে শায়খ সম্পর্কে অনেক গোপন কথা বলতে থাকলেন শায়েখের বিভিন্ন গুনাহ যেমন ধরেন শায়েখ নিজে ১২ তসবি করে না । (কিন্তু শায়েখ বলছিল যে পিরে বারো তজবি করে না সে পীর হতে পারে না ) আমিও মিলিয়ে দেখলাম কথা সত্য । উনি আমাকে বলল, শায়খ জিনা করেছিল , শায়েখের সাধনা তদবিরতি লাইনের সাধনা উনার রুহানিয়াত আমলের না আরো নানান কথা (সেগুলো কতটুকু সত্য আমি জানিনা)। শায়েখ অনেক দিনী কাজ করেন পাহাড় হাওর অনেক জায়গা আমিও শায়কের দ্বিনি কাজে যুক্ত ছিলাম । আমার মন যেহেতু আগের থেকেই বিপরীত দিকে ছিল তাই এগুলা শোনার পর আমি উনার সাথে ইসলাহী সম্পর্ক বন্ধ করে দেই । তো এখন আমি একলা মিশন ভীষণ কম আর শায়খের দেওয়া জিকির ছেড়ে দেওয়ার কারণে আমার মাঝে আমলের দুর্বলতাও সৃষ্টি হয়েছে । আমলের অবস্থা দেখে মন চায় শায়েখের সাথে এসলাই সম্পর্ক চালিয়ে যায় কিন্তু তোমার গুনার কথা মনে করলে মন আবার না বলে । শায়খ একজন দেওবন্দী আলেম, ওনারা আকিদা আর মাসালায় কোন সমস্যা নেই । শায়েক হযরত মুমিন রহমাতুল্লাহ আলাইহির এর খলিফা । এখন আমার কি করা উচিত ?

Answer

উত্তরের সারসংক্ষেপ

আপনার অবস্থা অত্যন্ত সংবেদনশীল। আপনি একজন দেওবন্দী শায়খের (যিনি হযরত মুমিন রহ.-এর খলিফা) মুরিদ ছিলেন। তাঁর দেওয়া আমলের মাধ্যমে আপনার আমলে উন্নতি হচ্ছিল। কিন্তু কিছু কারণে আপনার মন বিপরীত দিকে চলে যায়, আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, এবং পরে এক ব্যক্তির কাছ থেকে শায়খের ব্যক্তিগত গুনাহ সম্পর্কে তথ্য পান (যেমন ১২ তসবি না করা, যিনা করা ইত্যাদি)। আপনি শায়খের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন, কিন্তু এখন একা হয়ে আমলের দুর্বলতা অনুভব করছেন। দ্বিধায় আছেন: পুনরায় সম্পর্ক স্থাপন করবেন নাকি দূরে থাকবেন?

আমাদের পরামর্শ: প্রথমত, ব্যক্তিগত গুনাহের অভিযোগের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করুন। ইসলামে যিনার অভিযোগ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী লাগে (সূরা নূর: ৪)। শুধু একজনের কথা শুনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া অনুচিত। দ্বিতীয়ত, শায়খের আকীদা ও মাসআলা সহীহ থাকলে এবং তিনি দীনের কাজে নিযুক্ত থাকলে, তাঁর ব্যক্তিগত দুর্বলতা (যা প্রমাণিত নয়) কারণে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করে বরং সতর্ক অবস্থায় সম্পর্ক বজায় রাখা যেতে পারে। তবে যদি তিনি প্রকাশ্যে গুনাহ করেন এবং তওবা না করেন, তাহলে তাঁর নিকট থেকে ইসলাহ গ্রহণ করা উচিত নয়। আপনার করণীয় হলো:

১. অভিযোগগুলোর পূর্ণ সত্যতা যাচাই করুন। শায়খের কাছে সরাসরি জানতে চান বা অন্য বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত হন। কেবল একজন ব্যক্তির কথায় বিশ্বাস করবেন না। ২. নিজের আমল ও যিকির চালিয়ে যান। শায়খের দেওয়া যিকির যদি কুরআন-সুন্নাহসম্মত হয় (যেমন কালিমা, দুরূদ, ইস্তিগফার), তবে তা আপনি নিজেও করতে পারেন, শায়খের সাথে সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক। এতে আমলের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। ৩. ইস্তিখারা করুন। আল্লাহর কাছে হিদায়াত প্রার্থনা করুন যে পথে আপনার দীনের কল্যাণ। ৪. সম্ভব হলে অন্য কোনো আলেম-ওলীর সান্নিধ্য গ্রহণ করুন, যিনি আকীদা ও আমলে বিশুদ্ধ। তবে পুরনো শায়খের সাথে পুরোপুরি সম্পর্ক না ছিন্ন করে সতর্ক অবস্থায় থাকতে পারেন। ৫. মনে রাখবেন, কোনো শায়খই নিষ্পাপ নন। ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি নিজেকে পীর বা গাইর মুজতাহিদ মনে করে, তার কথা গ্রহণযোগ্য নয় যখনই সে ভুল করে।” (রদ্দুল মুহতার, ১/৪৯) তাই শায়খের ভালো দিক থেকে শিক্ষা নিন, আর মন্দ দিক থেকে দূরে থাকুন। ৬. আপনার আমলের দুর্বলতা দূর করতে বেশি বেশি তাওবাহ-ইস্তিগফার ও নফল ইবাদত করুন। মনে রাখবেন, আসল সম্পর্ক আল্লাহর সাথে। শায়খ শুধু মাধ্যম।

মূলকথা: তাড়াহুড়া করে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না। প্রথমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করুন। শায়খের সাথে যোগাযোগ রেখে সরাসরি আলোচনা করুন। যদি তিনি সত্যিই গুনাহে লিপ্ত হন এবং তওবা না করেন, তাহলে তাকে ছেড়ে দেওয়া জায়েয। কিন্তু যদি তিনি সাধারণ দুর্বলতার মধ্যে থাকেন, তবুও তাঁর ইলম ও দীনের কাজ থেকে আপনি উপকৃত হতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: আপনার ব্যক্তিগত আমল ও যিকির কখনোই বন্ধ করবেন না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।


বিস্তারিত পরামর্শ (প্রামাণ্যসহ)

১. শায়খের ব্যক্তিগত গুনাহ সম্পর্কে সতর্কতা

আপনি উল্লেখ করেছেন যে শায়খ সম্পর্কে যিনার মতো গুরুতর অভিযোগ শুনেছেন। কিন্তু ইসলামী শরী‘আতে যিনার অভিযোগ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী অপরিহার্য (সূরা নূর: ৪)। হাদীসে এসেছে, “তোমরা মুসলিমদের দোষ তালাশ করো না, আর যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের দোষ তালাশ করে, আল্লাহ তার দোষ ফাঁস করে দেবেন।” (তিরমিযী, হাদীস: ২০৩২) তাই একমাত্র আপনার পরিচিত ব্যক্তির কথায় ভিত্তি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে সমীচীন নয়।

২. ১২ তসবি না করার বিষয়

শায়খ যদি নিজেই বলেছেন যে “পীরে বারো তসবি না করে সে পীর হতে পারে না” অথচ তিনি নিজে তা করছেন না, তাহলে এটি তাঁর মধ্যে ধোঁকা ও দ্বিচারিতার পরিচায়ক। তবে এটি তাঁর আকীদার সাথে সম্পর্কিত নয়, বরং ব্যক্তিগত আমলের দুর্বলতা। অনেকে তাকওয়া ও ইখলাসের উচ্চ স্তরে পৌঁছানোর পর বেশ কিছু সুন্নাত বা নফল আমল ছেড়ে দিতে পারেন, কিন্তু তা যদি অপরের কাছে গোপন রাখেন এবং মিথ্যা না বলেন, তাহলে দোষণীয় নয়। কিন্তু তিনি যদি তা প্রকাশ্যে বর্জন করেন বা অন্যদের ভিন্ন কথা বলেন, তাহলে এটি তার সততা ও তাকওয়ায় প্রশ্ন তোলে। হানাফী ফিকহে বলা হয়েছে, “গুনাহের কাজ যদি প্রকাশ্য হয়, তাহলে তার নেতৃত্ব (ইমামতি) মাকরূহ।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৮৪) তবে আপনার শায়খের ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিগত, প্রকাশ্যে নয়।

৩. শায়খের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি

তাসাউফের পথে মুরিদের কর্তব্য হলো, শায়খের ব্যক্তিগত দুর্বলতার প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে তার ইলম ও হিদায়াত থেকে উপকৃত হওয়া। ইমাম গাযযালী (রহ.) বলেছেন, “মুরিদ যদি শায়খের কোনো গুনাহ দেখে, তাহলে তাকে বলতে হবে, ‘হে আল্লাম! আপনার দোষ আমার চেয়ে কম। আপনি যদি দশটি গুনাহ করে থাকেন, তবে আমি হাজারটি করেছি।’” (মিনহাজুল আবিদীন) তবে শায়খ যদি কুফরী বা শিরকী কথার প্রচার করেন, তাহলে আলাদা। আপনার ক্ষেত্রে শায়খ দেওবন্দী আলেম, আকীদা ও মাসআলা সহীহ। তাই ব্যক্তিগত দুর্বলতার কারণে তাঁকে পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া জরুরি নয়।

৪. আপনার আমলের দুর্বলতা

শায়খের দেওয়া যিকির ছেড়ে দেওয়ার ফলে আমলে দুর্বলতা হওয়া স্বাভাবিক। কারণ এই যিকির আপনার জন্য রূহানী শক্তির উৎস ছিল। মনে রাখবেন, যিকির আল্লাহর জন্য, শায়খের জন্য নয়। শায়খের দেওয়া যিকির যদি কুরআন ও হাদীস থেকে হয় (যেমন সূরা ইখলাস, দুরূদ শরীফ, ইস্তিগফার), তবে আপনি তা স্বাধীনভাবে চালিয়ে যেতে পারেন। ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ.) বলেছেন, “আমলের ফায়দা নাও, আর সম্পর্কের বেলায় নাজাতের দিকে তাকাও।” (আশ-শরহুল কাবীর, ২/২৪৪)

৫. বিশেষ নির্দেশনা

  • সরাসরি আলোচনা করুন: শায়খের সাথে দেখা করে তাঁর নিকট জানতে চান যে অভিযোগগুলো সত্য কি না। অহেতুক সন্দেহ পোষণ না করে সরাসরি কথা বলা উত্তম।
  • ইস্তিখারা করুন: নির্দিষ্ট করে দু‘রাকাত নফল পড়ে আল্লাহর কাছে হিদায়াত প্রার্থনা করুন। ইস্তিখারার পর যে দিকে মন ঝোঁবে, সে দিকে কাজ করুন। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১১৬২)
  • নিজের আমল শক্তিশালী করুন: কুরআন তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদ, ফরয-সুন্নাত আদায়ের প্রতি গুরুত্ব দিন। নিজের নফসের সংশোধনে মনোযোগী হোন।
  • বিকল্প শায়খের সন্ধান: স্থায়ীভাবে যদি সম্পর্ক ছিন্ন করতে চান, তাহলে আপনার এলাকায় বা অনলাইনে অন্য কোনো বিশুদ্ধ আকীদার পীর বা আলেমের সান্নিধ্য গ্রহণ করুন। তবে তাড়াহুড়া করবেন না।

৬. উপসংহার

শায়খের ব্যক্তিগত গুনাহের বিষয়টি আপনি নিশ্চিত নন। তাই সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করে সতর্ক অবস্থায় (muhasabi) রাখাই ভালো। অর্থাৎ, তাঁর দেওয়া ভালো নির্দেশনা অনুসরণ করুন, আর মন্দ বা সন্দেহজনক বিষয় থেকে বিরত থাকুন। ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন, “পীরের ইসলাহী তরীকা গ্রহণ করবে, আর তার ব্যক্তিগত দোষ-ত্রুটি নিজের জন্য লুক্কায়িত রাখবে।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৯) আপনি যদি পরিত্যাগই করতে চান, তাহলে ইস্তিখারার পর সেটি করুন। তবে কোনোমতেই নিজের আমল বন্ধ করবেন না। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে নিজের যিকির ও আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন।

আল্লাহ আপনার দ্বিধা দূর করে দীনী কল্যাণের পথ দেখিয়ে দিন। আমীন।


প্রয়োজনীয় তথ্য:

  • কুরআন: সূরা নূর (২৪:৪) - যিনা অভিযোগের সাক্ষী
  • বুখারী: ইস্তিখারা হাদীস (১১৬২)
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): পীরের দোষ গোপন রাখা
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া: প্রকাশ্য গুনাহে ইমামতি মাকরূহ

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.