তাকাফুল ইসলামী ইন্সুরেন্স কি জায়েয?
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: তাকাফুল ইসলামী ইন্সুরেন্স কি জায়েয?
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين
তাকাফুল (التكافل) হলো একটি ইসলামী বীমা ব্যবস্থা, যা পারস্পরিক সহযোগিতা ও দানের (تبرع) নীতির উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। প্রচলিত সূদী বা কনভেনশনাল ইন্সুরেন্সের বিকল্প হিসেবে এটি প্রস্তাবিত হয়েছে। ইসলামী শরী‘আহর দৃষ্টিতে প্রচলিত বীমা হারাম, কারণ এতে রয়েছে গারার (অনিশ্চয়তা), রিবা (সুদ) ও কিমার (জুয়া)। অপরদিকে তাকাফুলকে শরী‘আহসম্মত বলে গণ্য করা হয়, যদি তা নিম্নোক্ত শর্ত পূরণ করে:
১. এটি তাবাররু‘ (দান) বা মুদারাবা/ওয়াকালাহ ভিত্তিক একটি সমবায় (Cooperative) ব্যবস্থা হয়।
২. তহবিলে জমাকৃত অর্থ সুদমুক্ত রাখা হয়।
৩. বিনিয়োগও সম্পূর্ণ শরী‘আহসম্মত খাতে হয়।
৪. কোনো প্রকার জুয়া বা অপ্রয়োজনীয় অনিশ্চয়তা না থাকে।
৫. উদ্বৃত্ত অর্থ পলিসিধারীদের মধ্যে ন্যায্যভাবে বণ্টন করা হয়।
হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথমত: প্রচলিত ইন্সুরেন্সের অসম্মতি
ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ গ্রন্থে গারার ও রিবাযুক্ত লেনদেনকে হারাম বলেছেন। প্রচলিত ইন্সুরেন্সে বীমাকারী ও বীমাকৃতের মধ্যে যে চুক্তি হয়, তাতে প্রিমিয়াম ও ক্ষতিপূরণের মধ্যে সুস্পষ্ট অসাম্য (গারার) এবং প্রিমিয়ামের টাকা সুদী বিনিয়োগ (রিবা) দেখা যায়। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে এরূপ লেনদেন জায়েয নয়।
দ্বিতীয়ত: তাকাফুলের বৈধতা
মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর বিখ্যাত কিতাব “ফাতাওয়া উসমানী” (খণ্ড ২-এর বীমা অধ্যায়) এবং “ইসলাম ও আধুনিক অর্থনীতি” গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে তাকাফুল একটি শরী‘আহসম্মত বিকল্প। তিনি বলেন:
“পারস্পরিক সহযোগিতা ও তাবাররু‘র ভিত্তিতে পরিচালিত তাকাফুল প্রতিষ্ঠানটি যদি সুদ ও গারার থেকে মুক্ত থাকে, তাহলে তা জায়েয। বর্তমান যুগে ইসলামী ব্যাংক ও তাকাফুল কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।”
(ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২৫-৪২৬; ইদারা মা‘আরিফ, করাচী)
মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রহ.) ‘মা‘আরিফুল কুরআন’ (সূরা আল-ইমরান ১৩০-এর তফসীরে) সূদ ও জুয়া নিষিদ্ধ করে বলেছেন, যে ব্যবস্থা এসব থেকে মুক্ত হবে সেটিই গ্রহণযোগ্য। তিনি সমবায় (Cooperative) বীমা সম্পর্কে ইতিবাচক মত দিয়েছেন।
ইমদাদুল ফাতাওয়া-এ হাকীমুল উম্মাত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) প্রচলিত বীমাকে গারার ও রিবার কারণে নাজায়েয বললেও তিনি তাবাররু‘ভিত্তিক সমবায় ব্যবস্থাকে জায়েয বলেছেন। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৩/৫২২)
কুরআন-হাদীসের দলীল
কুরআন মাজীদ:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পর সাহায্য করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অপরকে সাহায্য করো না।”
(সূরা আল-মায়িদা, ৫:২)
তাকাফুল এই আয়াতের নির্দেশিত “সৎকর্মে সহযোগিতা”-র একটি আধুনিক রূপ।
হাদীস শরীফ:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا»
“মুমিন মুমিনের জন্য একটি ইমারতের মতো, যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে।”
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ২৪৪৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৮৫)
তাকাফুল এই পারস্পরিক শক্তিবৃদ্ধির নীতিরই বাস্তবায়ন।
হানাফী কিচ্ছাসমূহ থেকে আরও রেফারেন্স
- ফাতাওয়া আলমগীরী (হিন্দিয়া): পুঁজি হারানোর ঝুঁকি থেকে বাঁচার জন্য সমবায় চুক্তিকে জায়েয বলা হয়েছে, তবে শর্তহীন গ্যারান্টি নাজায়েয। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৪/৩৭২)
- শরহু মা‘আনিল আসার (ইমাম তাহাবী রহ.): গারার ও রিবা থেকে মুক্ত চুক্তির বৈধতার নীতি নির্ধারিত আছে।
- উসুলুশ শাশী: “মাসলাহাত” ও “ইজমা”র আলোকে তাবাররু‘ভিত্তিক সমবায় চুক্তি ইসলামী নীতিসম্মত।
সমসাময়িক হানাফী উলামা ও ফাতাওয়া
- মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম): তাকাফুল বৈধ, তবে প্রকৃত ইসলামী বীমা নিশ্চিত করতে হবে। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৩০)
- মুফতী আব্দুল্লাহ মাসুম (বাংলাদেশ): “তাকাফুল ইসলামী ইন্সুরেন্স শরী‘আহসম্মত উপায়ে পরিচালিত হলে জায়েয।” (দারুল উলুম দেওবন্দের ফতওয়া বিভাগের ফতওয়া, নং: ২৭৩১)
- ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের শরী‘আহ কাউন্সিল তাকাফুল পলিসিকে অনুমোদন দিয়েছে।
সতর্কতা ও শর্তাবলী
তাকাফুল কোম্পানি নির্বাচনের সময় নিম্নের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে:
- কোম্পানিটি কোনো শরী‘আহ বোর্ড দ্বারা তত্ত্বাবধানে আছে কিনা।
- তহবিলের টাকা সুদী বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয় কিনা।
- চুক্তিটি সম্পূর্ণ তাবাররু‘ (দান) ভিত্তিক এবং মুনাফা-লোকসান বণ্টনের নিয়ম স্বচ্ছ কিনা।
- পলিসিতে কোনো ধরনের জুয়া বা অস্পষ্ট শর্ত নেই কিনা।
চূড়ান্ত ফয়সালা
তাকাফুল ইসলামী ইন্সুরেন্স, যদি উপরোক্ত শর্তাবলী ও ইসলামী শরী‘আহের নীতি অনুসারে পরিচালিত হয়, তবে তা জায়েয এবং বৈধ। প্রচলিত সূদী ইন্সুরেন্সের মতো এটি হারাম নয়। বরং এটি তাবাররু‘ ও পারস্পরিক সহযোগিতার একটি পুণ্যময় ব্যবস্থা। তবে যে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির ব্যাপারে ফতওয়া নেওয়ার পূর্বে তার কার্যক্রম সম্পর্কে সুশৃঙ্খলভাবে জানতে হবে এবং সঙ্গত শরী‘আহ বোর্ডের অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে।
والله أعلم بالصواب