স্বামী একসঙ্গে তিন তালাক দিয়েছে। এক্ষেত্রে সে কি স্ত্রীর প্রতি জুলুমকারী নয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনায় স্বামী ও তার পরিবার স্ত্রীর প্রতি স্পষ্ট জুলুম (অত্যাচার) করেছে। ইসলামে স্ত্রীর প্রতি ইনসাফ, সম্মান ও সহানুভূতি অত্যাবশ্যক। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে প্রমাণসহ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. কুরআনের বিধান
-
সূরা নিসা (৪:১৯):
"وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ"
অর্থ: "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সৎ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে জীবনযাপন করো।"
এখানে স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া এবং সালিশ ছাড়া তালাক দেওয়া ‘মা’রুফ’-এর সম্পূর্ণ বিপরীত, যা জুলুম। -
সূরা বাকারা (২:২২৯):
"فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ"
অর্থ: "তাহলে হয় ন্যায়সঙ্গতভাবে স্ত্রীকে রাখবে, নয়তো সদয়ভাবে ছেড়ে দেবে।"
রাগের মাথায় পরিবারের চক্রান্তে স্ত্রীকে জোর করে বাপের বাড়ি পাঠানো এবং সালিশ ছাড়া তিন তালাক দেওয়া ‘ইহসান’ (সদয়তা)-এর পরিপন্থী, বরং এটি জুলুম।
২. হাদিসের নির্দেশনা
-
তিরমিজি, হাদিস ১১৬২:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:"خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي"
অর্থ: "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর জন্য সর্বোত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের জন্য সর্বোত্তম।"
স্বামীর পরিবারের চক্রান্তে স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া ও সালিশ না করে তালাক দেওয়া ‘খায়র’ (উত্তম) নয়, বরং জুলুম। -
আবু দাউদ, হাদিস ২২২০:
নবী (সা.) বলেছেন:"إِنَّمَا الطَّلَاقُ لِمَنْ أَخَذَ بِالسُّنَّةِ"
অর্থ: "তালাক শুধু সেই ব্যক্তির জন্য যে সুন্নাহ অনুযায়ী তালাক দেয়।"
সুন্নাহ অনুযায়ী তালাক দিতে হয় পবিত্র অবস্থায়, সহবাস ছাড়া, এবং দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে। এখানে রাগের মাথায়, সালিশ ছাড়া, স্ত্রীকে অবগত না করে দেওয়া তালাক সুন্নাহ-বিরোধী এবং জুলুম।
৩. হানাফি ফিকহের রেফারেন্স
-
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন):
তালাকের ক্ষেত্রে ইনসাফ ও সঠিক পদ্ধতি পালন করা ওয়াজিব। স্ত্রীকে বাড়ি থেকে জোর করে বের করে দেওয়া ‘তালাক-ই-বিদ’আহ’-এর অন্তর্ভুক্ত, যা গুনাহ। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২২৪) -
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি, ৪/৪৫৬):
যদি স্বামী পরিবারের চক্রান্তে বা রাগের মাথায় তালাক দেয়, তবে তালাক সংঘটিত হলেও তিনি গুনাহগার হবেন এবং স্ত্রীর প্রতি জুলুমকারী গণ্য হবেন। বিশেষ করে যখন স্ত্রীকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি এবং সালিশের কোনো প্রচেষ্টা নেই, এটি স্পষ্ট জুলুম। -
ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি, ২/৩২২):
স্ত্রীকে বিনা কারণে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া এবং তালাকের আগে সালিশ না করা শরিয়তের নীতি লঙ্ঘন করে। এতে স্বামী ও তার পরিবার উভয়ই জুলুমের ভাগীদার হয়।
৪. জুলুমের প্রমাণ
- স্ত্রীকে কোনো নোটিশ বা আলোচনা ছাড়া বাপের বাড়ি যেতে বাধ্য করা তার অধিকার হরণ।
- পরিবারের চক্রান্তে তালাক দেওয়া ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। কুরআনে বলা হয়েছে:
"وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا" (সূরা নিসা, ৪:৩৫)
অর্থ: "যদি তোমরা তাদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদের আশঙ্কা করো, তাহলে তার পরিবার থেকে একজন সালিশ এবং তার পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত করো।"
এখানে কোনো সালিশ ছাড়া সরাসরি তালাক দেওয়া এই আয়াতের বিপরীত।
৫. মেয়েটির প্রতি জুলুমের সুস্পষ্ট দিক
- তাকে অজ্ঞাত ও অসহায় অবস্থায় তালাক দেওয়া মানসিক নির্যাতন।
- স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া তার নিরাপত্তা ও সম্মানহানি।
- পরিবারের চক্রান্ত এক ধরনের সামাজিক অত্যাচার।
সারসংক্ষেপ:
স্বামী ও তার পরিবার স্ত্রীকে কোনো তথ্য না দিয়ে, রাগের মাথায়, পরিবারের চক্রান্তে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে সালিশ ছাড়া তিন তালাক দেওয়া স্পষ্ট জুলুম। ইসলামে এর কঠোর নিন্দা জানানো হয়েছে। স্বামী ও তার পরিবার উভয়েরই তওবা করা ও মেয়েটির প্রতি ন্যায্যতা প্রদান করা আবশ্যক। তালাকটি সুন্নাহ অনুযায়ী না হওয়ায় তা গুনাহের কাজ হলেও বিরোধিতার পরিস্থিতিতে তা কার্যকর বিবেচিত হবে—তবে জুলুমের গুনাহ থেকে গেল।
আল্লাহ তাআলা সকলকে ইনসাফ ও সহানুভূতির পথে চলার তৌফিক দিন।