স্ত্রী কি তার স্বামী থেকে প্রাপ্ত অংশ সৎ সন্তান ( উক্ত স্বামীর অন্য স্ত্রীর সন্তান) ব্যতিত অন্যর কাছে বিক্রি করতে পারবে?
Family Life · Hanafi
Question
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, স্ত্রী স্বামী মারা যাওয়ার পরে যে সম্পত্তি পাবে তা কি সে নিজে বিক্রি করে দিতে পারবে অন্য কারো কাছে? যদি তার নিজের সন্তান না থাকে? কিন্তু সেই স্বামীর সংসারেই সৎ ছেলে আছে তাকে না দিয়ে কি অন্য কারো কাছে বিক্রি করা জায়েজ? সৎ ছেলে যদি খোঁজ না নেয় তাও কি বিক্রি করা যাবে? আর বিক্রি করলেও কি বাইরের কারো কাছে বিক্রি করা যাবে? নাকি সেই সৎ ছেলে কিনতে চাইলে তাকেই বিক্রি করতে হবে??
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটির প্রেক্ষাপটে বুঝা যাচ্ছে যে, একজন মহিলা তার স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর সম্পত্তি থেকে কিছু অংশ পেয়েছেন (উত্তরাধিকার সূত্রে)। স্বামীর পূর্বের সংসার থেকে একটি সৎ ছেলে আছে (অর্থাৎ স্বামীর নিজ পুত্র) এবং মহিলার নিজের কোনো সন্তান নেই। এখন তিনি প্রশ্ন করছেন—তিনি কি তার প্রাপ্ত সম্পত্তি অন্য কারো কাছে বিক্রি করতে পারবেন? বিশেষ করে, সৎ ছেলেকে না দিয়ে কি বাইরের কাউকে বিক্রি করা জায়েজ? আর সৎ ছেলে যদি খোঁজ না নেয়, তাহলেও কি বিক্রি করা যাবে?
প্রথমত: সম্পত্তির মালিকানা বুঝতে হবে
স্বামীর মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি সব ওয়ারিসদের মধ্যে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বণ্টিত হয়। এখানে ওয়ারিসরা হলেন:
- স্ত্রী (আপনি) – আপনার প্রাপ্ত অংশ হবে ৮ ভাগের ১ভাগ (যদি স্বামীর সন্তান থাকে, আর এখানে সৎ ছেলে স্বামীর নিজ সন্তান, তাই আপনাকে ৮ ভাগের ১ভাগ দিতে হবে)। একজন স্বামীর একাধিক স্ত্রী থাকলে সবাই মিলে এই ৮ ভাগের এক ভাগের মালিক হবে।
- সৎ ছেলে (স্বামীর পুত্র) – বাকি সম্পত্তির অধিকাংশ (অন্যান্য ওয়ারিস না থাকলে পুরো অবশিষ্ট) তার প্রাপ্য।
অর্থাৎ, আপনি যে সম্পত্তি পেয়েছেন, তা হলো আপনার নিজের মালিকানাধীন অংশ। সৎ ছেলেও তার নিজের অংশের মালিক। আপনি সৎ ছেলের অংশে কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না, এবং সৎ ছেলেও আপনার অংশে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত: আপনি কি আপনার অংশ অন্য কাউকে বিক্রি করতে পারবেন?
হ্যাঁ, আপনি আপনার নিজের মালিকানাধীন অংশ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে যেকোনো ব্যক্তির কাছে বিক্রি করতে পারবেন। এর জন্য সৎ ছেলের অনুমতি বা অগ্রাধিকার প্রয়োজন নেই। তবে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে:
শুফ’আ (প্রাক-ক্রয় অধিকার)
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, অস্থাবর বা স্থাবর সম্পত্তির কোনো অংশীদার (co-owner) যদি তার অংশ তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে বিক্রি করে, তাহলে অন্য অংশীদারের (এখানে সৎ ছেলে) সেই অংশটি ক্রয় করার অগ্রাধিকার থাকে। একে শুফ‘আ (পূর্ব-ক্রয়ের অধিকার) বলে। এই অধিকারের ভিত্তিতে সৎ ছেলে চাইলে আপনার বিক্রি করা অংশটি একই মূল্যে কিনে নিতে পারে, কিন্তু বিক্রি করার পূর্বে তাকে প্রস্তাব দেওয়া জরুরি নয়। আপনি ইচ্ছামতো যে কাউকে বিক্রি করতে পারেন; তবে সৎ ছেলে যদি পরে শুনতে পায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে দাবি করে, তাহলে আদালতের মাধ্যমে সে সেই অংশ কিনে নিতে পারে।
তবে সৎ ছেলেকে বিক্রি করা আবশ্যক নয়। আপনি যদি চান, তাকেই বিক্রি করতে পারেন, কিংবা অন্য কাউকে।
তৃতীয়ত: সৎ ছেলে যদি খোঁজ না নেয়, তাহলে?
যদি সৎ ছেলে আপনার অংশ কেনার কোনো আগ্রহ দেখায় না, বা বিক্রির খবর জানার পরও কোনো দাবি না করে (শরিয়তে শুফ‘আ দাবির জন্য নির্দিষ্ট সময় আছে, যা মাদ্রাসায় জানা), তাহলে তার অধিকার বাতিল হয়ে যায়। তখন আপনি নির্বিঘ্নে অন্য কাউকে বিক্রি করতে পারবেন।
চতুর্থত: বাইরের কাউকে বিক্রি করা যাবে?
হ্যাঁ, যেকোনো ব্যক্তির কাছেই বিক্রি করা জায়েজ। তবে যদি সৎ ছেলে পরে জানতে পারে এবং সময় থাকতে শুফ‘আ দাবি করে, তাহলে তাকে সেই অংশ কিনে দেওয়া আপনার জন্য ওয়াজিব হবে (মামলা হলে আদালতের মাধ্যমে)।
সারসংক্ষেপ:
- আপনার নিজের প্রাপ্ত অংশ (৮ ভাগের ১ ভাগ) বিক্রি করা জায়েজ।
- বিক্রির জন্য সৎ ছেলের অনুমতি বা অগ্রাধিকার প্রয়োজন নয়।
- আপনি চাইলে সৎ ছেলেকেও দিতে পারেন, কিন্তু এটা ওয়াজিব নয়।
- সৎ ছেলে খোঁজ না নিলেও আপনি যেকোনো ব্যক্তির কাছে বিক্রি করতে পারেন। তবে শরিয়তের শুফ‘আ বিধানের কারণে সৎ ছেলের পূর্ব-ক্রয় অধিকার থাকে—সে চাইলে আদালতের মাধ্যমে আপনার বিক্রি করা অংশ কিনে নিতে পারে।
- সম্পূর্ণ সম্পত্তি (সৎ ছেলের অংশসহ) আপনি এককভাবে বিক্রি করতে পারবেন না; শুধু আপনার নিজের অংশ বিক্রি করার অধিকার আপনার আছে।
সতর্কতা: বাস্তব ক্ষেত্রে জমি-বাড়ির মতো স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির সময় স্থানীয় ইসলামি আইন ও সরকারি আইন অনুযায়ী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। এছাড়া সৎ ছেলের সাথে সদ্ভাব ও সুবিচারের জন্য তাকে প্রথমে প্রস্তাব দেওয়া উত্তম, যদিও তা আবশ্যক নয়।
সহিহ হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (আল-দুররুল মুখতার) – কিতাবুল শুফ‘আ
- ফতোওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি) – ২/৫৩২
- ফতোওয়া আলমগিরি (হিন্দিয়া) – কিতাবুল শুফ‘আ
- বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভি) – মীরাস ও শুফ‘আ অধ্যায়
উপদেশ: নিজের অংশ বিক্রির আগে একজন আলেম বা মুফতির সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া উত্তম, যাতে শরিয়তের সব দিকই সংরক্ষিত হয়।
والله أعلم بالصواب