পূর্বের পাপ গোপন করে বিয়ে করা জায়েজ কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সিদ্ধান্তের জন্য আপনাদের শরণাপন্ন হওয়া। একটু বিস্তারিত বলার জন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। বিষয়টা খুব জরুরি...
আমার পূর্বের জীবনে দ্বীনের বুঝ খুব একটা ছিলো না।আমি মোটামুটি একটা জীবনে ছিলাম যেখানে আমি হালাল হারামে পরোয়া করতাম না।যদি বলি আমি আসলে জানতাম এ না কোনটা হালাল কোনটা হারাম। ঐ সময়ে আমার একটা রিলেশনশিপ(হারাম প্রেম) হইছিলো।তারপর তো ধীরে ধীরে আমার মধ্যে দ্বীনের বুঝ আসছে, আল্লাহ্ দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ্। আমি আসলে আগে এটাও জানতাম না এসব বিষয় হারাম। বুঝার পরে আমি আসলে ছাড়ছি কিন্তু একেবারে ছাড়তে পারিনাই।অনেকবার ছাড়ে দিছিলাম কিন্তু দেখা গেছে সপ্তাহ বা মাসখনেক পর আবার কথা বলছি হয়তো। তবে সবসময় এই পাপের বোঝাটা আমাকে খুব পীড়া দেয়।বর্তমানে ওখানে বিয়ের কথাবার্তা চলতেছে।আমি আসলে এমন একজন মেয়ে যখন দ্বীনের বুঝ ছিলো না তখনও ভাবতাম যে আমার জীবনে শুধু একজনই থাকুক আর কেউ না আসুক। ওনাদের বাসায় সবাই মোটামুটি ধার্মিক। কিন্তু বাসায় আত্মীয়দের সামনে মুখ ঢেকে রাখা ওনারা পছন্দ করেন না। এখন ওনারা আমাকে দেখতে আসতে চাচ্ছে। ছেলের দুলাভাইরাও আসবে।ওনারা আমাকে দেখতে চাচ্ছেন। কিন্তু আসলে আমার এই পর্দা দিয়েই দ্বীনের পথে জার্নিটা শুরু।যদিও আমার অনেক পাপ আছে অনেক সমস্যা আছে কিন্তু এটা তো আমি ছাড়তে চাচ্ছি না।বলা ভালো আমি ২বছর যাবত মাহরাম-ননমাহরাম মেইনটেইন করে চলার চেষ্টা করি আর নন-মাহরামদের সামনে মুখ খুলি না।কিন্তু সমস্যা হলো আমার এই হারাম কাজের বিষয়টা।এখন যদি এটায় আমি রাজি না হই, তাহলে সবকিছু এখানেই শেষ হবে। কিন্তু আমার ভয় লাগে অন্যকেউ কি আমাকে গ্রহণ করবে বা আমিতো আসলে পাপী।অন্য কাউকে আমার এই পাপের বিষয় গোপন করে বিয়ে করলে তো তার প্রতিও অন্যায় হয়ে যাবে। আর কোনো দ্বীনদার ছেলে কি আমাকে গ্রহণ জরতে চাইবে? আর আমিতো বিয়ে না করেও থাকতে পারবো না।শরীয়াহ এর বিপরীতে চলে যাবো।অনেক সমস্যা হবে বিয়ে করে না থাকা। এমতাবস্থায় কি আমার এই বিষয়টার দিকে তাকায় মুখ খোলার বিষয়টা consider করা উচিত? এখন আমি আসলে একদম বুঝতেছি না কি করবো...
Answer
(وَعَلَيْكُمُ السَّلَام وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ)
প্রথমেই আপনার দ্বীনের পথে ফিরে আসার জন্য এবং পাপের বোঝা থেকে মুক্তি পাওয়ার আন্তরিক ইচ্ছার জন্য আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল। আমি কুরআন ও হাদিসের আলোকে এবং হানাফি ফিকহের কিতাবাদি (বিশেষ করে রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া উসমানি, ইমদাদুল ফাতাওয়া) অনুযায়ী উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনার পর্দা (হিজাব) কখনোই ছাড়বেন না। আপনার অতীতের পাপ এবং বর্তমান পর্দা মানার চেষ্টা—এই দুটি ভিন্ন বিষয়। দ্বীনের পথে আপনার জার্নি পর্দার মাধ্যমেই শুরু হয়েছে, এটি একটি মহান নিয়ামত। এই নিয়ামতকে আপনি একটি হারাম সম্পর্কের জন্য বিসর্জন দিতে পারবেন না। বিয়ের জন্য পর্দা ভঙ্গ করা জায়েজ নয়। আপনার উচিত এই বিয়ের প্রস্তাব থেকে সরে আসা এবং আল্লাহর কাছে তওবা করা। দ্বীনদার ও ভালো ছেলে অবশ্যই আপনাকে গ্রহণ করবে, ইনশাআল্লাহ।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ:
১. পর্দার (হিজাব) বিধান ও গুরুত্ব:
পর্দা ইসলামের একটি অপরিহার্য বিধান। কুরআন মাজিদ ও হাদিসে পর্দার নির্দেশ স্পষ্ট।
-
কুরআনের দলিল:
- সূরা আন-নূর (২৪:৩১): "আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। আর তারা যেন তাদের সাজসজ্জা প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের মাথার ওড়না (খুমুর) তাদের বক্ষদেশে ফেলে রাখে..." (অর্থ)
- সূরা আল-আহযাব (৩৩:৫৯): "হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ ও কন্যাগণ এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের জিলবাব (বড় চাদর) নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে, ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না।" (অর্থ)
-
হাদিসের দলিল:
- রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "যে মহিলা সুগন্ধি ব্যবহার করে অতঃপর লোকদের সামনে দিয়ে যায়, সে যেন ব্যভিচারিণী।" (সুনান আত-তিরমিযী, হাসান সহিহ)
- ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি দুনিয়াতে অহংকার করে পোশাক পরিধান করবে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুনের পোশাক পরাবেন।" (সহিহ বুখারি)
-
হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত:
- ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর মতে, পুরো শরীর সতর, মুখ ও হাত পর্যন্ত এর আওতাভুক্ত নয় (ফিতনার আশঙ্কা না থাকলে)। তবে ফিতনার যুগে বা অমুসলিমদের দেশে মুখ ও হাত ঢাকাও ওয়াজিব হয়ে যায়। (রদ্দুল মুহতার)।
- বর্তমান সময়ে ফিতনা ও খারাপ দৃষ্টি সর্বত্র বিদ্যমান, তাই পরপুরুষের সামনে পর্দা করা অত্যাবশ্যক (ওয়াজিব)। এটি শিথিলযোগ্য নয়।
২. অতীতের পাপ ও তওবা:
আপনি অতীতে অজ্ঞতাবশত হারাম প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। এখন আপনি সেটা বুঝতে পেরেছেন, পাপের বোঝা অনুভব করছেন এবং ছাড়ার চেষ্টা করছেন। এটি আপনার তওবার সূচনা।
-
তওবার শর্ত:
- পাপ কাজটি সাথে সাথে বন্ধ করা।
- কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
- ভবিষ্যতে এই পাপে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।
- যদি অন্য হকের সাথে সম্পর্কিত হয় (যেমন কারো সম্পদ আত্মসাৎ করা), তবে তা ফিরিয়ে দেওয়া।
-
আপনার বর্তমান অবস্থা: আপনি একাধিকবার সম্পর্ক ছেড়ে আবার শুরু করেছেন, যা তওবার পূর্ণতা নষ্ট করে। তবে হতাশ না হয়ে বরং পুরোপুরিভাবে এবং চূড়ান্তভাবে এই সম্পর্ক ছেড়ে দেওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করুন। আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন (সূরা আল-বাকারাহ, ২:২২২)।
-
পাপ গোপন রাখা: আপনার অতীতের পাপ সম্পর্কে আপনি কাউকে বলবেন না। ইসলাম পাপ প্রকাশ করতে নিষেধ করেছে। আপনি তওবা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিন। নতুন কারো সাথে বিয়ে করলে আপনার অতীতের পাপ গোপন রাখা জায়েজ, বরং উচিত।
৩. বর্তমান বিয়ের প্রস্তাব:
এখন প্রশ্ন হলো, যার সাথে আপনার হারাম সম্পর্ক ছিল, তার সাথে বিয়ে করা উচিত কি না?
-
হারাম সম্পর্কের পর বিয়ে: ইসলাম হারাম সম্পর্কের (যিনা, ব্যভিচার) পরও ঐ একই ব্যক্তির সাথে বিয়ে করার অনুমতি দেয়, যদি উভয়েই আন্তরিকভাবে তওবা করে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনার পক্ষে এটি বিবেচনা করা উচিত কিনা, তা নিয়ে চিন্তা করা জরুরি।
-
দ্বীনের মানদণ্ড: ছেলের পরিবার পর্দা পছন্দ করে না। এটি একটি বড় ধর্মীয় সমস্যা। আপনি যদি পর্দা করে থাকেন এবং তারা পর্দা পছন্দ না করে, তাহলে বিয়ের পর আপনাকে পর্দা ছাড়তে বাধ্য করা হতে পারে, অথবা আপনার পর্দা মানা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে আপনার দ্বীনের পথে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে।
-
"মুখ খোলা" (Face Revelation) এর প্রশ্ন: আপনি জিজ্ঞেস করছেন, বিয়ের প্রস্তাবের কারণে কি আপনি পর্দা শিথিল করে দেখাতে যাবেন? উত্তর: একেবারেই না। বিয়ে দেখার জন্য পরপুরুষের সামনে পর্দা করা ফরজ। ছেলের দুলাভাই, ভাই ইত্যাদি আপনার জন্য মাহরাম নয়। তাদের সামনে আপনি আপনার সৌন্দর্য (মুখ, চুল, গলা ইত্যাদি) প্রকাশ করতে পারবেন না। বিয়ের প্রস্তাবের সময় শুধুমাত্র সম্ভাব্য বর নিজে (এবং তার সাথে তার মা-বোন) আপনাকে দেখতে পারে, বরের ক্ষেত্রে মাহরামের উপস্থিতিতে দেখতে হবে।
-
ইমাম আবু হানিফা (রহ:) ও অন্যান্য ইমামদের মতে: বিয়ের প্রস্তাবের সময় শুধু পাত্র নিজে পাত্রীকে চেহারা ও হাত পা দেখতে পারে, কিন্তু কঠোর পর্দার আড়ালে বা কোনো মাহরামের উপস্থিতিতে। (রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া উসমানি)।
৪. আপনার জন্য সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ:
- এই সম্পর্ক এবং বিয়ের প্রস্তাব থেকে চূড়ান্তভাবে সরে আসুন। আপনার ইমান, পর্দা এবং দ্বীনের পথ এই সম্পর্কের জন্য বিসর্জন দেওয়া যাবে না।
- আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করুন। একান্তে কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। "রাব্বানা জালামনা আনফুসানা..." (আমরা আমাদের নিজেদের ওপর অত্যাচার করেছি) এই দোয়াটি পড়ুন।
- পর্দা কঠোরভাবে বজায় রাখুন। আপনার এই পর্দাই আপনার জন্য বরকত ও নাজাতের কারণ হবে।
- হতাশ হবেন না। আপনার অতীতের পাপের জন্য কেউ আপনাকে প্রত্যাখ্যান করবে না যদি আপনি সত্যিই তওবা করে থাকেন। দ্বীনদার ছেলেরা এমন মেয়েকে বিয়ে করতে আগ্রহী যার ইমান এবং পর্দা আছে। ছেলেদের মধ্যেও অনেক তওবাকারী আছেন যারা অতীতে পাপ করেছেন। আপনার জন্য উপযুক্ত পাত্র খোঁজার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
- বিবাহ করা ফরজ: আপনি ঠিকই বলেছেন, বিয়ে না করে থাকা অনেক সময় ফেতনার কারণ হয় এবং এটি অপছন্দনীয়। তাই আপনার জন্য বিবাহ করা জরুরি। কিন্তু সেই বিবাহ হতে হবে সম্পূর্ণ হালাল পন্থায়, পাত্রীর পর্দা ও অন্যান্য ইসলামী বিধান মেনে। আপনার উচিত এমন একজন দ্বীনদার পাত্র খোঁজা, যিনি পর্দার গুরুত্ব বোঝেন এবং আপনাকে দ্বীনের পথে উৎসাহিত করবেন। আপনার অতীত নিয়ে কাউকে বলবেন না। আল্লাহ সব ভুল ক্ষমা করে দেবেন।
উপসংহার:
আপনার বর্তমান দ্বিধা সমাধানের মূল চাবিকাঠি হলো ইসলামি বিধানের অগ্রাধিকার। পর্দা ফরজ, হারাম সম্পর্ক হারাম। আপনি দ্বীনের পথে এসেছেন, তাই হারাম সম্পর্কের জন্য ফরজ ত্যাগ করা আপনার জন্য বৈধ নয়। এই সম্পর্ক শেষ করে আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং পর্দার সাথে একজন দ্বীনদার পাত্র খোঁজার চেষ্টা করুন। আল্লাহ তায়ালা আপনার তওবা কবুল করবেন এবং উত্তম পাত্র দান করবেন, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহু আলাম (আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন)।