পারিবারিক কলহ, ভাইয়ের দায়িত্ব, মায়ের সাথে ঝগড়া ও বিবাহিত পুরুষের পৃথক বসবাসের হানাফি ফিকহি নির্দেশনা।
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমত, আপনার দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের দায়িত্ব পালন ও ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। ইসলাম সৎকর্ম ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনি যখন বিবাহিত এবং নিজের স্ত্রী ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিতে বাধ্য, তখন আপনার উপর অন্য ভাইয়ের ভরণপোষণ বাধ্যতামূলক নয়—বিশেষত যখন ভাইটি এখন প্রাপ্তবয়স্ক এবং উপার্জনে সক্ষম।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে দৃষ্টিভঙ্গি
১. ভাইয়ের ভরণপোষণ:
হানাফি ফিকহ অনুসারে, ভাই-বোনের ভরণপোষণ শুধু তখনই ওয়াজিব হয় যখন ভাইটি অক্ষম (অসুস্থ, নাবালক বা উপার্জনে সম্পূর্ণ অক্ষম) এবং আপনার কাছে সচ্ছলতা থাকে। কিন্তু আপনি নিজে বেকার ও টিউশন করে সংসার চালাচ্ছেন; তাই আপনার ছোট ভাই (যে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পরও উপার্জন করছে না) তার জন্য আপনি বাধ্য নন। যদি সে উপার্জনে সক্ষম হয়, তাহলে তার নিজের জন্য কাজ করা উচিত। পিতার মৃত্যুর পর মা ও ভাইয়ের ভরণপোষণ সবার ওপর ফরজ নয়, বরং প্রত্যেক সন্তানের ওপর তাদের নিজ নিজ পরিবারের দায়িত্ব থাকে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৬০৭; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩১১)
২. মায়ের প্রতি দায়িত্ব:
মা যদি নিঃস্ব বা উপার্জনে অক্ষম হন, তবে তার ভরণপোষণ সন্তানদের ওপর ফরজ। আপনার ও আপনার ভাই উভয়েরই মায়ের খরচ দেওয়া উচিত। আপনি এ পর্যন্ত একাই বহন করছেন, যা ন্যায়সংগত নয়। আপনি শুধু নিজের অংশ (অর্ধেক) দিতে পারেন এবং ভাইকেও তার অংশ দিতে বলুন। কিন্তু যদি মা ভাইকে সমর্থন দেন এবং আপনার ওপর চাপ দেন, তাহলে আপনি আদবের সাথে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করুন।
- বিবাহিত পুরুষের পৃথক থাকার অধিকার:
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর জন্য পৃথকভাবে বসবাসের সুযোগ আছে। বিশেষ করে যখন পরিবারের সাথে ঝগড়া এবং আপনার সিদ্ধান্তকে স্ত্রীর প্রভাব বলে দোষারোপ করা হয়, তখন কিছুটা দূরত্ব গ্রহণ করা সঙ্গত। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের অধিকার আছে এবং তোমাদের ওপর তাদের অধিকার আছে।” (তিরমিজি, হাদিস: ১১৬৩) তাই আপনার স্ত্রীকে নিয়ে পৃথক বসবাস করা জায়েজ, তবে শর্ত হলো মায়ের সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করা এবং প্রয়োজনে তার খরচ চালিয়ে যাওয়া।
ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৫৩) ও ফাতাওয়া উসমানীতে এসেছে, যদি পরিবারের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস কষ্টকর হয় এবং দ্বীনি মসআলা নষ্ট হয়, তাহলে পৃথক বসবাস বৈধ।
ব্যবহারিক পরামর্শ
১. শান্তিপূর্ণ আলোচনা: মায়ের সাথে অসন্তুষ্ট না হয়ে তাকে সাদরে বোঝান যে আপনার সিদ্ধান্ত স্ত্রীর কারণে নয়, বরং আপনার নিজের পারিবারিক দায়িত্ব ও আর্থিক চাপের কারণে।
২. ভাইকে দায়িত্ব নিতে বলা: আপনার ভাইয়ের বয়স ১৮ হলেই সে উপার্জনে সক্ষম। তাকে বোঝান যে তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে এবং মায়ের খরচেও ভাগ বসাতে হবে।
৩. পৃথক বসবাসের পরিকল্পনা: যদি দৈনিক ঝগড়া ও মানসিক চাপ অসহনীয় হয়, তাহলে বিনা দ্বন্দ্বে ধীরে ধীরে আলাদা বাসায় উঠুন। তবে সপ্তাহে অন্তত একবার মায়ের সাথে দেখা করুন এবং তার নিয়মিত খরচ (যদি অক্ষম হন) পাঠিয়ে দিন।
৪. মধ্যস্থতা: কোনো স্থানীয় আলিম বা পরিবারের বড় ব্যক্তিকে দিয়ে বিষয়টি মিমাংসা করান। এতে মা বুঝতে পারবেন যে সিদ্ধান্তটি আপনার নিজের।
সতর্কতা
- মায়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা কখনো উচিত নয়। হাদিসে এসেছে: “যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৪)
- আপনার বেকার অবস্থার কারণে আপনি ইচ্ছে করলেও ভাইকে বা মাকে পুরোপুরি খরচ না দিয়ে দিতে পারেন, তবে অন্যায়ভাবে কাউকে কষ্ট দেবেন না।
সারসংক্ষেপ: আপনার ভাইয়ের জন্য খরচ দেওয়া আপনার জন্য ফরজ নয়; মায়ের জন্য খরচ দিতে হবে যদি তিনি অক্ষম হন, তবে তা আপনার একার দায়িত্ব নয়। পৃথক বসবাস জায়েজ এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তা উত্তম হতে পারে। আপনি উপার্জন সক্ষম হলে নিজের স্ত্রীর দায়িত্বে মনোযোগী হোন এবং মায়ের সাথে সদাচার বজায় রাখুন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ধৈর্য ও সঠিক পথের তাওফিক দান করুন।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (৩/৬০৭): ভাই-বোনের ভরণপোষণের শর্ত।
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৩১১): পরিবারের দায়িত্ব বণ্টনের নীতি।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৫৩): পৃথক বসবাসের বৈধতা।
- মাআরিফুল কুরআন (সূরা নিসা, আয়াত ৩৪): স্বামীর নেতৃত্ব ও স্ত্রীর দায়িত্ব।