অন্যের হক নষ্ট করার পরে দায় মুক্তি প্রসঙ্গে
Halal and Haram · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব।
আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ২০১৭ সালে এক ম্যাচে থাকতাম এবং ফ্রিল্যান্সিং (অনলাইনে ইনকাম) করতাম। যেই ওয়েবসাইট বা প্লাটফর্মে আমরা কাজ করতাম সেটার নাম ছিল ফ্রিল্যান্সার ডটকম। সেখানে বিদেশি ক্লায়েন্টরা আসতো এবং আমাদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিত ডলারের বিনিময়ে। যেটা বাংলাদেশে এখনো খুবই জনপ্রিয় একটি পেশা।
একদিন আমাদের কে এক বিদেশি ক্লায়েন্ট মেসেজ দিয়ে ভিন্ন এক জিনিস চায়। যেমন সে অন্য এক কারেন্সি যেটার নাম বিটকয়েন ডলার। সেটা চায়। মানে তাকে যদি আমরা ১০০ ডলার বিটকয়েন দেই তাহলে সেটার বিনিময়ে সে আমাদের ২০০ USD ডলার দিবে।
উল্লেখ রাখা ভালো এই লেনদেন টি সম্পন্ন হয়েছিলো সেই ফ্রিল্যান্সার ডট কম ওয়েব সাইটে। যদিও এটি সেই সাইটের নীতিমালা অনুযায়ী অবৈধ।
তাও আমরা খারাপ উদ্যেশ্যে মানে সেই ক্লায়েন্টের টাকা মেরে খাওয়ার জন্য তার কাছে ২০০ ডলার নেই (তৎকালীন ১৭ হাজার টাকা)। এবং বিনিময়ে তাকে বিটকয়েন ডলার দেই নি। যদিও বিটকয়েন আমাদের ছিলো না। আমাদের মুল উদ্দেশ্যই ছিলো তার টাকা মেরে খাওয়া।
আমরা এই গোটা প্রসেসটাই করছি অন্য আরেকজন রুম মেটের ফ্রিল্যান্সার একাউন্ট থেকে যিনি ছিলেন এক হিন্দু বড়ো ভাই। তিনার অনুমতি ছাড়াই আমরা দুইজন এটা করি।
যখন ক্লায়েন্টের টাকাটা আমরা আত্মসাৎ করে অন্য একাউন্টে পার করে নিয়ে নেই তখন সেই ক্লায়েন্টে ফ্রিল্যান্সার ডট কমে রিপোর্ট করে। তখন ফ্রিল্যান্সার ডট কম সেই ক্লায়েন্টের টাকা ২০০ ডলার তাদের ফান্ড থেকে তাকে ফেতৎ দিয়ে দেয় (কারণ তারা তো জমিনদার টাইপের প্লাটফর্ম দুই পক্ষের জন্য) এবং যেই হিন্দু ভায়ের একাউন্ট থেকে আমরা এমন করেছিলাম সেটাতে মাইনাস ২০০ ডলার করে দেয়।
তার মানে এই একাউন্ট দিয়ে ভবিষ্যতে কাজ করতে হলে ২০০ ডলার সেখানে লোড করে নিতে হবে যেটা তারা সেই ক্লায়েন্ট কে পেমেন্ট করে দিয়েছিলো।
তারপরের দিনে সেই হিন্দু বড়ো ভাই তার কস্পিউটারে বসলে তিনি তার একাউন্টে নেগেটিভ ব্যালেন্স দেখে খুবই বিচলিত হন এবং আমাদের এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে আমরা তিনাকে ভুং ভাং বুঝিয়ে দেই৷
যদিও আমরা দুইজন মিলে এই অন্যায় কাজ করি কিন্তু সেই ২০০ ডলার মানে তৎকালীন ১৭ হাজার টাকা আমি একায় ভোগ করি।
এখন এতো বছর পরে আমার অনুশোচনা হচ্ছে এই গুনাহ থেকে আমি কিভাবে মুক্তি পেতে পারি। দয়া করে জানাবেন। কোন পদ্ধতিতে আমি এই ১৭ হাজার টাকার হক নষ্ট করার গুনাহ থেকে মুক্তি পেতে পারি?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, আপনার অর্জিত ২০০ ডলার (১৭,০০০ টাকা) সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েয। যেহেতু আপনি ধোঁকা ও প্রতারণার মাধ্যমে ক্লায়েন্টের টাকা গ্রহণ করেছেন এবং তার বিনিময়ে কিছু প্রদান করেননি, এটি স্পষ্টতই ’আকালে বাতিল’ (অবৈধভাবে সম্পদ ভক্ষণ)-এর অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, আপনি অন্যের (হিন্দু ভাই) একাউন্ট অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করে তার ওপর ঋণের বোঝা চাপিয়েছেন, যা দ্বিগুন গুনাহের কারণ।
ফিকহী বিধান: ইসলামী শরীয়তে হারাম উপার্জন থেকে ফিরে আসা এবং হকদারকে তার প্রাপ্য ফিরিয়ে দেওয়া ফরয। এ সম্পর্কে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: "وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ" "তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।" (সূরা বাক্বার: ১৮৮)
এবং হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "مَنْ ظَلَمَ أَخَاهُ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمٌ" "যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের মান-সম্মান বা কোনো কিছুর উপর জুলুম করেছে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে নেয়, যেদিন দীনার-দিরহাম কাজে আসবে না।" (বুখারী, কিতাবুল মাসালীন)
সমাধানের পদ্ধতি: আপনার গুনাহ থেকে মুক্তি পেতে নিম্নলিখিত ধাপসমূহ অনুসরণ করুন:
১. তাওবা ও ইস্তিগফার: প্রথমে আল্লাহর নিকট খালেছ দিলে তাওবা করুন। কাজটি যে হারাম ও প্রতারণা ছিল, তার জন্য অনুতপ্ত হোন। ভবিষ্যতে এ জাতীয় কাজ না করার দৃঢ় সংকল্প করুন। তাওবার শর্ত হলো:
- (ক) গুনাহ থেকে বিরত থাকা
- (খ) অনুতপ্ত হওয়া
- (গ) ভবিষ্যস্য পুনরায় না করার ইচ্ছা পোষণ করা
- (ঘ) হকদারের হক আদায় করা
২. হকদারদের চিহ্নিত করে ক্ষতিপূরণ প্রদান: এখানে তিন পক্ষের হক নষ্ট হয়েছে:
(ক) বিদেশী ক্লায়েন্ট: প্রকৃত হকদার হলো সেই ক্লায়েন্ট। কিন্তু ফ্রিল্যান্সার.কম কর্তৃপক্ষ তাকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে, তাই এখন তাদের কাছেই ওই অর্থ ফেরত পাওয়ার অধিকার চলে গেছে। তাই আপনি $২০০ ডলার (বা সমমূল্যের টাকা) ফ্রিল্যান্সার.কম কর্তৃপক্ষকে ফেরত দিতে চেষ্টা করুন। যদি তাদের সাথে যোগাযোগ সম্ভব না হয়, তাহলে আপনি আপনার অর্থ থেকে $২০০ ডলার (বা বর্তমান মূল্য) সদকা করে দিন। তবে সদকার নিয়ত করবেন না যে এটি হকদারের পক্ষ থেকে সদকা, বরং নিয়ত করুন এটি হকদার পর্যন্ত পৌঁছানোর নিয়মে। (শরহু মাআনিল আসার, রদ্দুল মুহতার)
(খ) হিন্দু রুমমেট: যেহেতু আপনি তার অনুমতি ছাড়া তার একাউন্ট ব্যবহার করে তাকে ঋণগ্রস্ত (নেগেটিভ ব্যালেন্স) করেছেন, তাই তাকে অবশ্যই জানিয়ে ক্ষমা চাইতে হবে এবং তার একাউন্ট ক্লিয়ার করার ব্যবস্থা করতে হবে। তাকে $২০০ ডলার পরিশোধ করে দিন অথবা তার সম্মতি নিয়ে অন্যান্য উপায়ে ক্ষতিপূরণ দিন। যদি সে ক্ষমা করে দেয়, তাহলেও আদায় করা উত্তম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللهُ عَنْهُ" "যে ব্যক্তি মানুষের মাল ফেরত দেওয়ার নিয়তে নেয়, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা ফেরত দেন।" (বুখারী)
তবে এক্ষেত্রে তিনি হিন্দু হয়েও তার হক ফেরত দেওয়া আবশ্যক। ইসলামী শরীয়াতে কাফির ও মুসলিমের হকের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
(গ) সহযোগী বন্ধু: আপনি যদি আপনার বন্ধুর সাথে ভাগ না করে একাই টাকা ভোগ করে থাকেন, তাহলে তাকে তার অংশ ফেরত দিন। তবে যেহেতু কাজটি হারাম ছিল, তাই শরীয়তে তার কোনো হক নেই। কিন্তু আপনি যেহেতু তাকে প্রতারণার কাজে লাগিয়েছেন, তাই উত্তম হলো তাকে কিছু দিয়ে তার মনের ক্ষোভ দূর করা।
৩. সময় ও পরিমাণ নির্ধারণ: বর্তমানে যদি $২০০ ডলারের সমমূল্য ১৭,০০০ টাকার চেয়ে বেশি বা কম হয়, তাহলে প্রকৃত মূল্য নির্ণয় করবেন। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী $২০০ ডলার কত টাকা, সেটা হিসাব করে তা ফেরত দিতে হবে।
৪. অর্থের উৎস: এই অর্থ হারাম, তাই এটি আপনার নিজের বৈধ উপার্জন থেকে আলাদা করে দান করা নিষিদ্ধ নয়। বরং আপনার কাছে যদি হারাম মাল অবশিষ্ট থাকে, তা অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে সদকা করে দেওয়া জরুরি। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, কিতাবুল হজর ওয়াল ইবারাহ)
সংক্ষিপ্ত করণীয়:
- $২০০ ডলার (বর্তমান বাজার মূল্য) ফ্রিল্যান্সার.কম কর্তৃপক্ষকে ফেরত দিন। অসম্ভব হলে সদকা করুন।
- হিন্দু রুমমেটকে জানিয়ে তার কাছ থেকে ক্ষমা নিন এবং তার একাউন্ট ক্লিয়ার করুন।
- আল্লাহর কাছে আন্তরিক তাওবা করুন।
- সহযোগী বন্ধুর কাছ থেকেও ক্ষমা চেয়ে নিন।
ওয়াসিয়্যত: আপনি লিখেছেন যে, "আমরা খারাপ উদ্দেশ্যে... তার কাছে ২০০ ডলার নেই" – এটি প্রতারণার অপরাধকে আরও গুরুতর করেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده" "মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।" (বুখারী, মুসলিম)
আপনার উচিত এখন থেকে সতর্ক হওয়া এবং জালেমদের অন্তর্ভুক্ত না হওয়া। আল্লাহ তাআলা তাওবা কবুল করেন এবং দয়ালু।
উল্লেখিত সূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (কিতাবুল বুয়ূ, বাবুর রিবা ওয়াল কারাহিয়্যাহ) – ইবনে আবেদীন
- ফাতাওয়া উসমানী (জিদ্দতুল মাল) – মুফতি তাকী উসমানী
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (কিতাবুল জিদ্দাহ) – আশরাফ আলী থানভী
- শরহু মাআনিল আসার (কিতাবুল বুয়ূ) – ইমাম তাহাবী
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (কিতাবুল কারাহিয়্যাহ, বাবু আহকামিল আমওয়ালিল হারাম)