নজর লেগেছে কিনা তা জানতে চাই।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার রুমমেটের প্রশ্ন এগুলো..
১) ও বেশ কিছুদিন যাবত রাতে ঘুমাতে পারছেনা, ওর ঘুম নরনালি ঠিকঠাক ছিলো।বাট বেশ কিছুদিন ধরে ওর রাতে একমদই ঘুম হচ্ছে না
২)ওর বারবার নাকি মনে হচ্ছে ওর রুমে সাপ আছে,খাটের নিচে সাপ আছে, রাস্তায় বের হলেও মনে হচ্ছে সাপ আছে।আর এটা নাকি খুব স্ট্রং ফিল হচ্ছে যে খাট সরালেই নিচে সাপ পাওয়া যাবে
৩)কাল রাতে যখন ও ঘুমায়, তখন হুট করে ওর পায়ের পাতা ঠাস করে ধাক্কা লেগে ঘুরে যায়,পুরো পা না, যাস্ট পায়ের পাতা।তখন ও তাকালে দেখে ওর মশারির সামনেই আলখাল্লার মতো কিছু একটা দাড়ানো,তেমন লম্বা না।
৪)ও নাকি খারাপ কিছু ফিল করে যেমন আমাদের রুমে কিছু কখনো ফিল করে নাই।বাট ওর খালার বাসায় করে যে কিছু একটা আছে
মানুষ কি জ্বীন থাকলে ফিল করতে পারে?
এখন ও জানতে চাচ্ছে নজর লেগেছে কিনা বা যাদু করা হলো কিনা।
এখন ও কি করতে পারে??
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই বলে নিচ্ছি, আপনার রুমমেটের সমস্যাগুলো একান্তভাবে ব্যক্তিগত ও শারীরিক-মানসিক উভয় হতে পারে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা কেবল কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে নির্দেশনা দেব। নিচে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হলো:
১. রাতে ঘুম না আসা ও সাপের ভ্রম
আপনার রুমমেটের ঘুমহীনতা ও সাপের বিভ্রম দুটি বিষয় নজর (evil eye) বা যাদুর (sihr) কারণে হতে পারে, অথবা এটি মানসিক উদ্বেগ (anxiety) ও ওয়াসওয়াসা (waswas) ফলেও হতে পারে। ইসলামী পণ্ডিতগণ বলেন, ঘুমের ব্যাঘাত, অহেতুক ভয়, বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু প্রাণীর (যেমন সাপ) বারবার আসা—এগুলো প্রায়শই যাদু বা নজরের লক্ষণ। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে নিচের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে:
- ২ নং পয়েন্টে বলা হয়েছে ‘খাট সরালেই নিচে সাপ পাওয়া যাবে’—এটি যদি শুধু ভাবনা হয় কিন্তু বাস্তবে কখনো সাপ দেখা না যায়, তবে তা ওয়াসওয়াসা বা মানসিক চাপের কারণে হতে পারে।
- ৩ নং পয়েন্টে পায়ের পাতায় ধাক্কা ও আলখাল্লার মতো কিছু দেখা—এটি জ্বিনের উপস্থিতি নির্দেশ করতে পারে। কেননা হাদিসে এসেছে, জ্বিনরা মাঝে মাঝে মানুষকে কষ্ট দিতে পারে। (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৭৫৫)
২. মানুষ কি জ্বিনের উপস্থিতি ‘ফিল’ করতে পারে?
হ্যাঁ, মানুষ জ্বিনের উপস্থিতি অনুভব করতে পারে—বিশেষত যখন জ্বিন ক্ষতিকর হয় বা কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করে। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’-এ উল্লেখ করেছেন, জ্বিনের প্রভাব কখনো শারীরিক (যেমন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নড়া), কখনো মানসিক (যেমন অকারণ ভয়, অস্থিরতা) আকারে প্রকাশ পায়। তবে সব ফিলিংকেই জ্বিন বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়; বরং কুরআন ও দুআ পড়ে দেখতে হবে।
৩. নজর নাকি যাদু—কীভাবে বুঝবেন?
হানাফি ফিকহের বড় পণ্ডিত মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) ‘মাআরিফুল কুরআন’ ও ‘বেহেশতি জেওর’-এ বলেন:
- নজরের (নযর-ই-বাদ) লক্ষণ: হঠাৎ শারীরিক বা মানসিক পরিবর্তন, বিশেষত কারো প্রশংসা বা ঈর্ষার পর। ঘুম কমে যাওয়া, অকারণ ভয়, চামড়ায় দাগ/লালচে ভাব দেখা।
- যাদুর (সিহর) লক্ষণ: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ, বারবার বমি/মাথাব্যথা, নির্দিষ্ট সময়ে শরীরে ব্যথা, স্বপ্নে সাপ/বিচ্ছু বেশি দেখা, শরীরে অজ্ঞানতা ইত্যাদি।
আপনার রুমমেটের মধ্যে উভয় ধরনের লক্ষণই মিলছে। তাই সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য একজন আলিম বা রুকইয়া বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উত্তম।
৪. এখন কী করা উচিত? (প্র্যাকটিক্যাল সমাধান)
নিচের পদক্ষেপগুলো হানাফি মাশায়েখের ফতোয়া অনুযায়ী অত্যন্ত কার্যকর:
ক. দৈনিক সকাল-সন্ধ্যার দুআ পড়া:
- সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস—প্রত্যেকটি ৩ বার পড়ে ফুঁ দেয়া শরীরে ও ঘরের চারদিকে।
- সকাল-সন্ধ্যার দুআ: “بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ” (আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৮৮; তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৮৮)
খ. ঘুমানোর আগে করণীয়:
- আয়াতুল কুরসি, সূরা ফাতিহা, ইখলাস (৩ বার) পড়ে বুকে ফুঁ দিন।
- বিছানায় শোয়ার আগে ডান কাঁধে ও বাম কাঁধে ৩ বার “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলে ফুঁ দিন।
- সাপের ভয় দূর করতে ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ ও ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বেশি পড়ুন।
গ. ঘর পবিত্র রাখা:
- নিয়মিত সুরমা ব্যবহার (চোখে মঙ্গলজনক)।
- ঘরের কোণায় পানি ছিটিয়ে আয়াতুল কুরসি পড়া।
- কলমি শাক, মেথি, লবণ ও মধু কাঁচা অবস্থায় ঘরে রাখা (প্রাচীন হানাফি তাবিজ পদ্ধতি)।
ঘ. তাবিজ/দোয়া লেখা:
- হানাফি ফিকহে তাবিজ জায়েজ, যদি তাতে কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম লিখা হয়। নিম্নলিখিত আয়াতগুলো লিখে একটি পবিত্র কাপড়ে বেঁধে ঘরে রাখতে পারেন:
- সূরা ইউসুফ (আয়াত ৬৪): “إِنِ الْحُكْمُ إِلاَّ لِلَّهِ”
- সূরা ত্বা-হা (আয়াত ৬৯): “وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى”
- সূরা ফাতিহা ও আয়াতুল কুরসি
ঙ. পেশাদার সাহায্য নেয়া:
- যদি ৭ দিনের মধ্যে উন্নতি না হয়, তবে কোনো হাকিকি আলিম বা রুকইয়া বিশেষজ্ঞের কাছে যান। তারা কুরআনের আয়াত পড়ে ফুঁ দিবেন এবং সন্দেহজনক বস্তু (যেমন পুতুল, গিঁট) খুঁজে বের করবেন।
চ. মনোবল ও ইবাদত:
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কায়েম করা, বিশেষ করে তাহাজ্জুদ।
- বেশি বেশি দরুদ শরীফ পাঠ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।
- নিজের প্রতি আস্থা রাখুন—আল্লাহর হুকুম ছাড়া কিছুই ক্ষতি করতে পারে না।
আল্লাহ আপনার রুমমেটকে শিঘ্রই শিফা দিন এবং সব ধরনের কষ্ট থেকে হেফাজত করুন।
والله أعلم بالصواب